বিশ্লেষণ

পেঁয়াজেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব

বশিরুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

গত বছর আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয় ভারত। এতে করে দেশের বাজারে সৃষ্টি হয় এক নৈরাজ্যকর অবস্থা। অসাধু ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে দিশাহারা হয়ে পড়েন ক্রেতারা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের লোকজন। আর এ উত্তাপের আঁচ সাধারণ মানুষসহ সরকারের গা ছুঁয়ে যায়। মিডিয়াসহ সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে। তারপরের প্রতিক্রিয়া তো সবার জানা। পেঁয়াজের দামের বিশ্বরেকর্ড হয়েছিল। সরকারকে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছিল, এমনকি ভিআইপি মর্যাদায় পেঁয়াজ এসেছিল বিমানে চড়েও।

এ বছর একই সময়ে ভারত আবার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকেই অস্থির হয়ে উঠেছিল পেঁয়াজের বাজার। কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে ভারত অল্প কিছু পেঁয়াজ রফতানি করবে এমন খবরে মানুষ আশান্বিত হয়েছিল। এমনকি পেঁয়াজের দামও কিছুটা নিম্নমুখী হতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর হিলি ও সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আবারও পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত। তবে সরকারের নানা পদক্ষেপের ফলে দেশে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা কেন পেঁয়াজে স্বনির্ভর হতে পারছি না। অথচ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ কিন্তু আমাদের রয়েছে। এজন্য পেঁয়াজ সংরক্ষণের দিকে মনোযোগী হতে হবে, যাতে সারা বছরই পণ্যটির সরবরাহ অব্যাহত রাখা যায়। এ ছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। মজুদ ব্যবস্থা জোরদার করাসহ স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে। পেঁয়াজচাষিদের একটি নির্ভরযোগ্য স্থিতিশীল বাজারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমাদেরও একটু দাম দিয়ে পেঁয়াজ খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে; যাতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

সরকারি হিসাবে, দেশে প্রতি বছর ২৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। তবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ থাকে। অথচ চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ টন পেঁয়াজের। বাকি ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, যার বেশির ভাগই আসে ভারত থেকে। প্রতিবেশী দেশ, সড়কপথে দ্রুত আনা, কম দাম বিবেচনায় প্রধানত ভারত থেকেই বেশির ভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। তবে এ আমদানি পরিহার করে দেশে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব। এজন্য দেশের চাহিদার পুরোটা পূরণ করতে হলে দেশেই অন্তত ৩৫ লাখ টন উৎপাদন করতে হবে। তাহলে যেটুকু নষ্ট হবে, তা বাদ দিয়ে বাকি পেঁয়াজ দিয়ে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

একসময় আমাদের চালের খুবই সংকট ছিল। ভারত, ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করতে হতো। এখন আমাদের সেই সংকট নেই। ধারাবাহিকভাবে দেশে বেড়েছে চালের উৎপাদন। এ কারণে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে চাল উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে উঠেছে এসেছে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য নিয়ে সম্প্র্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। গেল বছরের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। বিশ্বে গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় তিন টন। আর বাংলাদেশে তা ৪ দশমিক ১৫ টন। এটা দেশের চাল উৎপাদনের সামর্থ্যরেই বহিঃপ্রকাশ। এমনকি চাল আমরা কয়েকবার রফতানিও করেছি।

কোরবানির সময় গরু নিয়েও আমাদের অনেক ভুগতে হয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যাও আমরা কাটিয়ে উঠেছি। এখন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশে পর্যাপ্ত গরু উৎপাদন হচ্ছে। সংকট থেকে যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের গবাদিপশু খাত। পাঁচ বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। আমাদের গরুর চাহিদা আমাদের খামারিরাই মিটিয়ে দিচ্ছেন। গরু ও ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ।

দেশে একসময় ইলিশের অভাব ছিল। এখন সংকট নেই। পৃথিবীতে ইলিশ আহরণকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। বাংলাদেশ মোট ইলিশ উৎপাদনের ৮০ শতাংশ আহরণ করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৯-২০২০ সমাপ্ত অর্থবছরে সেই রেকর্ড ভেঙে এখন পর্যন্ত ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ গত ১১ বছরের ব্যবধানে দেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ। অন্যান্য মাছের চাহিদাও চাষের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। মাছ চাষেও আমরা চতুর্থ।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে পেঁয়াজ কেন আমাদের এখনো ভোগাচ্ছে!

আমার মতে, চাল, গরু, মাছ সমস্যার সমাধান আমরা যেভাবে করেছি, সেভাবে পরিকল্পনা করলে শতভাগ পেঁয়াজ দেশে উৎপাদন সম্ভব। একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমি যতটুকু জানি, সে সমস্যার সমাধান আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা বের করে দিয়েছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেটার ব্যবহার কম বলে বারবার আমাদের এ পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পেঁয়াজের গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন যে জাতগুলো উদ্ভাবন করেছে, সেগুলো নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর মাঠপর্যায়ে ব্যাপক হারে কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে।

পেঁয়াজ আমাদের দেশে মূলত শীতকালীন ফসল। শীতকালের চাষকৃত পেঁয়াজ দিয়েই আমাদের ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। যেহেতু দরকার মাত্র ৩০ শতাংশ, তাই একটা নির্দিষ্ট জোন বা এলাকায় চাষ করলেই চলে। কোন কোন এলাকায় চাষ করা হবে আর কীভাবে কৃষকদের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী করে তুলতে হবে, সেটার জন্য পথ খুঁজে বের করতে হবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টদের। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী যারা রয়েছে তাদের আরো বেশি জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

আমাদের দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা বারি পেঁয়াজ-২, বারি পেঁয়াজ-৩ এবং বারি পেঁয়াজ-৫ জাতের তিনটি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। যার স্বাদ এবং ফলন কোনোটাই শীতকালীন পেঁয়াজের চেয়ে কম নয়। এরমধ্যে বারি পেঁয়াজ-২ এবং ৩ বিশেষভাবে খরিফ মৌসুমে চাষ করার জন্য উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। এসব পেঁয়াজের বীজ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের ভেতর জমিতে বুনতে হয়। এসব বীজ গজানোর পর এপ্রিল মাসে মাঠে চারা রোপণ করা হয়। গ্রীষ্মকালীন চারা মাঠে লাগানোর ৮০ থেকে ৯০ দিনের ভেতর পেঁয়াজ সংগ্রহ করার উপযোগী হয়ে যায়। ফলে জুলাই-আগস্ট মাসের ভেতর সংগ্রহ করে ফেলা সম্ভব। যা শীতকালীন পেঁয়াজ সংগ্রহ করার চার মাস আগেই পাওয়া যায়। প্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বর্ষাকালেও চাষ করা যায়। এ ক্ষেত্রে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে চারা উৎপাদন করতে হয়। উঁচু জমি হলে ভালো হয়। যাতে জমিতে পানি জমতে না পারে। জুলাই থেকে আগস্ট মাসে চারা করে সেপ্টেম্বর মাসেই চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। এতে করে অন্তত দুই মাস আগেই পেঁয়াজ সংগ্রহ করা যায়। বর্ষাকালে লাগালে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ জাতগুলো ৫০ থেকে ৫৫ দিন পরেই সংগ্রহ করা যায়। এর ফলে দেশে শতভাগ পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব।

দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী প্রধান এলাকা পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মাগুরা, বগুড়া ও লালমনিরহাট। এসব এলাকায় কৃষকের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে বেশি বেশি উৎসাহ দিতে হবে। সর্বোপরি সঠিক নিয়মানুযায়ী গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করা গেলে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা শূন্য শতাংশে নেমে আসবে। সেসঙ্গে আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করব।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। আর পেঁয়াজের জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি পেঁয়াজ দিয়েই আমরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"