মো. জিল্লুর রহমান

  ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

কালোটাকা সাদা করার সংস্কৃতি

বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকারীরা বরাবরই বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রহিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। তবে সরকার প্রতিবারই বলছে, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই তারা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। অর্থ যাতে বিদেশে পাচার হতে না পারে এবং দেশের অর্থ যাতে দেশেই বিনিয়োগ হয়, এই বিবেচনায় তারা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিচ্ছেন। আসলে এ ধরনের সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিস্তারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে বলে মনে করছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সরকার একদিকে সুশাসনের কথা বলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বারবার উচ্চারণ করছে, আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কালোটাকা বলতে সে সম্পদ বা আয়কে বোঝায় যে সম্পদ বা আয়ের বিপরীতে কর দেওয়া হয়নি। কিন্তু এর আবার দুটি ভাগ আছে, এর একটি হলো বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ, আরেকটি হলো অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ। কালোটাকা প্রতিনিয়ত আমাদের অর্থনীতিতে ঢুকছে। কিন্তু এতে দুই ধরনের সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর যারা সৎ বিনিয়োগকারী, তারা কালোটাকার সঙ্গে পেরে ওঠেন না। ফলে অর্থনীতিতে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক অবৈধ আয়ের যে কালোটাকা, তার উৎস হিসেবে মাদক ব্যবসা, অবৈধ ব্যবসা, ঘুষ ও দুর্নীতিকে চিহ্নিত করেছে।

তবে আয়কর আইনজীবীদের মতে, ‘আইনে কালোটাকা হলো অপ্রদর্শিত আয়। যে আয়ের কর দেওয়া হয়নি। সেই আয় বৈধ এবং অবৈধ দুটোই হতে পারে। কিন্তু এনবিআর আয়কর নেওয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায় না। এখানে আয় বৈধ না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই। তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয়, তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়। এটি আয়কর দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

দেশে ঘোষণা দিয়ে প্রথম কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৫ সালে সামরিক আইনের আওতায়। এ পর্যন্ত ১৭ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বৈধ করা মোট টাকার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা এবং এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়েছিল। তখন রেকর্ড পরিমাণ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়েছিল।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিছু লোক সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য মতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ করদাতা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ২০৫ জন প্রায় ২২ কোটি টাকা কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করেছেন। আর অপ্রদর্শিত নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা রাখা টাকা, ফ্ল্যাট ও জমি বৈধ করেছেন ৭ হাজার ৪৪৫ করদাতা। আর এর বিপরীতে তারা কর দিয়েছেন প্রায় ৯৪০ কোটি টাকা। তাদের সবাই রিটার্ন দাখিল করে অপ্রদর্শিত আয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশে ২০১২-১৩ সাল থেকেই জরিমানা দিয়ে কালোটাকা সাদা করার একটা স্থায়ী নিয়ম তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবারই বলা হয় এটাই শেষ সুযোগ কিন্তু কালোটাকা বিশেষ সুযোগ দিয়ে শেয়ারবাজার বা আবাসন খাতের মতো সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গায় এলে সেটি দেশের অর্থনীতিতে সত্যিকারভাবে কতটা ভূমিকা রাখে তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
অর্থমন্ত্রী এবারের বাজেট বক্তব্যে বলেছিলেন, দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যেকোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’ তিনি আরো বলেছিলেন, একই সময় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করলে, ওই বিনিয়োগের ওপর ১০ শতাংশ কর দিলে, আয়করসহ কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন করবে না। এর বাইরে বিনিয়োগ চাঙা করতে বিদায়ী অর্থবছর থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে আসছে সরকার। সেখানে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগ করা অর্থের ১০ শতাংশ কর দিলেই প্রশ্ন করবে না এনবিআর। ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই সুযোগ আছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত কেউ হাইটেক পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে কালোটাকা বিনিয়োগ করেননি। বিদায়ী অর্থবছরে ফ্ল্যাট কেনায়ও তেমন সাড়া পায়নি সরকার।

বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ কত তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের কোনো গবেষণা নেই। তবে ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণার তথ্য মতে, ২০০২-০৩ সালে বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৭ দশমিক ৭ ভাগ। অন্যদিকে ২০১১ সালে বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় কালোটাকা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০১০ সালে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ ভাগ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গবেষণায় আরো বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গড়ে কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৫.৬ ভাগ। আর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কালোটাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র সাত ভাগ। তবে দেশে ঘোষণা দিয়ে প্রথম কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, সামরিক আইনের আওতায়। খুব বেশি সাড়া না মেলায় ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তখনকার সরকার বলেছিল, ‘নানা কারণে অনেকে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেনি বলে আবেদন-নিবেদন বিবেচনা করে সরকার তাদের কর-অনারোপিত প্রকৃত আয়ের ঘোষণার জন্য এ বছর ৩০ জুন পর্যন্ত আর একবার সুযোগ দিয়েছেন। আশা করা যায়, করদাতারা তাদের এখনো অপ্রকাশিত আয় ঘোষণার এই শেষ সুযোগ হারাবেন না। কেননা, এরপর কর ফাঁকির মামলাগুলোর ব্যাপারে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তখন মাত্র ৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সাদা হয়েছিল।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে বলা হয়, এর মধ্যে সুযোগ না নিলে সর্বোচ্চ ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার এই সুযোগ নেয় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। আর এতে বৈধ হয় ৯ হাজার ৬৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০০৯ সালে নতুন সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগ আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়। এমনকি আয়কর অধ্যাদেশে জারি করে ২০১২ সালে স্থায়ীভাবে নতুন একটি ধারা সংযোজন করে কালোটাকা সাদা করার আইনি সুযোগ রাখা হয়। এই ধারাটি হচ্ছে ১৯-ই। এর ফলে প্রযোজ্য আয়করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিলে যে কেউ অর্থ সাদা করতে পারবেন।

প্রায় সব সরকারই অবাধে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে, নানা ধরনের হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু সেসব হুমকি শুধু বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় কালোটাকা সাদা করার ক্ষেত্রে তেমন কেউ উৎসাহ দেখায়নি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মতে, ‘কালোটাকা সাদা করার যে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা চিরতরে বন্ধ করা উচিত।? ঢালাও সুযোগ দেওয়ার পরও যে পরিমাণ সাড়া পাওয়া গেছে, তা হতাশাজনক। আশা করা যায়, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন ও বিবেচনা করবে।’

দেশে যে পরিমাণ কালোটাকার মালিক আছেন বলে অনুমান করা হয়, সে তুলনায় কালোটাকা সাদা করার চিত্রটি আশাব্যঞ্জক নয়। ভবিষ্যতে তথ্য গোপনীয় থাকবে না এমন আশঙ্কা থেকেও অনেকে সাদা করতে চান না। আর রাঘববোয়ালরা বিদেশে পাচার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে অভিযোগ আছে। উচিত হবে চাঁদাবাজি, ঘুষের মতো কালোটাকার উৎসমুখ চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া।

অবৈধ কাজকে বৈধ করার আইনগত সুযোগ দেওয়ার এ বিষয়টি কারো কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অনৈতিক একটা বিষয়কে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলে সৎ করদাতাদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয় এবং এটা সামগ্রিকভাবে দুর্নীতিকেই উৎসাহিত করে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। কালোটাকা সাদা করার এ সুযোগটি চিরতরে বন্ধ করাই সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নির্মূলের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টদের দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/ জিজাক

কালো টাকা
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close