না.গঞ্জে কমিউনিটি সেন্টার ব্যবসায় ধস

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

আগে বিয়ের অনুষ্ঠান সাধারণত নিজেদের বাড়িতেই হতো। তখনকার দিনে শহরের বাড়িঘরও ছিল খোলামেলা। বড় উঠানে প্যান্ডেল টানিয়ে, নিজেরাই রান্নাবান্না করে পার করত বিয়ের অনুষ্ঠান। সময় পাল্টে গেছে, এখন শুধু বিয়ের অনুষ্ঠানই নয়, সব পারিবারিক অনুষ্ঠানও কমিউনিটি সেন্টার ছাড়া চলে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যও অনেকে বেছে নেয় কমিউনিটি সেন্টার। এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেকারেটর, ক্যাটারিং ব্যবসা। কিন্তু গত সাড়ে চার মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে দেখা যাচ্ছে না চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানির জমকালো অনুষ্ঠান। এর সঙ্গে মøান হয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা। করোনা দুর্যোগে অলস সময় পার করছেন কমিউনিটি সেন্টার সংশ্লিষ্টরা। কর্তৃপক্ষদের ভাষ্য, করোনার প্রভাবে লাখ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। যা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘসময় লাগবে। এই ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য তারা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। গতকাল দুপুরে শহরের ডিআইটির হৃদম প্লাজার হৃদম কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা ঝুলছে। ওই ভবনের পাশে দারোয়ান পায়চারি করছে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সাড়ে চার মাস ধরে এ কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ। মাঝে মাঝে খোলা হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য। হৃদম কমিউনিটি সেন্টারের ম্যানেজার তাহরিয়াদ আলম নওশাদ জানান, সরকারি নির্দেশনার আগেই মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমরা কমিউনিটি সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেই। ওই মাসে দুটি অনুষ্ঠান ছিল। আমরা তাও ফিরিয়ে দেই। নতুন করে কোনো ধরনের বুকিংও নেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে একই অবস্থা ১৪নং শরীফ সুপার মার্কেটে অবস্থিত বিবাহ ঘর, নগরীর উকিলপাড়ার পালকি কনভেনশন হল, চাষাড়া বালুর মাঠ এলাকার ইম্পেরিয়ার, বাঁধন, গ্র্যান্ড হল, জামতলা এলাকায় অবস্থিত হীরা, হিমালয় চাইনিজ ও কমিউনিটি সেন্টার, ফতুল্লার সাউদ, সিদ্ধিরগঞ্জের ফোর স্টারসহ দেড় শতাধিক কমিউনিটি সেন্টারের। সাউদ কমিউনিটি সেন্টারের মালিক জাহাঙ্গীর সাউদ জানান, গত সাড়ে চার মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের কার্যক্রম বন্ধ। অন্যদের অবস্থাও একই রকম। কমিউনিটি সেন্টার ব্যবসায়ের আয়ে জীবন নির্বাহকারীদের অবস্থা খুবই নাজুক। অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। এই ব্যবসায় টিকে থাকতে আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, এজন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কমিউনিটি সেন্টারের মালিক জানান, গত সাড়ে চার মাস ধরে কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ। বছর খানেক আগে বাড়ির পাশেই নিজস্ব জায়গাতেই লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে কমিউনিটি সেন্টারটি নির্মাণ করি। ভেবেছি, এতে এলাকাবাসীকে কিছুটা উপকার হবে। ঠিকমতো রানিংও করতে পারিনি। এরই মধ্যে করোনা দুর্যোগ চলে এসেছে। যে টাকা ব্যয় করেছি, সে টাকা তো দূরের কথা বরং চার মাস ধরে নিজের পকেট থেকে স্টাফ, ম্যানেজার, কেয়ারট্যাকারদের বেতন দিচ্ছি।

তিনি আরো জানান, এখন সরকার যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে আমাদের পথে নামতে হবে। শুধু আমাদেরই নয়, বিপদগ্রস্ত সংশ্লিষ্ট ক্যাটারিং, ডেকারেটর ও ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্টে থাকা দায়িত্বরতরাও পথে নামবে। কেউ কেউ কাজ হারিয়ে পাড়ি জমিয়েছে নিজ নিজ গ্রামে। এক বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক ক্যাটারিংয়ের একটি দলের সঙ্গে যুক্ত দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকার ইমন। গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে হলেও জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জে আসেন আড়াই বছর আগে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ক্যাটারিং পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। করোনায় বন্ধ হয় তার উপার্জনের একমাত্র পথটিও।

তিনি আরো বলেন, করোনায় সাড়ে চার মাস ধরে কোনো কাজ নেই। প্রথম দুই মাস ধার-দেনা করে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মাকে টাকা পাঠাতে পারলেও দুই মাস ধরে টাকা পাঠাতে পারি না। লজ্জায় ফোন করে জিজ্ঞাসাও করতে পারি না। একই পেশায় গত ছয় মাস আগে হোসিয়ারী ছেড়ে বন্ধু রাশেদের হাত ধরে আসেন মানিকগঞ্জের রিফাত। দুজনই মাদ্রাসা এলাকায় ঘরভাড়া নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, হোসিয়ারী শ্রমিক ছিলাম। পরে ক্যাটারিংয়ের কাজে যোগ দেই। ভালোই ইনকাম ছিল। হাতে সময়ও পেতাম। ওই সময়ে একটা কম্পিউটারের দোকানে ছিলাম। করোনার আগে ওটাও ছেড়ে দিতে হয়। এখন তো পুরোই বেকার। কোনোরকম পেট চললেও বাড়িতে টাকা দিতে পারছি না। ঘরভাড়া জমছে অনেক। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। সবকিছু এখন অন্ধকার। আমাদের সঙ্গের অনেকেই গ্রামে চলে গেছে। কোনো সুবিধা করতে না পারলে চলে যাব।

অলস সময় পার করছেন ডেকারেটরের কর্মচারীরা। শাহিন ডেকারেশনের ব্যবস্থাপক কামরুজ্জামান জানান, সাড়ে চার মাস ধরে সেন্টারের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যাদের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আবার অনেকে দেশের পরিস্থিতি ভালো হলে আবার অনুষ্ঠান করবেন বলে টাকা ফেরত নিচ্ছেন না। বিয়ে বাড়ি এক ডেকারেটরের মালিক আবদুল ওয়াহিদ জানান, ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্টগুলো শুরু হওয়ায় আমাদের ব্যবসায় ইতোমধ্যেই অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত। তবুও দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসায় জড়িত থাকায় নামডাকে মোটামোটি চলছিল। তার ওপর করোনার কারণে আরো ক্ষতি হয়ে গেল। এ ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নেব জানি না।

 

"