reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৯ মে, ২০২৩

মেডিটেশন করবেন যেভাবে

২১ মে বিশ্ব মেডিটেশন দিবসে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে নানা বয়সী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ধ্যানমগ্ন মানুষ। ছবি : সংগৃহীত

Meditation এবং Medicine দুটো শব্দই এসেছে গ্রীক শব্দ Mederi থেকে। Mederi শব্দের অর্থ হচ্ছে নিরাময়। আর Medicine এবং Meditation দুটোই ব্যবহৃত হয় নিরাময়ের কাজে।

মেডিসিন নিরাময় করে দৈহিক অসুখ। আর মেডিটেশন নিরাময় করে দেহমনের সকল অসুখ। মন-ই হলো সেরা ডাক্তার আর দেহ হচ্ছে সেরা ফার্মেসি।

মেডিটেশন কী?

এককথায় ব্রেনের কুলিং সিস্টেম এবং মাইন্ডের ক্লিনিং সিস্টেম। একজন মানুষ যখন মেডিটেশন করে তার মাথা ঠান্ডা হয়, মন স্বচ্ছ হয়। দিনেরর পর দিন জমে থাকা রাগ ক্ষোভ ঘৃণা- যেগুলোকে বলা হয় ‘মনের আবর্জনা’ তা দূর হয়।

মেডিটেশন মস্তিষ্ককে ঠান্ডা এবং মনকে দূষণমুক্ত করে। আর রাগ-ক্ষোভ কমে গেলে মানুষটির পক্ষে শান্তভাবে বস্তুনিষ্ঠ থেকে যেকোনো পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করার মতো সামর্থ্য সৃষ্টি হয়। সমস্যার মূল কারণকে তিনি বের করতে পারেন এবং সমাধানের পথে এগোতে পারেন। এজন্যেই বলা হয়, সমস্যা + টেনশন = সংকট। আর সমস্যা + মেডিটেশন = সমাধান।

মেডিটেশন কী ও কেন? কীভাবে করবেন :

মেডিটেশন করা খুবই সহজ। যেকোনো বয়স, যেকোনো ধর্মবিশ্বাস, যেকোনো জনপদের মানুষই নিজে নিজে শিখে চর্চা করতে পারেন এই মেডিটেশন। আর কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশন একটি বৈজ্ঞানিক মেডিটেশন পদ্ধতি যা বিশ্বের অন্যতম সহজ, কার্যকরী এবং ফলপ্রসূ মেডিটেশন পদ্ধতি। মেডিটেশন করার নিয়ম বা ধাপগুলো এখানে বর্ণিত হলো। ধাপগুলো শিখে নিজে নিজে করতে পারেন। আবার সহযোগিতা নিতে পারেন অডিও গাইডের অথবা কোয়ন্টাম মেথড অ্যাপ।

১. মেডিটেশন এর পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি : মেডিটেশনের জন্যে একটি নিরিবিলি ঘর বেছে নিন। নিশ্চিত হোন এসময় কেউ আপনাকে বিরক্ত করবে না। ঘরে হালকা আলো থাকবে। পর্যাপ্ত বাতাস থাকবে। মেডিটেশনের সময় আপনার পোশাক হবে ঢিলেঢালা আরামদায়ক। যারা চশমা পরেন চশমা খুলে নেবেন। হাতে ঘড়ি থাকলে তাও খুলে নিন। মোবাইল ফোন অফ করে দিন। ল্যান্ডফোন, ইন্টারকম বা আইপি ফোন থাকলে সাইলেন্ট করে রাখুন।

২. বসার ভঙ্গি : মেডিটেশন আপনি মেঝেতে মাদুর পেতে বা কার্পেটে বসে করতে পারেন। বঙ্গাসন, বজ্রাসন, পদ্মাসন, সুখাসন বা যেকোনো ধ্যানাসনেই আপনি মেডিটেশন করতে পারেন। আসলে যেভাবে বসে আপনি আরাম পান মেডিটেশনের জন্যে সেভাবে বসুন। অথবা চেয়ারেও আরাম করে সোজা হয়ে বসতে পারেন। চেয়ারে বসলে জুতো-মোজা খুলে নিন। প্যান্টের বেল্ট একটু ঢিলে করে নিন। চেয়ারে বসলে এমনভাবে বসবেন যাতে পায়ের পাতা ও আঙ্গুল মেঝে স্পর্শ করে। হাতের তালু যেন থাকে হাঁটুর ওপর। মেরুদণ্ড, ঘাড় থাকবে সোজা।

৩. মনের বাড়ি ও আলফা স্টেশন : মেডিটেশনকে বলা হয় নিজের বাড়িতে ফেরার আনন্দ। মেডিটেশন গিয়ে তাই মনের জন্য আমরা একটি মনোরম ও প্রশান্তিময় বাড়ি বানাব। মনের বাড়িতে যাওয়ার পথে থাকবে আলফা স্টেশন। যেমন আমরা যখন কোথাও যাই, তখন বাস স্টেশন নয়তো ট্রেন স্টেশন বা লঞ্চ স্টেশন হয়ে যাই, আলফা স্টেশনও তেমনি একটি সুন্দর স্থান যেখানে আছে ঘন বন, ঝর্ণা, লেক, বাগান ও একটি ওয়েটিং রুম। মনের বাড়ি আপনার পছন্দমতো যে-কোনো শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে হতে পারে।

কখনো হয়তো কোথাও বেড়াতে গিয়েছিলেন। দেখে খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল আহ! এত সুন্দর জায়গায় যদি আমি থাকতে পারতাম! বা ভিডিওতে কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মন উৎফুল্ল হয়েছিল। মনে হয়েছিল এত চমৎকার জায়গায় যেতে পারলে কতই না ভালো লাগত!

অথবা এ পরিবেশ আপনি কল্পনা দিয়েও গড়তে পারেন। কোনো পাহাড়ের চূড়ায়, হ্রদের মাঝে, ঝর্ণা-জলপ্রপাত বা কোনো গভীর বনে, নদী বা লেকের পাড়ে, দিগন্তবিস্তৃত তৃণভূমি বা সমুদ্র সৈকতে অথবা সমুদ্রের তলদেশে অথবা মহাকাশে। যেকোনো জায়গায়ই আপনি এই পরিবেশটি কল্পনা করতে পারেন।

আপনার নিজের বাড়ি যদি খুব পছন্দের হয় ওই বাড়িটাকেই ওখানে নিয়ে বসিয়ে দিন। অথবা দেশ বা বিদেশের যে বাড়ি আপনার পছন্দ সেটাকেই বানাতে পারেন মনের বাড়ি। মনের বাড়িতে অনেকগুলো কক্ষ থাকবে। তবে দরবার কক্ষটি হবে সবচেয়ে বড়। দরবার থেকে ডানদিকের করিডোর দিয়ে যাবেন নিরাময় কক্ষ বা হিলিং সেন্টারে। আর বামদিক দিয়ে যাবেন কমান্ড সেন্টারে। এছাড়া আপনার প্রয়োজনে মনের বাড়িতে গবেষণা কক্ষ, রেওয়াজ কক্ষ, অভিনয় মঞ্চ, ইবাদত বা প্রার্থনা কক্ষও থাকতে পারে। মনের বাড়িতে যখনই যাবেন তখনই প্রয়োজন অনুসারে কক্ষ সংস্কার, পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারবেন।

৪. সুখানুভূতি : কয়েক মুহূর্তের জন্যে আপনি কোনো একটা আনন্দদায়ক ঘটনা বা সুখানুভূতির কথা ভাবুন। ঘটনা যত তুচ্ছই হোক, কিছু যায় আসে না। অনুভূতিটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

৫. চোখের পাতা বন্ধ : প্রথমে হালকাভাবে চোখ বন্ধ করুন। চোখের দু’পাতা ধীরে ধীরে একসাথে লেগে যেতে দিন। ভ্রূ ও চেহারা কুঁচকাবেন না।

৬. বিশেষ পদ্ধতিতে দম নেওয়া ও দম ছাড়া : এরপর নাক দিয়ে দম নিয়ে মুখ দিয়ে দম ছাড়ুন। দম নেবেন পেটে, ছাড়বেন মুখ দিয়ে। খেয়াল করবেন দম নেয়াওর সময় আপনার বুক নয়, পেটের ওপরের অংশ ফুলবে এবং দম নেওয়ার চেয়ে ছাড়ায় সময় দেবেন একটু বেশি। একে বলা হয় আবেশন প্রাণায়াম বা এবডমিনাল ব্রিদিং। এসময় দম নিতে নিতে ভাববেন প্রকৃতি থেকে অফুরন্ত প্রাণশক্তি শরীরে প্রবেশ করছে। আর দম ছাড়তে ছাড়তে ভাববেন শরীরের সকল দূষিত পদার্থ বাতাসের সাথে বেরিয়ে যাচ্ছে...। এভাবে ৬ থেকে ১০ বার দম নেওয়ার পর দম স্বাভাবিক হতে দিন। অর্থাৎ নাক দিয়ে দম নিয়ে নাক দিয়েই ছাড়বেন।

৭. মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে শরীরের পেশিগুলো শিথিল করা : এরপর আপনি মনোযোগ দেবেন আপনার মাথার তালুর পেশিতে। অনুভব করবেন সেখানে রক্ত চলাচল বাড়ছে... একটু গরম গরম লাগছে... একটু শির শির করছে। পেশি শিথিল হয়ে গেছে... পেশি ভারী হয়ে গেছে...। এ পর্যায়ে আপনার ভাবনাটাই যথেষ্ট। আসলে হচ্ছে কিনা তা যাচাই করার প্রয়োজন নেই। এরপর একে একে শরীরের বাকি অঙ্গগুলোয় মনোযোগ দেবেন...কপাল, চোখ, মুখমণ্ডল, গলা, কাঁধ, হাত, বুক, পিঠ, মেরুদণ্ড, পেট, কোমর, উরু, হাঁটু, পা, গোড়ালি, পায়ের পাতা, আঙ্গুল ..। প্রথমে মাথায় মনোযোগ দেবেন। এরপর ধীরে ধীরে মাথা থেকে মনোযোগ নামতে থাকবে পায়ের পাতায়।

এসময় অনুভব করবেন- বরফগলা পানি যেমন বরফের গা বেয়ে নিচের দিকে নেমে যায়, শিথিলতাও তেমনি স্রোতের মতো আপনার মাথা থেকে গা বেয়ে পায়ের দিকে নেমে যাচ্ছে... আপনার অঙ্গ শিথিল ও নিষ্প্রাণ হয়ে আসছে...।

৮. ধীরলয়ে দম নেওয়া ও দম ছাড়া : এপর্যায়ে নাক দিয়ে ধীরে ধীরে দম নিন। নাক দিয়ে ধীরে ধীরে দম ছাড়ুন। দম নেওয়ার চেয়ে ছাড়ায় সময় একটু বেশি নেবেন। এভাবে ৫/৬ বার দম নিন।

৯. দম অবলোকন করা : এরপর দম খেয়াল করবেন। মনোযোগ দেবেন দমের ওপর। বাতাস স্বাভাবিক যাওয়া-আসা করুক, আপনি শুধু দম খেয়াল করবেন। মনোযোগ দেবেন নাকে দমের প্রবেশ পথে।

১০. শরীর ভারী লাগতে লাগতে নিস্প্রাণ জড় পদার্থে পরিণত হওয়া : এ পর্যায়ে আপনার শরীর ভারী লাগতে শুরু করবে। ভাববেন আপনার শরীর ভারী হতে হতে জড় পদার্থে পরিণত হচ্ছে। একেবারে পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে।

১১. বালুকণার স্তূপে পরিণত হওয়া : এবারে ভাবুন- আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ বালুকণা হয়ে গেছে! এবং বালুকণাগুলো শুকনো বালুর মতো ঝুর ঝুর করে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। আপনি হয়ে গেছেন একটা বালুর স্তূপ।

১২. বালুর স্তূপ উড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে আলফা স্টেশনে পৌঁছা : এরপর কল্পনা করবেন ঠান্ডা বাতাস আসছে... বাতাস ঝড়ের রূপ নিচ্ছে এবং ঝড় বালুগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আপনার শরীর বলতে আর কিছুই নেই। আপনার বলতে রয়েছে আপনার চেতনা, আপনার মন। আপনি এখন পুরোপুরি শিথিল। শিথিলায়নের গভীর স্তরে পৌঁছে গেছেন আপনি। আপনার ব্রেন ফ্রিকোয়েন্সি বিটা স্তর থেকে নেমে গেছে আলফায়। মনের বাড়ির পথে এখন আপনি আলফা স্টেশনে এসে পৌঁছেছেন।

১৩. মনের বাড়িতে পৌঁছার জন্যে ১৯ থেকে ০ কাউন্ট ডাউন করা : এরপর ১৯ থেকে ০ গণনা করে নীল আলোর পথে আপনি মনের বাড়ি পৌঁছে যাবেন।

১৪. মনের বাড়ির পারিপার্শ্বিকতায় হারিয়ে আনন্দ উপভোগ করা ও দরবার কক্ষে বসা : মনের বাড়িতে পৌঁছে আপনি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবেন। চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। এরপর আপনি মনের বাড়ির দরবার কক্ষে গিয়ে আরাম করে বসবেন। ১৫. অটোসাজেশন ও মনছবি : মনের বাড়ি চেতনার এক শক্তিশালী স্তর। এ স্তরে মন যেকোনো কল্যাণমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্রেনকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে। তাই আত্মউন্নয়নের জন্যে শারীরিক-মানসিক-পারিপার্শ্বিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে মনে মনে অটোসাজেশন দেবেন বা ইতিবাচক কথা বলবেন। এরপর আপনি সময় নিয়ে মনছবি বা নিজের জন্যে কল্যাণকর যেকোনো ইতিবাচক ভাবনায় ডুবে যেতে পারেন।

১৬. ০ থেকে ৭ গুণে জেগে উঠে পরিপূর্ণ সুস্থ ও চাঙ্গা অনুভব করা : মেডিটেশন শেষ। এবার জেগে ওঠার পালা। আপনি এবার মনের বাড়ি অর্থাৎ মনের গভীর স্তর থেকে স্বাভাবিক সচেতন স্তরে ফিরে আসবেন। প্রথমে লম্বা দম নেবেন। তারপর কল্পনা করবেন উড়ে যাওয়া বালুকণাগুলো চারপাশ থেকে এসে শরীর গঠন করছে। এরপর ০ থেকে ৭ গণনা করে জেগে উঠবেন। চোখ মেলার পর জোরে বলবেন- বেশ ভালো লাগছে। বেশ বেশ ভালো লাগছে। শরীর মন বেশ চাঙ্গা লাগছে।

বি. দ্র. : বিষয়টি পড়ে মনে হতে পারে অনেক জটিল। কিন্তু অডিও গাইড যখন আপনি ব্যবহার করবেন তখন এ ধাপগুলো একটার পর একটা কখন যে আপনি পার হয়ে গেছেন তা টেরই পাবেন না! কারণ কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশন একটি পরীক্ষিত, বৈজ্ঞানিক মেডিটেশন পদ্ধতি। মেডিটেশন করার এত সহজ নিয়মের কারণে ৮ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের প্রবীণ অনায়াসে এ মেডিটেশন আয়ত্ত করতে পেরেছেন, চর্চা করে উপকৃত হয়েছেন।

তথ্যসূত্র : কোয়ান্টামমেথড ডট ওআরজি ডট বিডি (quantummethod.org.bd)।

পিডিএসও/এমএ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মেডিটেশন করবেন যেভাবে,মেডিটেশন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়