আবু তাহের

  ১৮ মার্চ, ২০১৭

প্রযুক্তি

মোবাইল ফোন এবং আমাদের সন্তান

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ১৬ বছরের নিচের মেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন না দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে। স্বীকার করতে হবে, এর উপকারিতা অবশ্যই অপকারিতার ঊর্ধ্বে। তারপরও স্থান, কাল, পরিস্থিতি বিবেচনাযোগ্য। একটা সময় ছিল, যখন মোবাইলের ব্যাপক প্রচলন ছিল না। তখন মানুষ কী করত, আমরা তা ভুলে যাইনি। তারপরও চলমান বিশ্বের দাবি এটা। কিন্তু তখন তারাই মোবাইল ব্যবহার করত যাদের প্রয়োজন ছিল আর ছিল সামর্থ্য। এখন সবার সামর্থ্য আছে, কিন্তু প্রয়োজন কতটুকু?

এই প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গেলে অনেকেই এই দোষে দুষ্ট হবেন। দোষ বলছি এই কারণে, অপাত্রে কন্যা দানের মতো যন্ত্রটির অপব্যবহার হচ্ছে খুব বেশি। আর তা আমাদের জন্যই। বর্তমানে মাধ্যমিক স্কুলপড়–য়া হাজার হাজার ছেলেমেয়ে আধুনিক সব ফিচার সংবলিত মোবাইল ব্যবহার করে। কে তাকে দিল এই মোবাইল ফোন? অবশ্যই আমরা (অভিভাবকরা)। কিন্তু কতটুকু প্রয়োজন এই ছোট্ট ছেলে বা মেয়েটির? স্কুলপড়–য়া বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে অনাবাসিক। স্কুলে ব্যয় করা ৪-৫ ঘণ্টা সময় ছাড়া বাকি সময়টা সে বাড়িতে বা খেলার মাঠে দিয়ে থাকে। সে এই সময় মোবাইল দিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবে? উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছেলেমেয়েরাও এ থেকে বাদ যাবে না। কতটুকু প্রয়োজন? এই প্রয়োজনটা কি আজ থেকে ১০ বছর আগে কারো ছিল না! যখন মোবাইল অহরহ ছিল না। তর্কের খাতিরে যদি মানতে হয়, তবে বলছি, বাবা-মা তার সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অর্থাৎ, কোথায় কী অবস্থায় আছে তা জানার জন্য মোবাইলের এই ব্যবহার। কিন্তু দিনে কয়টা ফোন তারা বাবা-মাকে করে আর কয়টা ফোন তাদের এড়িয়ে করা হয়, তার খবর কি আমরা নিই? অবাক করা বিষয় হলো, রাজধানীর প্রথম সারির নটর ডেম কলেজে যেকোনো ধরনের মাল্টিমিডিয়া মোবাইল সেট ব্যবহার নিষিদ্ধ। যদি একান্ত কেউ ব্যবহার করতে চায়, তবে সাধারণ মানের সেট ব্যবহার করতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বুঝল, আমরা বুঝলাম না।

বর্তমানে আমাদের ছেলেমেয়ে খারাপ হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান একটি কারণ এই মোবাইল। কী নেই এই ফোনে? বর্তমানে অধিকাংশ ছেলেমেয়েকে দেখা যায় সারাক্ষণ কানের ভেতর হেডফোন ঢুকিয়ে ব্যস্ত থাকতে। এটা এখন একটা ক্রেজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এফএম রেডিও, গান, গজল, শুনতে শুনতে এদের কান ঝালাপালা। এছাড়া যথেষ্ট পরিমাণ শারীরিক ক্ষতিও রয়েছে। রয়েছে হারানোর ভয়। মোবাইল ফোন সব সময় ঠিক জায়গায় আছে কি না তা নিয়ে মনকে সতর্ক রাখতে হয়। মোবাইল হারানোর ভয় থেকে মনের মধ্যে জন্ম নেয় নানা সমস্যা। গবেষকরা মোবাইল ফোন ও এর সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর ভয়জনিত অসুখের নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’। যার পুরো নাম ‘নো মোবাইল-ফোন ফোবিয়া’। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণ এ রোগের শিকার। পাঁচ বছর আগেও যে রোগের কাল্পনিক অস্তিত্ব ছিল না। আধুনিকতার এ রোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে চিন্তিত মনোবিজ্ঞানীরা।

এছাড়াও কমতে পারে চোখের জ্যোতি। যুক্তরাজ্যের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে দৃষ্টি বৈকল্য সৃষ্টি হতে পারে। এতে করে মায়োপিয়া বা ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা সাধারণত চোখ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রেখে তা ব্যবহার করেন। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এ দূরত্ব মাত্র ১৮ সেন্টিমিটার। সংবাদপত্র, বই বা কোনো কিছু পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চোখ থেকে গড়ে ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব থাকে।

অবিরত মোবাইল ব্যবহারে কমে যেতে পারে শুক্রাণু। গবেষকরা জানান, মোবাইল ফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও। গবেষকদের দাবি, মোবাইল ফোন থেকে নির্গত ক্ষতিকর তরঙ্গ শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে এবং শুক্রাণুর ঘনত্ব কমিয়ে দিতে সক্ষম।

তাছাড়া এখন অধিকাংশ ছেলেমেয়ে রাত জেগে এফএম রেডিও শোনে। রাত ১টা-২টা পর্যন্ত তারা নির্ঘুম থেকে অনুষ্ঠান শুনতে থাকে। এটা এখন একটা ব্যধির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিডিও গানের কথা বাদই দিলাম। নগ্ন ছবি, ভিডিও দেখা তো এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটের সুবাদে এগুলো তো এখন হাতের নাগালে। ফেসবুক তো আরো একটা কঠিন ব্যাধি। সারাক্ষণ চ্যাট আর দিনরাত এসব ছবি, ভিডিও দেখে তারা যে তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, তার কি আমরা কখনো খবর রাখি?

প্রেম-ভালোবাসা তো এখন আর কারো অজানা নয়। আর এর অন্যতম হাতিয়ার হলো এই মোবাইল ফোন। দিন-রাত সারাক্ষণ এর মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা অবাধে ভালোবাসার গান গায়, বিকৃত আলাপ চালায়। আপনারা হয়ত খেয়াল করে থাকবেন সব মোবাইল অপারেটর তাদের বিশেষ সুবিধাটা রাত ১২টার পর দিয়ে থাকে। অদ্ভুত, কোনো সুস্থ মস্তিকের লোক কি রাত ১২টার পর ফোনালাপ করে? যারা করে, তারা আমাদেরই সন্তান। গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পর শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনার জন্য বাড়তি সময় পেয়েছেন। ইংল্যান্ডের চারটি শহরের স্কুলে জরিপ চালিয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এই সমীক্ষাটি প্রকাশ করেছে। ফোন নিষিদ্ধ করার আগে ও পরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে এই মন্তব্য করা হয়। এছাড়াও দেখা গেছে, যেসব স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল অন্য স্কুলের তুলনায় ৬ শতাংশ ভালো।

গবেষকরা বলছেন, স্বল্প আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েদের উন্নতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ব্রিটেনে ৯০ শতাংশেরও বেশি কিশোর-কিশোরী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকে। নতুন নতুন স্মার্ট ফোনের অনেক সুবিধা থাকলেও এসব ফোন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করে। এতে পড়ালেখারও ক্ষতি হয়। এটি একটি উদাহরণ এবং বাস্তবতাও।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। অথচ বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই উৎসাহী কিছু শিশু-কিশোর ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তির সব মোবাইল হ্যান্ডসেট। বিস্ময়কর সত্য যে, শিশু শিক্ষার্থীদের মোবাইল হ্যান্ডসেট কিনে দেওয়ার আবদার পূরণ করছেন খোদ অভিভাবকরাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি প্রযুক্তি নিয়ে শিশু-কিশোরদের অতি আগ্রহ, মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা ও স্বল্প দামের কারণে শিশুদের মধ্যে মোবাইল ফোন নিয়ে ‘কৃত্রিম চাহিদা’ তৈরি হয়েছে।

শ্রেণিকক্ষে বা কোচিংয়ে পড়তে গিয়ে মোবাইল ফোনে সংযুক্ত ক্যামেরা দিয়ে স্কুল-কলেজের ছেলে শিক্ষার্থীরা তুলছে সহপাঠী মেয়ে শিক্ষার্থীদের ছবি। পরে ছবিগুলো অপব্যবহার করে আপত্তিজনকভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছে অন্য সহপাঠীদের মোবাইল সেট ও ইন্টারনেটে। মেয়ে শিশু ও কিশোরীদের অবস্থাও নাজুক। হঠাৎ মোবাইল ফোন হাতে পেয়ে কৌতূহলবশত অবুঝ মেয়ে শিক্ষার্থীরা স্বল্প সময়ের কথোপকথনে অপরিচিতদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে প্রেমের সম্পর্কে। এদের অনেকে পরবর্তীতে ফোনে কথা বলা যুবকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। আর প্রতারিত হয়ে আবেগবশত এই কিশোরীরা কখনোবা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছিলেন, শিশু-কিশোরদের আচরণে এখন যে নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার জন্য প্রযুক্তি দায়ী। তিনি বলেন, প্রযুক্তি অনেকটা ছুরির মতো।

এ জন্য প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার। একবার চিন্তা করা প্রয়োজন, সন্তানের মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? তা কি একেবারে না হলেই চলে না? আমার সন্তান কেমন তা আমিই ভালো জানি। এই মোবাইল তার জন্য সুফল না কি কুফল বয়ে আনবে? যদি একান্ত প্রয়োজনের খাতিরে তাকে মোবাইল কিনে দিতেই হয়, তবে আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে সাধারণ মানের সেট কিনে দেওয়াই শ্রেয়। আমার সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত আমাকেই গড়ে তুলতে হবে। আর তা সঠিক সময়ে, সঠিক পন্থায়।

লেখক : শিশু সাহিত্যিক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist