রফিকুল ইসলাম, মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা)

  ৮ ঘণ্টা আগে

হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক উচ্ছন্নে যাচ্ছে যুবসমাজ

নেত্রকোনা জেলায় ভয়ংকর আকারে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকাসক্তদের আতঙ্কে আছে শান্তিপ্রিয় মানুষ। এই মাদকের ছোবলে ভাঙছে সংসার। পরিবার হচ্ছে খণ্ড খণ্ড। বেড়েছে সামাজবিরোধী কাজকাম ও খুন-জখম। উচ্ছন্নে যাচ্ছে যুবসমাজ। শিক্ষার্থীরাও এর বাইরে নয়। এসব দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগ আশা করছেন এলাকার মানুষ। হাত বাড়ালেই মিলে নানা প্রকার নেশাদ্রব্য।

একজন সমাজ বিশ্লেষক বলেছেন, মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ মরণব্যাধি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেসব সমস্যা বিদ্যমান তার একটি অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মাদকের ভয়াল থাবা। দিন দিন মাদকের ব্যবহার উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। নিষিদ্ধ জগতে মাদকই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বর্তমানে দেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মাদকের কেনাবেচা হয় না। শহর থেকে শুরু করে গ্রামেও এটি সহজলভ্য। আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, মদ, আফিম, হেরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ, এমনকি জুতার আঠাও রয়েছে। এসব ভয়ানক নেশা জাতীয় দ্রব্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে। এসব মাদকের বেশিরভাগই আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার হতে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদকের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নেত্রকোনায় মাদকের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় ঘটছে নানা অপরাধ। এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চললেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ব্যবসায়ীসহ মদদদাতারা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন। আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। সুশীল সমাজের দাবি, বিচারহীনতা অভাবেই এসব ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তৎপর থাকলেও সামাজিক সচেতনতা নেই। নেত্রকোনায় মাত্র ৫ দিনে চার খুন। গত (১ জুন থেকে ৫ জুন) পর্যন্ত জেলায় ঘটে গেছে চারটি খুনের ঘটনা। নেত্রকোনা সদরে নারীসহ দুইজন এবং জেলার কেন্দুয়ায় দুইজন। 

নেত্রকোনা শহরের কাটলি এলাকায় গত (১ জুন) রাতে শুধু নারীকে খুনই করেনি। নারীর স্বামী ও ছেলেকেও কুপিয়ে জখম করেছে। এ ঘটনায় আব্দুর রশীদ নামের অভিযুক্তকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশেও দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, নেশায় আসক্তির কারণকেই এ ঘটনাটি ঘটেছে। এমনকি ছেলেটা রিকশা চালাত। মাঝে মধ্যেই ওই পরিবারটি তাকে সহযোগিতা করত। কিন্তু বিদ্যুৎবিহীন রাতে এ ঘটনাটি ঘটাল, এলাকাবাসী যদি একটু বুঝতো তাহলে ওকে ছাড়তো না। এদিকে তুচ্ছ ঘটনাসহ একই সপ্তাহে আরো তিনটি খুন হয় দুই উপজেলায়। এছাড়াও গত (৯ জুন) দুপুরে জেলার সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের চল্লিশা গ্রামে মাদকসেবী ছেলে শ্যামলকে ভাত দিতে দেরি হওয়ায় শাবলের আঘাতে মিনতি নামের ষাটোর্ধ্ব মাকে হত্যা করে। পুলিশ তাকেও আটক করে। 

এর আগে গত ২ মে দুর্গাপুরেও মাদক সেবনে নিষেধ করায় কেলিশ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মার্চ, এপ্রিল, মে তিন মাসে শিশুসহ আরো তিনটি খুন হয়েছে জেলার কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলায়। আসামিরাও ধরা পড়েছে। এসব ঘটনায় নেত্রকোনা জেলাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হানাহানি মারামারির ঘটনা তো ঘটছেই। সাধারণ মানুষ মনে করছেন মাদকের সহজলভ্যতা এবং বিচার না হওয়া এসবের প্রধান কারণ। 

বাংলাদেশে মাদক মামলা অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, মাদক উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রি, ক্রয়, সংরক্ষণ ও সেবনের কারণে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। গত ৫ মাসে মোহনগঞ্জ থানায় মাদকদ্রব্য মামলা ৪২টি, ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮০০ মূল্যে মাদকদ্রব্য উদ্ধার, হেরোইন ৩০ গ্রাম ও ১০ পুরিয়া, ইয়াবা ট্যাবলেট ২৭০ পিস, গাঁজা ৬ কেজি ৭৮০ গ্রাম ও ১৩টি গাছ, ১ লিটার-১২৫ মিলি ও ১২ বোতল মদ, রেক্টিফাইড স্পিরিট ১৬০টি বোতল।

সরেজমিনে ঘুরে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা মোহনগঞ্জ শিয়ালজানি লেকে এসে অবাধে মেলামেশায় লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে শিক্ষার্থীরা জোড়ায় জোড়ায় লেকের ব্রিজ ও ফেন্সিংগুলোতে বসে আড্ডায় লিপ্ত হয়। দিন-রাত সমানতালে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য বিক্রি, মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে ছিনতাইসহ এসএস পাইপ দিয়ে বানানো ফেন্সিং বা রেলিংগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

বিচার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের জামিন না দেওয়ার বিষয়ে আইনি ও সামাজিক পর্যায়ে জোর দাবি রয়েছে।

তবে পুলিশ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিনিয়ত মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এদিকে যারা ধরা পড়ছে তারাও ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ফলে বের হয়ে আবারও তারা মাদক সেবন এবং ব্যবসা অব্যাহত রাখছেন। এতে সমাজ এক ভয়াল থাবায় পড়ে গেছে। এর থেকে বের হতে হলে মাদক নির্মূলে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। খুন-ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। 

জানা গেছে, জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৫ মাসে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, ভারতীয় মদ, ইনজেকশনসহ মোট ৩ কোটি ৮২ লাখ ১১ হাজার ৫৭০ টাকার মাদক জব্দ করেছে। জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৫ মাসে ২৯২টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৩০ জন। জনবল সংকট নিয়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত ৫ মাসে মাদক উদ্ধার করেছে ৮৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫০ টাকার। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৬৬০টি অভিযানে ১২১টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৩৬ জন।

নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতান মাহমুদ জানান, স্কুল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। মাদকের সহজলভ্যতা এর প্রধান কারণ। মানুষ সবসময় একধরনের আতঙ্কে থাকে কখন কী হয়। শহরের মাঝখানে নারীকে এক মাদকসেবী কুপিয়ে হত্যা করল। তবে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন থাকলে এবং মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকলে এই মাদক এত বিস্তার করতে পারতো না। যারা আটক হয় তারা বেরিয়ে যায়। বিচার হয় না। এ জন্য এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে।’ এদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জিয়া উদ্দিন জিয়া বলেন, ‘যারা অপরাধী তারা সাজা পেলেও অনেকে অপরাধ না করে আটক থাকবে এটা কাম্য নয়। একটা বিচার হতে নানা ধাপ পার করতে হয়।’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা যে মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করছি, তারা বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে এসে পুনরায় মাদক ব্যবসায় নিজেদের যুক্ত করছে। বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। আইন প্রয়োগ করেও মাদক ব্যবসায়ীদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। এর ফলেও মাদকের প্রবণতা সমাজে বহমান রয়েছে।’ এটি একটি সামজিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমাজের সবাইকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যার যে দায়িত্ব সেগুলোকে সমন্বিতভাবে পালন করলে এই ব্যাধি নিমূল হবে।’

জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে মাদকের সূত্রপাত হচ্ছে। সব পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর সেজন্য রাষ্ট্রের সব অর্গান চেষ্টা চালাচ্ছি। শুধু আইন প্রয়োগ করেই নয় আমরা সামাজিক ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। এর জন্য তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বাড়াতে হবে।’ 

সমাজের ভেতরেই সহিষ্ণুতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজের সহিষ্ণুতা এবং আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা সমন্বয় হলেই সমাজে অপরাধ কমবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়