রিফাত হত্যাকাণ্ড

মিন্নিসহ ৬ আসামির ফাঁসি

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

এম আর অভি, বরগুনা

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন আদালত। বাকি ৪ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ঘটনার ১৫ মাস পর গতকাল বুধবার বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ৬ আসামির সবাইকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন তিনি। মামলার এজাহারভুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক ৯ আসামি ও উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেছেন, ‘এই হামলা মধ্যযুগীয় পৈশাচিক বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।’

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের মধ্যে মামলার ১ নম্বর আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩) বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে যে তিনজনকে রামদা হাতে রিফাতকে কোপাতে দেখা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে রিফাত ফরাজী একজন। এছাড়া আসামি আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২) এবং মো. হাসান (১৯) হত্যাকা-ের সময় চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। হত্যাকা-ে তাদের সহযোগিতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

রিফাতের স্ত্রী বরগুনা সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী মিন্নিকে হামলার মুখে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল ভিডিওতে। তিনি ছিলেন মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর সাক্ষী। কিন্তু তদন্তের পর মিন্নিকে ৭ নম্বর আসামি হিসেবে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। রায়ে আদালত বলেন, মিন্নিও যে তার স্বামীকে হত্যার ‘ষড়যন্ত্রে’ যুক্ত ছিলেন, প্রসিকিউশন তা ‘প্রমাণ করতে পেরেছে’।

এদিকে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত অভিযোগপত্রের ৪ আসামি মো. মুসা (২২), রাফিউল ইসলাম রাব্বি (২০), সাগর (১৯) ও কামরুল হাসান সায়মুনকে (২১) খালাস দিয়েছেন। তবে এর মধ্যে মুসা পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতারের আদেশ দেন আদালত।

এর আগে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মিন্নিসহ প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিচারকাজ গত ১৬ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। এদিন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর (গতকাল) তারিখ ধার্য করেন। রায়ের দিন সকাল থেকেই আদালতপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের তল্লাশি করে আদালত ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। সকাল ৭টার দিকে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের নিরাপত্তায় আদালত ভবনে আসেন মামলার বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।

রায় ঘিরে মঙ্গলবার রাত থেকেই বরগুনার বিভিন্ন স্থানে সতর্ক দৃষ্টি রাখে পুলিশ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। টহল জোরদার করা হয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি)।

সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বরগুনা মহিলা কলেজ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, হাসপাতাল সড়ক ও সার্কিট হাউস সড়কে পুলিশি তল্লাশি চৌকি বসানো হয়েছে। সন্দেহজনক যানবাহন তল্লাশির পাশাপাশি জনসাধারণের গতিবিধির ওপর নজর রাখেন চৌকিতে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা।

এছাড়া জেলা পুলিশের ছয় স্তর নিরাপত্তার চাদরে ডাকা নীরব-নিস্তব্ধ আদালত প্রাঙ্গণ। প্রতিদিনের মতো সকাল ১০টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু না হয়ে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বিচার এজলাসে ওঠেন। দুপুর পৌনে ২টায় জনাকীর্ণ আদালতে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।

গত বছরের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সামনেই কুপিয়ে জখম করে কিশোরগ্যাং ‘বন্ড গ্রুপ’। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও ওইদিন বিকেলে তিনি মারা যান। পরের দিন ২৭ জুন রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। গত ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ৮ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে ৭৬ জন সাক্ষ্য দেন।

গতকাল বুধবার রায়ের জন্য সকাল ৯টার আগেই বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের মোটরসাইকেলে আদালতে উপস্থিত হন জামিনে থাকা মিন্নি। কারাগারে থাকা বাকি আসামিদেরও রায়ের সময় আদালতে হাজির করা হয়। রায়ের আগে মিন্নি বাবাকে বলছিলেন, খালাস পাবেন বলেই তার বিশ্বাস। কিন্তু রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দ-িত বাকি আসামিদের মতো মিন্নিকেও আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের প্রতিবেদকে জানান, দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। দুপুর পৌনে ২টায় জরাজীর্ণ আদালতে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আলোচিত এই হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেছেন। এ মামলার রায় এর বিশেষ বিশেষ দিক আদালতে পড়ে শোনানো হয় এমনটি নিশ্চিত করেছেন।

বরগুনা থানার অফিসার ইনচার্জ তরিকুল ইসলাম বলেন, আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গনে পুলিশ নিñিদ্র নিরাপত্তা দেয়। এরই মধ্যে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে ২৫০ পুলিশ ছয় স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে।

অপরদিকে গত মঙ্গলবার রিফাত হত্যা মামলার আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ শিশুর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন আদালত। আগামী ৫, ৬ ও ৭ অক্টোবর আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন। বরগুনা শিশু আদালতের বিচারক মো. হাফিজুর রহমান এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেছেন।

 

 

"