মাওলানা আমিন আশরাফ
নফল ইবাদতে আল্লাহর নৈকট্য লাভ

মাগফিরাতের আজ চতুর্থতম দিন। মহান আল্লাহর কাছে গুনাহরাজি মাফ চেয়ে নেওয়ার সময় আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। মাগফিরাত পেতে হলে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করতে হবে। নবীজি (সা.) নিজেই এ ব্যাপারে মুমিনদের উৎসাহিত করতেন।
নফল ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, আমি যা আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি শুধু তার মাধ্যমেই সবাই আমার কাছাকাছি হতে পারবে না, বরং আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার খুব বেশি সান্নিধ্য লাভ করতে থাকবে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্রে পরিণত করব যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে স্পর্শ করে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে চলাফেরা করে। সে যদি আমার কাছে কোনো কিছু চায়, তবে আমি নিশ্চয় তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে অবশ্যই আমি তাকে আশ্রয় দিই। (বোখারি শরিফ)।
নফল ইবাদত এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, নবীজি (সা.) এ মাসের নির্দিষ্ট অনুষঙ্গের বাইরেও নফল ইবাদতে অধিক মনোযোগী হতেন। হাদিসে এসেছে, ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দাতা। রমজানে যখন জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তিনি তখন আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন। কেননা রমজানের প্রতিরাতেই জিবরাইল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তারা পরস্পর কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয় নবীজি (সা.) রহমতের বাতাস থেকেও অধিক দানশীল ছিলেন। (বোখারি শরিফ, হাদিস ৬)
রাতের ইবাদতের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে তাহাজ্জুদ। শেষ রাতের তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সারা বছরই বেশি। রমজান মাসে তো এই বেশির তুলনা দেওয়াই কঠিন। তা ছাড়া যেহেতু সাহরি খেতে শেষ রাতে জাগ্রত হতে হয়, তাই এ মাসে তাহাজ্জুদ আদায় তুলনামূলক সহজ। সুতরাং, এ সুযোগ হাতছাড়া করাটা হবে বোকামি। তাহাজ্জুদের ফজিলত এত বেশি যে, আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় হাবিবকে এ নামাজের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার রব আপনাকে প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা ইসরা, আয়াত ৭৯)
এ মাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত হতে পারে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত। আমরা জানি, কোরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতের বিনিময়ে দশ গুণ করে সওয়াব লেখা হয়। কিন্তু এ দশ গুণ যদি রমজানের বিশেষ সত্তর গুণে পরিবর্তিত হয়, তবে সেটা সাত শ গুণে পৌঁছে যায়। এ ছাড়া আল্লাহতায়ালা এ মাসকে কোরআন নাজিলের মাস বলে বিশেষায়িত করেছেন। অতএব, এ মাসে যতটা সম্ভব কোরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হওয়া উচিত।
রমজানের আরেকটি বিশেষ ইবাদত হচ্ছে ইতিকাফ। ইতিকাফ হচ্ছে যাবতীয় দুনিয়াবি কাজ থেকে বিমুখ হয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য আদায়ের লক্ষ্যে মসজিদে অবস্থান করা। নারীদের ক্ষেত্রে বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হওয়া। সারা মাস, বিশ দিন, দশ দিন কিংবা তিন দিনের জন্যও ইতিকাফ করা যায়। তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে হাদিসে। নবীজি নিজেই শেষ দশকে ইতিকাফ আদায় করতেন এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে দশ দিন ইতিকাফ করল, সে যেন দুটি হজ এবং দুটি ওমরাহ আদায় করল।’ (বায়হাকি ও শুয়াবুল ইমান)।
একদম শুরুর হাদিস অনুসারেই স্বাভাবিকভাবে নফল ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে রমজানে সেটার গুরুত্ব বেড়ে যায় আরো বহু গুণ। ইবাদতের আবহ নিয়ে আগমন করা রমজান তার নানা অনুষঙ্গ দিয়ে আমাদের ইবাদতমুখী হওয়ার আহ্বান জানায় প্রতিনিয়ত। ফরজের বাইরেও অতিরিক্ত হিসেবে নফলের মাধ্যমে যতটা সম্ভব পুণ্য আমাদের আমলনামায় সঞ্চিত হোক, এটাই প্রার্থনা। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : আলেম, শিক্ষক ও অনুবাদক [email protected]
পিডিএস/মীর









































