শাহানারা স্বপ্না

  ১৮ এপ্রিল, ২০২৩

মোগল যুগে ঈদ-উৎসব

বিশ্বের মুসলিম বছরে দুটি ঈদ-উৎসব পালন করে থাকেন। এক মাস রোজা রাখার পর উদযাপন করেন ‘ঈদুল ফিতর’ বা রোজার ঈদ। অন্যটি আত্মত্যাগের ‘কোরবানির ঈদ’। ঈদের সামাজিক অর্থ খুশি আর আভিধানিক মানে হলো ফিরে আসা। তাই প্রতি বছরই মুসলিমদের জীবনে ফিরে ফিরে আসে ঈদ-উৎসব।

ইসলামই প্রথম সমাজের ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে, সব মানুষকে এক কাতারে শামিল করে উৎসব পালনের ধারা সৃষ্টি করে। এজন্যই ঈদুল ফিতরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ‘জাকাতুল ফিতর’-এর বিধান।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর হিজরি দ্বিতীয় সন থেকে ঈদ-উৎসবের রীতিনীতি চালু হয়। রমজান মাসেই নাজিল হয় পবিত্র ‘আল-কোরআন’। এ মহাগ্রন্থের স্মরণে আল্লাহর নির্দেশে রাসুল (সা.) মুসলিমদের জন্য বছরে দুটি উৎসব পালনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক জাতিরই উৎসব রয়েছে, আমাদের হলো ঈদ উৎসব’। মদিনায় সাহাবিদের নিয়ে তিনি ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চে প্রথম ‘ঈদুল ফিতর’র নামাজ আদায় করেন।

এরপর থেকেই মুসলিমজাহানে মহাসমারোহে শুরু হয় ঈদ উদযাপন। সমাজের সবস্তরের মানুষ এ দিনে সাধ্যমতো ভালো পোশাক পরে, ভালো ভোজের আয়োজন করে, আত্মীয়-স্বজন-পাড়াপ্রতিবেশীর সাহায্য এবং খোঁজ নেয়। ঈদগাহে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে একত্রে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করে। পরস্পর কোলাকুলি করে ও একে অপরের দিকে সম্প্রীতির হাত বাড়িয়ে দেয়- এটাই ঈদের শিক্ষা এবং আনন্দের মূল সুর।

এ দেশে প্রায় পাঁ চশ বছরের মোগল রাজত্ব স্বর্ণশিখরে পৌঁছেছিল। প্রথম মোগল সম্রাট বাবর ছিলেন সুন্নি মুসলমান। তিনি ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলতেন। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজ দরবারের সভাসদদের ঈদের শুভেচ্ছা জানানো, প্রীতিভোজ, শোভাযাত্রা, বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতেন। পরবর্তী সব মোগল সম্রাটই ঈদ উৎসব পালন করেছেন অমিত ঐশ্বর্যে।

ইতিহাসবিদ গুলবদন বেগম তার ‘হুমায়ুননামা’য় লিখেছেন, ‘বাদশাহ হুমায়ুন চুনার যুদ্ধ শেষে নিরাপদে আগ্রায় ফিরে এলেন। এ উপলক্ষে আমার মা বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। সমস্ত নগর আলোকময় সুসজ্জিত করা হলো। তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সেনাদের প্রতি নির্দেশ জারি করলেন যে, তারাও যেন নিজেদের আবাসিক এলাকা সুসজ্জিত করেন। এদিন থেকে হিন্দুস্তানে এ ধরনের উৎসবে আলোকসজ্জা করা রেওয়াজে পরিণত হলো’।

মোগল বাদশাহরা নওরোজ (বছরের প্রথম দিন), ঈদ-উৎসব, জন্মদিন, বিয়ে, রাজ্য জয় ইত্যাদি উপলক্ষকে জাঁকজমকভাবে উদযাপন করতেন। আর এসব উৎসবে তারা রাজকীয় ভোজ, উপহার, রাজকীয় শোভাযাত্রা, প্রচুর ধন-রত্ন, খিলাত ও উপঢৌকন বিলাতেন।

বাহারিস্তান-ই গায়েবির লেখক মির্জা নাথান অনেক দিন ছিলেন বোকাই নগরে। তার লেখায় পাওয়া যায়, ‘সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় যখন নতুন চাঁদ দেখা যেত, তখন শিবিরে বেজে উঠত শাহি তূর্য অর্থাৎ রণশিঙ্গা এবং একের পর এক গোলন্দাজ বাহিনী ছুড়তে থাকত গুলি, যেন তা আতশবাজি। সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত চলত এ আতশবাজি। শেষ রাতের দিকে বড় কামান দাগানো হতো। কামানের তীব্র শব্দে ভূকম্প অনুভূত হতো।’

মোগলদের হাত ধরেই এ দেশে সাড়ম্বরে উৎসব পালনের রেওয়াজ শুরু হয়। ইফতারিতে বানানো হতো শতাধিক পদের রকমারি আইটেম। এ প্রসঙ্গে শ্রীমতী আভা বসু তার ‘জহন্নম থেকে জন্নত’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘সিনা কাবাব, বোটি কাবাব, মসলাদার চাপ, কিমা সমোসা, মটরকিমা, পাঁপর, দহিবড়া। মিষ্টির মধ্যে মিঠাই-কলাকন্দ, পেস্তা বাদামের কেশরি বরফি, মেওয়াদার লাড্ড, বালুশাহি, আমৃত্তি, সোনার কারুকাজ করা সোনার ফলদানে সেউ, আঙুর, বেদানা, আরো কত কি’!

মোগল নারীরা খয়ের ভিজিয়ে মেন্দিপাতার সঙ্গে বেটে হাত-পায়ে রঙিন নকশা আঁকা প্রচলন করেন। ঈদে রাজমহলের সবার জন্যই নতুন পোশাক বানানো হতো। শ্রীমতী আভা আরো উল্লেখ করেছেন, ‘ওদিকে বারমহলে টানা দালানের ওপর দরজির লাইন বসে গেছে। থান থান কাপড়ের গাঁইট এসেছে। সব পল্টনদের জন্য নতুন উর্দি হবে। রাজমহলের যত নওফর, চাকর, হুকুমবরদার, বাবুর্চি, মাহুত, কোচোয়ান, ভিস্তি আছে সবার জন্য নতুন পোশাক হবে। হেরেমেও সেলাইয়ের ধুম। খানিম, বেগম, বেগাহ, আগাহ, আঘাচা, খাজানসারা, আঙ্গাহা (সেবিকা), নওফরসহ সবার জন্যই নতুন পোশাক তৈরি হচ্ছে। ফরমায়েশ মত গারারা, কামিজ সুট, আঁটো চুড়িদার পাজামা, আঙ্গরাখা ইত্যাদি। তাতে চমক ফোটাতে জরি সুতা, সলমা-চুমকি, জরদৌজি, জরির গোটার পাহাড়। এসব বেহ্তরিন পোশাকের জন্য রং-বেরঙের সাটিন, সনিল, ভেলভেট, বেনারশি আর মসলিনের থান থান গাঁঠঠি হাজির’।

অ্যালেক্স র‌্যাদারফোর্ড তার ‘অ্যাম্পায়ার অব দ্য মোগল রুলার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ‘মোগল বাদশাহ আকবর নিজের ওজনের পাল্লা মেপে স্বর্ণ-রৌপ্য-হীরা মুক্তা-মাণিক্য, রেশমি বস্ত্র বিলিয়ে দেওয়ার অভূতপূর্ব অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। এ সম্পর্কে তিনি এ বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

‘মোগল আমলে শেষ দিনগুলোয় ঈদ’ বইয়ে বিশ্বেন্দু নন্দ লিখেছেন, রমজানের শেষ শুক্রবার অলবিদা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটিবার। মহামহিম সম্রাট বিশাল মিছিল করে জুমা মসজিদে গিয়ে সবার সঙ্গে জমায়েত হতেন। মসজিদের সিঁড়িতে মহামহিম সম্রাটের জন্য কারুকার্যময় সুনির্দিষ্ট সূক্ষ্ম আকারের একটি রুপোর উজ্জ্বল কেদারা ‘হাওয়াদার’-এ তাকে বয়ে নিয়ে আসা হাতিটির পাশে বসানো থাকত। বাদশাহ সেটিতে বসতেন, তাকে মসজিদে বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। তিনি হাউসে পৌঁছে নামতেন অজু করার জন্য। তার দেহরক্ষীরা চিৎকার করে তার গমন পথের সামনে সক্কলকে সরে দাঁড়াতে বলত। শাহজাদা, অভিজাত, আমিররা তার গমন পথ অনুসরণ করতেন।

উপাসনার সময় বাদশাহর উপাসনার পাটিটা ইমামের পেছনে বসানো হতো। বাঁ-দিকে বসত তার সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী শাহজাদা, অন্যান্য শাহজাদা তার ডান দিকে উপাসনার জন্য বসতেন। সব আয়োজন শেষ হলে তিনি ইমামকে খুতবা পড়তে নেওতা দিতেন। ইমাম খুতবা পড়ার মঞ্চে দাঁড়াতেন। দারোগাইকুর, অস্ত্রাগারের সর্বাধ্যক্ষ ইমামের কোমরে একটি তরোয়াল ঝুলিয়ে দিতেন। ইমাম তরোয়ালের বাঁট ধরে খুতবা পড়া শুরু করতেন।

রমজানের ২৯তম দিনে চাঁদ দেখার জন্য প্রতিনিধি পাঠানো হতো। প্রত্যেকেই চাঁদ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এই আচারটাই রমজানের শেষ হওয়ার ইঙ্গিতবাহী। যদি কেউ চাঁদ দেখতেন, অথবা কোনো গ্রাম থেকে চাঁদ দেখার স্বাক্ষরিত বার্তা এসে পৌঁছাত, শুরু হতো উৎসবের কাল। নাকাড়াখানা থেকে ২৫টা তোপধ্বনি করে পরের দিনের ঈদের উৎসবের বার্তা দেওয়া হতো।

‘ঈদ-উৎসব : একাল ও সেকাল’ প্রবন্ধে শামসুদ্দোহা চৌধুরী লিখেছেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বাদশাহ, আমির-ওমরাহদের উদ্যোগে ঈদের বর্ণাঢ্য শাহি মিছিল হতো, এ মিছিলে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সমাহার থাকত। ইসলামি পতাকা, রং-বেরঙের পতাকা বহন করে চলত পাইকরা, মিছিলের অগ্রভাগে রাজকীয় হাতিতে অবস্থান করতেন সুলতান স্বয়ং। ছাতাবাহী অন্যান্য পাইক বরকন্দাজ দল থাকত পিছু পিছু। ঈদের জামাতে বাদশাহর জন্য নির্দিষ্ট ছিল ‘বাদশাহি কা তখ্ত।’ ‘নামাজের সময় সুগন্ধি গোলাপজল ছিটিয়ে দেওয়া হতো। সম্রাটদের উদ্যোগে মসজিদ আঙিনায় নামাজ শেষে ঈদের খাবার-দাবার বিতরণের প্রচলন ছিল।...ঈদে খাঁচায় আবদ্ধ হিংস্র জন্তুদের নিয়ে খেলাধুলার প্রচলন ছিল। এ ছাড়া লাঠিখেলা, মল্লযুদ্ধ, রাজদরবারে কাসিদা, রাজকবিদের “শায়ের” কাঞ্চনিদের নৃত্যগীত, জাদুকরী আর বেশুমার আতশবাজি ছিল আনন্দের উপকরণ’।

‘নওয়াব সুজাউদ্দীনের অধীন মুরশিদ কুলি খাঁ (১৭০৪-২৫) ঈদের দিন ঢাকার দুর্গ থেকে ঈদগাহর ময়দান পর্যন্ত এক ক্রোশ পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে দিতেন। নওয়াবের সহযাত্রী হয়ে আমির-ওমরাহ, রাজকর্মচারী ও মুসলমান জনসাধারণ শোভাযাত্রা করে ঈদগাহ মাঠে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে’।

ঢাকার ইতিহাসবিদ হাকিম হাবীবুর রহমান বলেছেন, ‘১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শাহসুজার নির্দেশে তার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম একটি ঈদগাহ নির্মাণ করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল ২৪৫ ফুট ও প্রস্থ ১৩৭ ফুট। নির্মাণকালে ঈদগাহটি ভূমি থেকে ১২ ফুট উঁচু করা হয়। ঈদগাহের পশ্চিম দিকে ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে সেখানে মেহরাব ও মিনার নির্মাণ করা হয়। মোগল আমলে দরবার, আদালত, বাজার ও সৈন্য ছাউনির কেন্দ্রে অবস্থিত ছিল এ ঈদগাহ। প্রথমদিকে শুধু সুবেদার, নায়েবে নাজিম ও অভিজাত মোগল কর্মকর্তা এবং তাদের স্বজন-বান্ধবরাই এখানে নামাজ পড়তে পারতেন। পরে ঈদগাহটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।’

মোগল আমলে ঈদ-উৎসব মর্যাদা ও গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতো। ১৬০৮ সালে মোগল সুবাদাররা ঢাকায় আসার পর সেখানেও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। মোগলদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঈদ-উৎসবে নতুন নতুন জৌলুসের মাত্রা যোগ হতে থাকে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়