মো. হাছিবুল বাসার

  ১১ জুন, ২০২১

ফিরে দেখা

ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে মুসলমান

ভারতবর্ষের সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, কারিগরি তথা মানুষের জীবনধারায় মুসলমানদের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা এ দেশের মানুষের জীবনে যে বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে, তা উপমহাদেশের পুরোনো পদ্ধতির চেয়ে ভিন্নতর। আধুনিক ইউরোপের জীবনধারা তথাকার মধ্যযুগীয় জীবনধারার হতে সম্পূর্ণ বিপরীত ও আলাদা।

মুসলমানদের ভারত বিজয়ের আগেই দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে আরব বণিকরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। অবশ্য আরব ও উপমহাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই ছিল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম মুসলমান পর্যটকরা নৌপথে ভারতীয় উপকূলভাগে অবতরণ করেন। পরে উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। কেরালা, সুরাট, কালিকট প্রভৃতি সমুদ্রতীরবর্তী বন্দরমালা, মালদ্বীপ, লাক্ষ্যদ্বীপ ও সরদ্বীপ প্রকৃতি ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং লাহোর, মুলতান, কাবুল প্রভৃতি ভারতীয় ও ভারত প্রভাবিত নগরগুলো এ সময়ে গড়ে উঠে এবং তা বহির্বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। বলা বাহুল্য, কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যই মূলত এসব স্থানের খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আরবজাতি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর আরব বণিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ভারতে ধর্মপ্রচারে লিপ্ত হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে দ্বীন ইসলাম আসার প্রায় ১০০ বছর পর ভারতে মুসলমান শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে।

অষ্টম শতাব্দীতে উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের শাসনামলে ইরাকের গভর্নর ছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। তার নির্দেশনায় ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাশিম ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অভিযান করেন। এতে আরবরা পাকিস্তানের সিন্ধু ও মুলতান প্রদেশ জয় করেন। পরবর্তীতে সিন্ধু প্রদেশ উমাইয়া খিলাফতের অন্যতম প্রদেশে পরিণত হয়। সিন্ধু বিজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম সেখানকার দায়িত্ব লাভ করেন। সিন্ধু ও মুলতানি দক্ষ শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তার অধীনে থাকা সব ধর্মাবম্বলীর নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেন। ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে আল ওয়ালিদের মৃত্যু হলে খলিফা সুলেইমান উমাইয়া খলিফা হন। পরে ব্যক্তিগত আক্রোশের জেদ ধরে মুহাম্মদকে কারারুদ্ধ করেন। কারাগারে কাশিমের মৃত্যু হলে মুসলমানদের বিজয় মুলতান ও সিন্ধু পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। পরে মুহাম্মদ বিন কাশিমের বিজয়কে ভিত্তি করেই ভারতে দীর্ঘস্থায়ী মুসলমান শাসনের স্বপ্ন দেখেন মুসলমানরা।

দশম শতাব্দীর শুরুতে গজনির মাহমুদ পাঞ্জাবকে গজনাভিদ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এটি ছিল মুসলিম অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়। তবে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মুহাম্মদ ঘুরীর ভারতবর্ষে অভিযান চালান। ভারতে মুসলমানদের তৃতীয় ও চূড়ান্ত অভিযান মুসলিম শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করে। দেখা যায়, ভারতে প্রতিটি মুসলিম অভিযানসমূহের প্রকৃতি ছিল একই রূপ। সুলতান মাহমুদ, সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী এবং সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ভারতীয় সমাজের কোনো প্রকার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটাননি। তবে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তার ঘটান। ভারতবর্ষ মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, লোকাচার ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনধারায় মুসলমানরা নতুন রুচিবোধ যোগ করে। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধতর। তবে কোনো কোনো বিদ্বেষভাবাপন্ন ইতিহাসবিদ ভারতে মুসলমানদের আগ্রাসী ও লুটেরারূপে চিহ্নিত করেছেন। যা সত্যিকার অর্থে কাল্পনিক, ভিত্তিহীন ও সংকীর্ণতা প্রণোদিত।

ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমনের সময়ে ভারতে প্রাচীন বিদ্যা ও দর্শনের প্রচলন ছিল। সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণে সভ্য ও উন্নত বিশ্ব থেকে ছিল বেশ পিছিয়ে। মুসলমানদের আগমনের পূর্বে বাহিরের জগতের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক ছিল না। বহির্বিশ্বের চিন্তাচেতনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, নিয়মকানুন সম্বন্ধে ছিল অজ্ঞ। মুসলমানদের আগমনের পরেই ভারতীয়রা পায় বাস্তব ও পরিপক্ব জ্ঞান। ফলে বিশ্বে ভারতীয়রা আরো সমৃদ্ধশালী ও সংস্কৃতিবান জাতি হিসেবে পরিচিত হয়। ভারতীয় সভ্যতা ও ধর্মের ওউপর ইসলামের অপ্রতিহত উল্লেখ করতে গিয়ে বিশিষ্ট পন্ডিত ও ইতিহাসবিদ ড. এ কে এম পানিকর বলেন, ‘One Thing is Clear; Islam had a profound effect on Hinduism durning this period. Medieval theism is in some ways a reply to the attack of islam; and the doctrines of medieval teachers by whatever names their gods are known are essentially theistic. It is the one Supreme God that is the object of the devotees adoration and it is to His grace that we are asked to look for redemption.’ অর্থাৎ মুসলমানদের বদৌলতে হিন্দুদের মধ্যে স্রষ্টার উপাসনার ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের সাম্যের ধারণা ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা ছিল ভারতের সমাজ জীবনের মূল্যবান বস্তু। ফলে মধ্যযুগের ভারতীয় বর্ণপ্রথার সমাজ শৈথিল্য লাভ করে। ভারতীয় সমাজ কাঠামোতে ইসলাম ও মুসলমানদের অপ্রতিহত উন্নত প্রভাব নিয়ে জওহরলাল নেহরু বলেন, ‘The impact of the invaders from the northwest and of Islam on India had been considerable. It had pointed out and shone up the abuses that had crept into Hindu society Í the petrification of caste, untouchability, and exclusiveness carried to fantastic lengths.The idea of brotherhood of islam and theoretical equality of its adherents made of a powerful appeal especially to those in the Hindu fold who were denied any semblance of equal treatment.’ অর্থাৎ মুসলমানরা হিন্দু সমাজে কুসংস্কার দূরীকরণে ভূমিকা রাখে। মুসলমানরা ভারতে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের অনেক শাখার প্রবর্তন করেন; যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইতিহাস। মুসলমানদের অনুপ্রবেশের পূর্বে ভারতবর্ষ ইতিহাস লিখন ও চর্চায় অপরিচিত ছিল। ধর্মীয়ও যুদ্ধের কাহিনি ব্যতীত ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য প্রামাণিক গ্রন্থ ভারতে ছিল না। মুসলমানদের ভারতে সেনা অভিযানের পর মুসলমানরাই ভারতের প্রথম ইতিহাসবিদ। ফলে ইতিহাসচর্চাকে বেগবান করতে মুসলিমরা বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। পুরো ভারতবর্ষে পাঠাগারকে ছড়িয়ে দেয়। তাছাড়া সর্বপ্রথম মুসলমানরা ভারতে ইউনানী চিকিৎসা নামক এক নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আসেন। যা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে রোগ নিরাময়ে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ছিল। পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, উন্নত, অধিকতর সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হওয়ায় ভারতে দ্রুতই ইউনানী চিকিৎসার প্রসার ঘটে। এখনো পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে এ চিকিৎসা পদ্ধতি বহুল প্রচলিত ও জনসমর্থিত হয়ে আছে।

মুসলমানদের আগমনের পূর্বে ভারতের কৃষিকাজে তেমন উন্নতি ছিল না। মাটির উর্বরতা থাকা সত্ত্বেও কম ফলমূল পাওয়া যেত। মুসলমানরা কৃষিকাজে উন্নত প্রযুক্তি যোগ করে এবং ফল চাষে দ্রুত অগ্রগতি দেখায়। মুঘলরাই সর্বপ্রথম বিভিন্ন প্রজাতির আমের পরাগায়ন ও কলমের মাধ্যমে সুস্বাদু ও সুমিষ্ট আমের উদ্ভাবন ঘটায়। ফলে ধীরে ধীরে ভারতবর্ষে আমের বৈচিত্র্য ঘটে। ১৫১১ সালে সুলতান মাহমুদ গুজরাটে বস্ত্রের কারখানা স্থাপন করেন। সেচ সুবিধার জন্য বিশাল খাল ও কূপ খননও তার জনহিতকর কাজের মধ্যে ছিল। সম্রাট আকবরের সময়ে পুরো ভারতবর্ষ কাপড় তৈরির কারখানা হিসেবে পরিচিতি পায়। মুঘল সম্রাটরা ভূমি জরিপ, রাজস্ব নির্ধারণ ও সংগ্রহের মাধ্যমে কৃষিতে সংস্কার সাধন করে। অসংখ্য হাসপাতাল, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ, গণপার্ক তৈরিতেও মুসলমানদের অবদান ছিল। তাছাড়া পরিচ্ছনতা ও উন্নত জীবনধারার সঙ্গে ভারতীয় আদিবাসীদের পরিচয় করিয়ে দেয় মুসলমানরা। ভারতীয়রা রুচিবোধ, সংস্কৃতিপ্রীতি, খাদ্য, পানীয়, স্বাস্থ্যবিধি, পানি নিষ্কাশন, গৃহ নির্মাণ কৌশল ও তৈজসপত্রের ব্যবহারও মুসলমানদের কাছ থেকে শিখেছে। এককথায় মুসলমানরা ভারতের সামাজিক রীতি, জীবনাচার ও গৃহসজ্জায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়।

ভারতে মুসলমান আমলে মুসলমানরা শুধু সংগীতচর্চা করেননি, চিত্রচর্চাও করে। তাদের চিত্রচর্চার রীতি, মোটামুটিভাবে ইরানি রীতি; এটি ভারতীয় রীতি হতে পৃথক। ভারতের চিত্রজগতে মুসলমানদের এই রীতি ভারতীয় রীতির সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে ‘মোগলাই রীতি’ মানে একটি পৃথক ভারতীয় অঙ্কন-শিল্পের সূচনা করে। ভারতীয় মুসলমানরা সংগীতচর্চার জন্য চিরখ্যাত। তাদের সংগীতবিদ্যা ও যন্ত্র ভারতীয় এ অংশের সংশ্রবে এসে নতুন রূপ গ্রহণ করে। ফলে ধুরপদ, ভৈরব, মেঘমল্লার, গান্ধার প্রভৃতি ভারতীয় রাগ-রাগিণীর সঙ্গে মুসলমানদের গজল, কাওয়ালি, দাদরা, খেয়াল একীভূত হয়ে নতুন মূর্ছনার জন্ম দেয়। বীণা, মুরলী, ঢাকঢোল প্রভৃতি ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র জগতে মুসলমানদের তবলা, রবার, সেতার, নাকাড়া প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রও স্থান করে নেয়। ধীরে ধীরে ঠুমরী, টপ্পা, জৌনপুরী, আশাবরী প্রভৃতি নানা মিশ্র রাগিণীর উদ্ভবে ভারতীয় সংগীতে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

বহির্বিশ্বের সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার পরিচয়ে মুসলমানদের অবদানও কম নয়। রাজনৈতিক ঐক্য, সংস্কৃতি এবং পোশাকে শালীনতা আনতে কাজ করেছে ইসলাম। আঞ্চলিক ভাষার উৎকর্ষ সাধন এবং নৌবহরের উন্নতি সবকিছুই ঘটেছে মুসলমানদের হাত ধরে। মূলত ইসলাম ভারতবর্ষে একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছিল। যার প্রভাব এখনো ভারতীয় সভ্যতায় বিরাজমান। ভারতবর্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের আগমন ইতিহাসে এমন এক নতুন যুগের সূচনা করেছে; যা শিক্ষা, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ফলে ভারতের সভ্যতা বিকাশে মুসলিমদের এই অবদান ইতিহাস হয়ে থাকবে। মোদ্দাকথা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতীয় সংস্কৃতি মুসলিম সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং লাভবানই হয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস

ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়