জুবায়ের আহমেদ

  ২৬ নভেম্বর, ২০২০

মুক্তমত

পারিবারিক সহিংসতা ও আইন প্রয়োগ প্রসঙ্গে

জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য-বিলোপ সনদ, ১৯৭৯ ও শিশু অধিকার সনদ ১৯৮৯-এ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ২০১০ সালে নারী ও শিশুর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ পাস করে। ওই আইনের লঙ্ঘন কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও পারিবারিক সহিংসতা থেকে নারী ও শিশুরা এখনো নিরাপদ নয়। বিশেষ করে স্বামীর গৃহে স্ত্রীকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখা, পিতার গৃহে কন্যাসন্তানকে অধিকার বঞ্চিত করে রাখা, অধিকার প্রয়োগে বাধাদান, শিশুসন্তানকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মধ্যে নারীকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইনেও বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো স্ত্রীরা স্বামীর গৃহে নিরাপদ নয়। স্বামী-শ্বশুর, দেবর-ননদের হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে, অবহেলার শিকার হতে হচ্ছে। শিশুসন্তানকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য কিংবা শাসনের নামে নির্যাতন করা হচ্ছে। গৃহবধূ একাধিক কন্যাসন্তানের জন্ম দিলে কিংবা পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে না পারলে এটি স্ত্রীর দোষ হিসেবে গণ্য করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে, তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে। কন্যাশিশুকে অনাদর-অবহেলায় ফেলে রাখা হচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতা এমনই এক ভয়ানক কর্মকা- যে, এসব অপরাধকে পারিবারিক বিষয় হিসেবে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে আমাদের সমাজব্যবস্থা। যার ফলে নারী ও শিশু নীরব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

------
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে বিশ্বে ৮৭ হাজার নারীকে হত্যা করা হয়েছে। তার মধ্যে ৫৮ শতাংশ খুন হয়েছে একান্ত সঙ্গী অথবা পরিবারের সদস্যদের হাতে। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের এক গবেষণার তথ্য মতে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার দুই-তৃতীয়াংশই হয় পারিবারিক পরিম-লে। আর সহিংসতার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিবাহিত নারীর ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার হন স্বামী দ্বারা। এ ছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি-দেবর-ননদদের দ্বারাও নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন নারীরা।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা তাদের পূর্ণ অধিকার কখনো পাননি, এখনো পাচ্ছেন না। নারীশিক্ষার হার বাড়লেও তাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো, সম্পদের অংশ প্রদান এবং পরিবারে তাদের পূর্ণ অধিকার বাস্তবায়নে স্বয়ং বাধা হয়ে দাঁড়ান পরিবারের সদস্যরাই। এর জন্য সমাজও কম দায়ী নয়। পারিবারিক সহিংসতা আইনের বিষয়টি শুধু পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ বিষয়ে হলেও এর সঙ্গে জড়িত আছে সমাজের ভুল প্রচলিত নিয়মকানুনও। নারী মানেই ভোগের বস্তু ও ঘরে থাকার মানুষ মনে করে সমাজে নারীদের নিয়ে যে ভুল রীতিনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, তা থেকে বের হওয়াও জরুরি। এর জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারের সদস্যদেরই। নারীর প্রতি সব ধরনের পারিবারিক সহিংসতা পরিহার করে নারীকে তার স্বাধীন মতামত গ্রহণের সুযোগ এবং পরিবারের ওপর তার সব অধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই। পাশাপাশি কন্যাসন্তান অভিশাপ নয়, সম্পদ এবং নারী-পুরুষের মধ্যে ধর্মীয়ভাবেও কোনো বৈষম্য নেই এ সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।

পরিসংখ্যানে জানা যায়, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাগুলোতে নারীরা আইনের আশ্রয় গ্রহণ করেন খুব কম। গ্রহণ করলেও তা নিষ্পত্তি হয়ে যায় অপরাধ প্রমাণের আগেই। এটি নারীর উদারতার অংশ হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না বরং বাড়ছেই দিন দিন। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এ নারী ও শিশুর সব অধিকার সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ওই আইনের লঙ্ঘনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নারী ও শিশুর অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা ও কার্যক্রম গ্রহণের পদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এই অবস্থায় পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া ব্যক্তিরা ওই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন এবং একই সঙ্গে আদালতসহ সব দায়িত্ববান ব্যক্তি কর্তৃক পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়া সবার সুরক্ষা নিশ্চিত কল্পে ওই আইনের বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যরোধের বিকল্প নেই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়