বিতর্ক এড়াতে পারছেন না ক্ষমতাসীনরা

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

দীপক দেব

করোনা মহামারির মধ্যেও সুবিধাভোগী ও ক্ষমতার অপব্যাবহারকারী একশ্রেণির লোকের কারণে বারবার সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের। যে কোনো অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের দ্রুত ও কঠোর অবস্থানের পরও বিতর্ক শাসক দলের পিছু ছাড়ছে না। ঠিকাদার জিকে শামীম বা সাহেদ থেকে শুরু করে সর্বশেষ এমসি কলেজে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন অনেকেই। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপ সরকারের কঠোর ও আপসহীন নীতির বহিঃপ্রকাশ হলেও বিরোধী পক্ষ এসব ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে সরকারের ইমেজ ক্ষুণœœ করার চেষ্টা করছে। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা স্পষ্টভাবেই বলছেন- অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে, এখানে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার টানা ক্ষমতায় থাকায় দলের মধ্যে সুবিধাভোগী ও অনুপ্রবেশকারীর কমতি নেই। সবাই এখন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ করতে চায়। এখানে যতটা না আদর্শের বিষয় আছে, তার চেয়ে বেশি আছে সুবিধা ভোগের বিষয়। আর এরাই মূলত সরকারকে বারবার সমালোচনার মুখে ফেলছে। তবে, আমাদের নেত্রী অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর। তিনি কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নিচ্ছেন না। অন্যায়কারীকে অন্যায়কারী হিসেবেই বিবেচনায় নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছেন। সিলেটে এমসি কলেজে ছাত্রলীগ নামধারী দুষ্কৃতকারীরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। জানা গেছে, সিলেটের ঘটনায় এজাহারভুক্ত সব আসামিসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পর গঠিত হওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কমিটি

এরই মধ্যে এমসি কলেজ পরিদর্শনে গেছে। সরকারের এসব পদক্ষেপই বলে দিচ্ছে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চমহল কঠোর অবস্থানে।

সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে স্ত্রী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, দেশের আইন নিজস্ব গতিতে চলছে। বিচার বিভাগের ওপর সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। দেশের মানুষ দেখেছে, নিজ দলের সমর্থক কিংবা নেতারাও অপরাধী হলে সরকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা দেয়নি। সিলেটে এমসি কলেজের ঘটনায়ও শেখ হাসিনা সরকার কঠোর অবস্থানে। অপরাধী যেই হোক ছাড় পাবে না।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সিলেটের এমসি কলেজে একটি বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে। একাজ যারাই করে থাকুক, তাদের শাস্তি পেতেই হবে। আসাদুজ্জামান খান কামাল আরও বলেন, আমরা কাউকে ছাড় দিই না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আমরা তা-ই করব।

সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও বিরোধী পক্ষ সিলেট এমসি কলেজের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা বিষয়টি নিয়ে বেশ সরব। দলটির মহাসচিব থেকে শুরু করে স্থায়ী কমিটির সদস্য সবাই এ বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনা অত্যন্ত ভয়ংকর ও ভয়াবহ। এটাই দেশের প্রকৃত চিত্র। এখানে কারও কোনো নিরাপত্তা নেই। এখানে একটা ল-লেসনেস চলছে, নৈরাজ্য চলছে এবং সেটা আওয়ামী লীগের সৃষ্ট। ধর্ষণে জড়িত ছাত্রলীগের কর্মীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই এ ধরনের নৈরাজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। এ আওয়ামী লীগ একটা ব্যাপারে সফল হয়েছেÑ তারা সারা দেশের সব মানুষের মধ্যে একটা ত্রাস সৃষ্টি করতে পেরেছে। একটা ভয়-ভীতি সৃষ্টি করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের শাসনে মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, একসময় যারা উচ্চকণ্ঠে ছিলেন মানুষের দাবি-দাওয়া, সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন, তারাও এখন কথা বলছেন না।

এদিকে বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতা ও মন্ত্রীরা। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, নারী নির্যাতনকারী, দুষ্কৃতকারীর কোনো দল নেই। এদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। এতে অপরাধ কমে আসবে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা রাজনীতি করতে চাইছেন। এমসি কলেজের ঘটনা মির্জা ফখরুল ভিন্ন খাতে নিয়ে রাজনীতি করছেন। মনে রাখতে হবে, দুষ্কৃতকারী যে-ই হোক তার দল নেই; সে অপরাধী। অপরাধের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। এমসি কলেজের ঘটনাতেও অপরাধী যারাই হোক তাদের শাস্তি পেতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্বামীর কাছ থেকে ওই গৃহবধূকে জোর করে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের সামনে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ সময় কলেজের সামনে তার স্বামীকে আটকে রাখে দুজন। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ছয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরও তিনজনকে আসামি করা হয়। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় এখন পর্যন্ত এজাহারনামীয় ছয় আসামিসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিলেট রেঞ্জ পুলিশ ও র‌্যাব-৯।

 

"