শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ০৬ মার্চ, ২০২৬

সিরাজগঞ্জ সোলার পার্ক

জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে ৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ দেনার দায় কাঁধে নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায়িত্ব নিয়েছে বর্তমান সরকার। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে আশার আলো দেখাতে পারে যমুনা নদীর অববাহিকায় প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক। যমুনা নদীর তীরে অব্যবহৃত জমির ওপর নির্মিত এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সম্প্রসারণ করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে রয়েছে। ইনস্টল ক্যাপাসিটি ৭৫ মেগাওয়াট হলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে ৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গড়ে ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর অর্জন করেছে। গত বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ার পরও এই পরিমাণ প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর অর্জনকে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখছেন। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক বেশি সাশ্রয়ী। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, জমির বহুমাত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলেছে এই প্রকল্প। যমুনার তীরের অনাবাদি জমির ওপর সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে এবং এর নিচের জমিতে চলছে কৃষিকাজ। প্রকল্প পরিচালক তানবীর রহমানের উদ্যোগে সোলার প্যানেলের নিচে পরীক্ষামূলকভাবে বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ এবং গবাদিপশু পালন করা হচ্ছে। এতে কৃষিক্ষেত্রেও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। নিচের জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হচ্ছে এবং পোষা হচ্ছে গবাদিপশু। বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডাবলুপিজিসিএল) এবং চীনের চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি)-এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড (বিসিআরইসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী শাকিরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পে মোট ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৬টি মনোক্রিস্টালাইন বাইফেসিয়াল পিভি মডিউল স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটির ক্ষমতা ৫৪৫ ওয়াট-পিক। স্থাপিত মোট ক্ষমতা ৮৫ দশমিক ৩৩ মেগাওয়াট-পিক (ডিসি) এবং ৭৫ মেগাওয়াট (এসি)। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৭২টি ইনভার্টার, ১২টি ইনভার্টার স্টেশন এবং একটি ১০০ এমভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন মেইন ট্রান্সফরমার রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ১২টি ইনভার্টার স্টেশনের মাধ্যমে ৩৩/১৩২ কেভিতে ভোল্টেজ স্তর পরিবর্তন করে ১০০ এমভিএ মেইন ট্রান্সফরমারের সাহায্যে ১০ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক তানবীর রহমান বলেন, যমুনা নদীর অববাহিকায় স্থাপিত এ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পানিতে প্লাবিত থাকে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ, মাউন্টিং স্ট্রাকচার ডিজাইন এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। উঁচু পাইলের ওপর ডিজাইন করায় বর্ষার সময় সোলার প্যানেলগুলো নিরাপদ থাকে এবং শুকনা মৌসুমে জমির বহুমাত্রিক ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প এলাকার পাশে প্রায় ৭৫ একর অনাবাদি জমি ব্যবহার করে আরো প্রায় ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক ইতোমধ্যে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন, জমির সমন্বিত ব্যবহার এবং কৃষি ও প্রাণিসম্পদের সমান্তরাল উন্নয়ন সব মিলিয়ে প্রকল্পটি টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, এ ধরনের সোলার পার্ক স্থাপন করা হলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্প অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যমুনা নদীর তীরবর্তী সয়দাবাদ এলাকায় ২১৪ একর জমির ওপর সিরাজগঞ্জে ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্কটি স্থাপন করা হয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়