প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

আইএসের ভিডিওতে ট্রাম্পকে হুমকি দিত যে ছেলেটি

যুক্তরাষ্ট্রের বালক ম্যাথিউ। সিরিয়ার রাক্কায় আটকা ছিল ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে। বাধ্য হয়েই আইএসের তৈরি করা ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুমকি দিত সে। ভিডিওতে সে ট্রাম্পের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলত, আমেরিকার মাটিতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে। অবশেষে ছেলেটি সেই জীবন থেকে মুক্ত হয়েছে, ফিরতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাকে ২০১৮ সালে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং তার পর থেকে গত এক বছর ধরে সে তার বাবার সঙ্গে বসবাস করছে। এই প্রথম কোনো সংবাদ মাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছে সে। জানিয়েছে সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি। ম্যাথিউর বয়স এখন ১৩ বছর। যখন তার আট বছর তখন তার মা ও সৎ বাবা তাকে সিরিয়াতে নিয়ে গিয়েছিল। সৎ বাবা তার মাকে ধোকা দিয়েই নিয়ে গিয়েছিল সিরিয়ায়।

ম্যাথিউ বলছে, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। এগুলো সব পেছনের ঘটনা। আমার বয়স তখন এত কম ছিল যে আমি এসবের কিছুই বুঝতাম না।’ ম্যাথিউর সৎ বাবা মুসা এলহাসানি ২০১৭ সালে ড্রোন হামলায় মারা গেছে বলে ধারণা করা হয়। তার মা সামান্থা স্যালিকে সন্ত্রাসবাদের অর্থ জোগান দেওয়ার দায়ে সাড়ে ছয় বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।

------
যেভাবে সিরিয়াতে যাওয়া : পাঁচ বছর আগে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ এই পরিবারটি তুরস্ক হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায় চলে যায়। সেই দিন সম্পর্কে ম্যাথিউ জানায়, আমরা অন্ধকারের মধ্যে দৌড়াতে থাকি। রাতের বেলা। অনেক জায়গাতেই কাঁটাতারের বেড়া ছিল। অনেক কিছুই আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে দৌড়াতে হচ্ছিল।

একসময় তারা গিয়ে পৌঁছায় ইসলামিক স্টেটের তথাকথিত রাজধানী রাক্কা শহরে। তার সৎ বাবা এলহাসানিকে পাঠানো হয় সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি আইএসের চোরাগোপ্তা হামলাকারীতে পরিণত হন। ছেলেটি জানায়, আমরা যখন রাক্কা শহরে গিয়ে পৌঁছালাম প্রচুর আওয়াজ শুনতে পেতাম, সাধারণত গোলাগুলির শব্দ। একবার বেশ কিছু বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটল, কিছুটা দূরে। সে কারণে আমাদের তেমন একটা দুশ্চিন্তা ছিল না।

ম্যাথিউর ভিডিও : সিরিয়াতে চলে যাওয়ার দুই বছর পর তার মা অর্থ চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তার এক খালার কাছে একটি ই-মেইল পাঠাল। এসব ই-মেইলে ম্যাথিউর মারাত্মক ধরনের কিছু ভিডিও সংযুক্ত করা হতো। একটি ভিডিওতে দেখা গেল, এলহাসানি ম্যাথিউকে আত্মঘাতী বেল্ট পরতে জোর করছে। তার সৎ বাবার নির্দেশনায় তাকে বলতে শোনা গেল বিস্ফোরক দিয়ে সে কীভাবে মার্কিন সেনাদের হত্যা করবে। আরেকটি ভিডিওতে তাকে এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে একটি একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত হতে দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনী যখন রাক্কা শহরে বিমান হামলা জোরদার করল এক দিন তাদের কাছের একটি বাড়ি বোমা পড়ে বিধ্বস্ত হলো। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে রাক্কা মোটামুটি একটি বিধ্বস্ত শহরে পরিণত হলো। কিন্তু ইসলামিক স্টেট তখনো দাবি করে যাচ্ছিল যে যুদ্ধে তারাই জয়ী হচ্ছে। তখন ম্যাথিউকে বাধ্য করা হলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে এ রকম বার্তা দিয়ে ভিডিওতে বক্তব্য রাখতে।

ইসলামিক স্টেট তখন একটি ভিডিও ছাড়ল যাতে দেখা গেল ম্যাথিউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুমকি দিচ্ছে। ‘ট্রাম্পের প্রতি আমার বার্তা : তিনি ইহুদিদের পুতুল। আল্লাহ আমাদের জয়ী আর তোমাদের পরাজিত করার অঙ্গীকার করেছেন’ ম্যাথিউ জানায় এই কথাগুলো তাকে মুখস্থ করানো হয়েছিল। ভিডিওতে তাকে আরো বলানো হতো, ‘রাক্কা কিংবা মসুলে এই যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। এই যুদ্ধ শেষ হবে তোমাদের মাটিতে। ফলে প্রস্তুত হও। যুদ্ধ মাত্র শুরু হয়েছে।’ ম্যাথিউ জানায়, এই ভিডিওতে অংশ নেওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না। নাহলে তার সৎ বাবা রাগে ফেটে পড়তেন। তিনি মানসিকভাবে স্থির ছিলেন না। এর কিছুদিন পর এলহাসানি ড্রোন হামলায় নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। বাবার মৃত্যুর খবরে ম্যাথিউ জানায়, আমি খুশি হয়েছিলাম কারণ আমি তাকে পছন্দ করতাম না। আমরা সবাই আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম।

সিরিয়া থেকে যেভাবে পালাল : ম্যাথিউর মা সামান্থা স্যালি তখন মানব পাচারকারীদের অর্থ দিয়ে চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। একটি ট্রাকে করে আইএসের তল্লাশি চৌকি পার হওয়ার সময় ট্রাকের পেছনে রাখা ব্যারেলের ভেতরে ম্যাথিউকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। কুর্দিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গিয়ে পৌঁছানোর পর তাদের একটি বন্দি শিবিরে আটক করে রাখা হলো। সে সময় মা স্যালির সঙ্গে প্রথম কথা বলতে পেরেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, তার স্বামী তাকে ধোঁকা দিয়ে সিরিয়াতে নিয়ে গেছে। স্বামীর পরিকল্পনার বিষয়ে তার কোনো ধারণা ছিল না। তিনি বলেন, রাক্কায় থাকার সময় একবার তার স্বামী তার ওপর সহিংস হয়ে উঠেছিলেন। স্যালি জানান, দাস হিসেবে তারা দুটি ইয়াজিদি কিশোরীকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। তার স্বামী তাদের নিয়মিত ধর্ষণ করত।

দেশে ফিরে যাওয়া : যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পর কারাগারে থাকার সময়েও স্যালি একই ধরনের কথা বলে গেছেন। যদিও স্যালি বলেছেন, তিনি তার স্বামীকে সমর্থন দিয়েছেন মাত্র। তিনি মনে করেন স্বামীকে সমর্থন দিয়ে আইএসে যোগ দেওয়ার মধ্যে দোষের কিছু নেই।

মুসা এলহাসানি পরিবারের একজন সদস্য বলেছেন, পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে চলে আসার কয়েক মাস আগে থেকেই স্যালির স্বামী মুসা আইএসের সমর্থক ছিলেন। বাড়িতে বসেই তিনি আইএসের প্রচারণা ও নানা রকমের ভিডিও দেখতেন। সামান্থা স্যালির একজন বন্ধুও বলেছেন, স্যালি একবার তাকে বলেছিলেন যে তার স্বামী তাকে জানিয়েছিলেন ‘পবিত্র যুদ্ধে’ যোগ দেওয়ার জন্য তার কাছে ডাক এসেছে। জেলখানায় প্রায় এক বছর থাকার পর স্যালি সন্ত্রাসবাদে অর্থ জোগান দেওয়ার দায় স্বীকার করে নেন। ধারণা করা হচ্ছে, সাজা কমানোর উদ্দেশে তিনি এই অপরাধের কথা স্বীকার করেন। সরকারি আইনজীবীরা বলছেন তার স্বামীর আইএসে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে স্যালি কেন সাহায্য করেছিলেন তার উত্তর হয়তো কখনোই জানা যাবে না।

 

 

"

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়