প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

তেলাপিয়া যেভাবে জনপ্রিয়

সহজলভ্য ও সস্তায় কম আয়ের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারে বলে তেলাপিয়া বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় একটি মাছ। মাছচাষিরাও তেলাপিয়া চাষ করতে বেশ পছন্দ করেন। তাদের ভাষ্য, ঝামেলাবিহীন স্বল্প পরিসরে চাষ করা যায়। পুকুর ছাড়াও ভাসমান জালের খাঁচাসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাষ করা যায় বিদেশি এই মাছ।

স্বাদুপানি ছাড়াও লবণাক্ত পানিতে এবং অন্য মাছের সঙ্গে মিশ্র পদ্ধতিতে এই মাছ চাষ সম্ভব। কম সময়ে বেশি ফলন এবং মুনাফা হওয়ার কারণে চাষিদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে তেলাপিয়ার। অথচ তেলাপিয়া বাংলাদেশের মাছই নয়। ৬৫ থেকে ৭০ বছর আগে এই ভূখন্ডের মানুষ চিনতও না তেলাপিয়া।

------
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, আফ্রিকা থেকে ১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে তেলাপিয়া প্রথম এসেছিল। এটিকে বলা হতো মোজাম্বিক তেলাপিয়া। দেখতে একটু কালো রঙের। পোনার পরিমাণ অনেক। কিন্তু বৃদ্ধি ছিল কম।

১৯৭৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসে নাইলোটিকা নামে তেলাপিয়ার একটি জাত। এটি মোজাম্বিক তেলাপিয়ার তুলনায় ভালো এবং বৃদ্ধিও ভালো হয়। ১৯৯৪ সালে ফিলিপাইন থেকে বাংলাদেশে আসে গিফট তেলাপিয়া। নাইলোটিকার তুলনায় এই তেলাপিয়ার বৃদ্ধির হার ৬০ শতাংশ বেশি। এই তেলাপিয়াই পরে বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৯০ এর দশক থেকেই বাংলাদেশে তেলাপিয়া মাছের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়।

মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ওয়াহিদা হক বলেন, পানি থেকে অক্সিজেন কম গ্রহণ করে। পানির মান খুব ভালো না হলেও তেলাপিয়া মাছ বাঁচতে পারে। পুরোপুরি লবণাক্ত পানিতে থাকতে না পারলেও পানিতে লবণের মোটামুটি একটা নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত সহ্য করতে পারে এই মাছ। আশির দশকের দিকে তেলাপিয়া চাষের জনপ্রিয়তা শুরু হয়। এক সময় চিংড়ি খুব জনপ্রিয় থাকলেও খুব বেশি যতœ করতে হয় বলে সেটির জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু তেলাপিয়ার যেহেতু খুব বেশি একটা যত নিতে হয় না, খুব সহজে চাষ করা যায় এবং প্রায় সব ধরনের খাবার এই মাছ খায়Ñ এসব কারণেই এর জনপ্রিয়তা বেশি। দেশে জনসংখ্যা বেশি থাকায় একটি বিষয় মাথায় রাখা হয় যে, স্বল্প খরচে কীভাবে বেশি পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া যায়। যেহেতু তেলাপিয়া চাষের খরচ অনেক কম কিন্তু অন্য মাছের তুলনায় প্রোটিনের ভালো উৎস। তাই এটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কহিনুর বলেন, হরমোন প্রয়োগ করে তেলাপিয়া মাছের সব পোনাকে মনোসেক্স করা হয়। অর্থাৎ সব পোনাকে পুরুষ পোনায় রূপান্তরিত করা হয়। জেনেটিক সিলেকশন পদ্ধতির মাধ্যমে গিফট তেলাপিয়ার জাত উন্নত করা হয়েছে। এটি এখন সুপার তেলাপিয়া নামে পরিচিত। গিফট তেলাপিয়ার এই জেনেটিক জাতটি স্থানীয় জাত বা অন্য তেলাপিয়ার তুলনায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ বেশি উৎপাদনশীল।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৬০০ থেকে ৭০০টি হ্যাচারি রয়েছে। যেগুলোতে তেলাপিয়া মাছের মনোসেক্স পোনা উৎপাদন করা হয়। এসব হ্যাচারি থেকে বছরে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি পোনা উৎপাদিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওয়াহিদা হক বলেন, বাংলাদেশে যেসব মাছ উৎপাদিত হয় তার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য থাকে সেটি হচ্ছে সব সময় ফিমেল বা স্ত্রী প্রজাতির মাছটি আকারে বড় হয়। কারণ এগুলো ডিম দেয়, কিন্তু তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে ফিমেল বা স্ত্রী মাছটি আকারে ছোট এবং পুরুষ মাছটি আকারে বড় হয়। ডিম না হওয়ার কারণে পুরুষ মাছের শরীরে মাসল বা পেশি বেশি থাকে। যার কারণে বেশি মাছ বা প্রোটিন পাওয়া যায়। এ কারণেই যখন পোনাগুলোর লিঙ্গ শনাক্ত করা যায় না, সেসময়েই হরমোনযুক্ত খাবার দিয়ে সব পোনাকে পুরুষে পরিণত করা হয়। এটাকেই মনোসেক্স বা সিঙ্গেল সেক্স তেলাপিয়া বলা হয়।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, এর মধ্যে তেলাপিয়া উৎপাদিত হয় বছরে প্রায় ১৩ লাখ টন। এক বছরে প্রতি হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ টন তেলাপিয়া উৎপাদিত হয়। এছাড়া তেলাপিয়া খুব দ্রুত বর্ধনশীল মাছ, খেতেও সুস্বাদু এবং মাংসল অংশে কাটা না থাকার কারণে মানুষের মধ্যে এই মাছের চাহিদাও রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে তেলাপিয়া মাছ জনপ্রিয় বলে জানান ওয়াহিদা হক। একর জলাশয় বা পুকুর থেকে চার থেকে পাঁচ মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করা যায়। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

 

 

"

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close