পরিবেশ
উন্নয়নের প্রকৃতিবান্ধব ভাবনা
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

আরণ্যক উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় লবটুলিয়ায় চাকরি পেয়েছিলেন বিশ-তিশ হাজার বিঘা জমি বন্দোবস্তের। তখন ইংরেজ শাসন চলছে ভারতবর্ষে। ১৯২৪ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের পাথরিয়া ঘাটা স্টেট ম্যানেজার থাকার সময় পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরে বিশাল বনাঞ্চল ভ্রমণ করেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে উপন্যাস লেখেন পরে। জমিদারের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশাল বনাঞ্চল তিনি বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী অথবা উদ্যোক্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে আসেন। নিজ ক্ষমতায় ব্যক্তি পর্যায়েও সেই বনের বন্দোবস্ত করে আসেন। চাকরি সূত্রে এসব কাজ করলেও লেখকের মন তাতে সায় দেয় না। প্রকৃতির যে রূপ ও নিজস্বতা এবং তার সংলগ্ন মানুষদের জীবনাচরণ বিনষ্টকারীদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। তার হাত ধরেই উন্নয়নের নামে দখল হতে থাকে জঙ্গল, মানুষ হারাতে থাকে তার ঠিকানা। তাদেরই একজনকে আরণ্যক উপন্যাসের প্রস্তাবনা অংশে পাঠক দেখতে পান। যাকে দেখার পর উপন্যাসের বিবরণ লেখক শুরু করেন।
এই উপন্যাসের কোথাও রাজনৈতিক কর্মকান্ড নেই। তবে এই উপন্যাস ঘোরতর রাজনৈতিকই বটে। সেটা আড়াল করেননি লেখক। তিনি লিখেছেন, ‘ মানুষে কি চায়- উন্নতি, না আনন্দ? উন্নতি করিয়া কি হইবে যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে? আমি এমন কত লোকের কথা জানি, যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে বটে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ক্ষইয়া ভোঁতা- এখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ পায় না, জীবন তাহাদের নিকট একঘেয়ে, একরঙা, অর্থহীন। মন শান-বাঁধানো-রস ঢুকিতে পায় না।’
উন্নতির নামে বন ও পরিবেশ ধ্বংসের কুফল এখন আমরা ভোগ করছি। এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনাও চলছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের দুশিন্তা উন্নত, অনুন্নত সব দেশেরই কপালে। বিভূতিভূষণ আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগেই সেটা টের পেয়েছিলেন। মানবজাতির রাজনৈতিক পথ কী হওয়ার উচিত তার নির্দেশনা তিনি বিভিন্ন উপন্যাসেই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি থাকতে চেয়েছিলেন, শান্ত-স্নিগ্ধ সেই জঙ্গলে। তার খুব ইচ্ছা ছিল, ‘এখানেই যদি থাকিতে পারিতাম! ভানুমতীকে বিবাহ করিতাম। এই মাটির ঘরের জ্যোৎস্না-ওঠা দাওয়ায় সরলা বন্যবালা রাঁধিতে রাঁধিতে এমনি করিয়া ছেলেমানুষি গল্প করিত- আমি বসিয়া বসিয়া শুনিতাম। আর শুনিতাম বেশি রাত্রে ওই বনে হুড়ালের ডাক, বনমোরগের ডাক, বন্য হস্তীর বৃংহিত, হায়েনার হাসি। ভানুমতী কালো বটে, কিন্তু এমন নিটোল স্বাস্থ্যবতী মেয়ে বাংলা দেশে পাওয়া যায় না। আর ওর ওই সতেজ সরল মন! দয়া আছে, মায়া আছে, স্নেহ আছে,-তার কত প্রমাণ পাইয়াছি।... ভাবিতেও বেশ লাগে। কি সুন্দর স্বপ্ন! কি হইবে উন্নতি করিয়া? বলভদ্র সেঙ্গাৎ গিয়া উন্নতি করুক। রাসবিহারী সিং উন্নতি করুক।’
উন্নতিতে এই আপত্তি একই সঙ্গে লেখক ইউরোপী উন্নয়নের তত্ত্বকেও খারিজ করে দেন। যে জমিদারী ব্যবস্থা তাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই জঙ্গলে, যে আইনী উপায়ে তিনি জমি লিখে দিয়ে আসলেন অন্যের নামে, যারা জঙ্গলের গাছ ও সম্পদ আইনি উপায়ে দখল করে উন্নতি করবেÑ সেই আইন ও নিয়মেই নারাজ লেখক। ভারতবর্ষে মূলত ইংরেজ শাসনামল থেকে উন্নয়নের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে এখানকার মানুষ। বিশেষত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত সমাজ। তাদের উন্নয়নের কর্মকান্ডে প্রকৃতিসংলগ্ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, তারা হারাতে থাকে নিজস্ব রুচি ও জীবন ব্যবস্থা। উন্নয়নের বলি হয় প্রকৃতিও। জীববৈচিত্র্য কমে আসতে থাকে, জলাশয় ভরাট হয়ে রুক্ষ ও বিশুষ্ক করে তোলে জীবন। প্রকৃত আনন্দ ও তা উপভোগের অনুভূতি কমে আসে।
আরণ্যক উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র আমরা দেখতে পাই জঙ্গলে জঙ্গলে তারা গাছ বুনে চলেছে। তারা পরাগায়ণের কাজ করে চলেছে যেন। প্রকৃতিতে সাধারণত কীটপতঙ্গ এসব করে থাকে। ‘উন্নতির’ বিকল্পও এভাবে ঔপন্যাসিক প্রস্তাব করেছেন তার লেখায়। যার অর্থ, ভবন, কারখানা নির্মাণ নয়, প্রকৃতির বিস্তার, বৈচিত্রকে ছড়িয়ে দেওয়ায়ও উন্নতি রয়েছে। প্রকৃতির রূপ, রস, সৌন্দর্য্য উপভোগকে তিনি মানবজীবনে অমোঘ বলে মনে করেছেন।
বর্তমান রাজধানী শহরের দূষিত জলবয়ুর মধ্যে বসে আরণ্যক পড়তে কেমন উদ্ভট মনে হতে পারে। যদিও রাজশেখর বসু বলেছিলেন, ‘বইটি পড়লে ঘরে বসেই হাওয়া বদলের কাজ হয়’। যারা এখনো পড়েননি তারা পড়ে দেখতে পারেন। নিশ্চিত এক জাগতিক ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে যাওয়া হবে। আমরা কতটা অপরিশোধিত পরিবেশে বাস করছি তার একটা ধারণা অন্তত পাওয়া যাবে। কত কিছু যে হারিয়েছে এই পৃথিবী উন্নয়নের নামে- তার একটা তালিকাও করে ফলতে পারেন কেউ কেউ।
অথচ ঢাকা শহরে একটা সময়ে যে পরিমাণ বন ও জলাশয় ছিল তা অটুট রেখেই উন্নতি সম্ভব ছিল কিন্তু এখানে তেমন পরিকল্পনা নেই। যা আছে তার বাস্তবায়নও হয়নি। এর কারণ অতি চাওয়া। চাওয়ার দোষ বিভূতিভূষণ দেননি, তবে অতি চাওয়াকে যত নষ্টের গোড়া বলেছেন। এই অতি মুনাফা আমাদের জীবনধারণে সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
উন্নতির শর্ত যে কারণে পরিবেশ রক্ষা। পশ্চিমা বিশ্বে যা এখন খুব কড়াকড়িভাবে মানা হয়। যদিও তারাই একটা সময়ে উন্নতির যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিল তাতে প্রকৃতি রক্ষা গুরুত্ব পেত না। কিন্তু উন্নতির বড় বড় প্রকল্প ও পরিকল্পনাও শুরুর দিকে ছিল না। পরে যখন মানুষের উন্নতির ইচ্ছা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল, তখন দেখা গেল এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। পশ্চিমাবিশ্ব যে কারণে এখন পরিবেশ রক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে তাদের আন্তরিকতায় এখনো অপশ্চিম অর্থাৎ আমাদের মতো দেশের প্রতি ঘাটতি রয়ে গেছে।
যে কারণে নিজেদের পরিবেশ রক্ষা অর্থাৎ জলাশয় এবং বনাঞ্চল বাড়ানোর উদ্যোগ নিজেদেরই নিতে হবে। আমাদের শিল্প ও সাহিত্য প্রকৃতি সংলগ্ন। সেই শিল্প-সাহিত্যের নিকট ফিরে ফিরে যেত হবে বার বার। তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে এসব বিষয়ে। গাছ লাগানো, পরিবেশ নষ্ট না করতে তাদের প্ররোচণা দিতে হবে। উন্নতির বিকল্প পদ্ধতি আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে ।
লেখক : সাংবাদিক
"




































