বিড়ম্বনা

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৫৬ | আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১৬:০০

কিসিঞ্জার ভূঁইয়া

পুরোনো ঢাকার একটা দু’তলা ভবনে দীর্ঘদিনের বসবাস। বউ মিনা গ্র্যাজুয়েশন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এ বছরের এপ্রিলে পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। যদিও সরকার মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে পূর্বের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান বর্ষের চূড়ান্ত ফলাফল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। করোনাভাইরাস আমার ছোট্ট জীবনের সবচেয়ে বড় মহামারি। খালি চোখে দেখা যায় না এমন ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি মাস্টার্স শেষ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে কর্মরত।

মিনার মতো মেয়ের যে সময়ে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করার কথা ছিল। মন খুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের নির্মল হাওয়ায় সবুজ ঘাসে হাঁটার কথা ছিল। সে আজ করোনার জন্য ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে। খবরে শুধু মানুষের মৃত্যু শুনে অস্থির হচ্ছে। 

তখনও বাংলাদেশে কোনো করোনা রোগী বা ভাইরাসের আগমন ঘটেনি। নিউজে দেখি শুনি- ইতালি, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে ভয়াবহ করোনা মহামারি চলছে। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। এসব চিত্র দেখে ভয় হতো। ভাবতাম যদি বাংলাদেশে আসে তাহলে আমাদের কি হবে? জানুয়ারির প্রথম দিকে আমি থাইল্যান্ড ভ্রমণ করি। সেই দেশে তখনও করোনাভাইরাসের খুব একটা প্রভাব পড়ে নি। তারপরও নিজেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছি। রাস্তাঘাটে বের হলে মাস্ক পরে বের হয়েছি। কয়েক দিন পর জানতে পারলাম সে দেশেও করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে। শুনে বুকটা তখন কেঁপে উঠতো। তারপর ভয়ে ভয়ে ক’দিন কেটে গেলো পাতায়া, ব্যাংককের মতো জায়গায়। ফিরে আসি বাংলাদেশে। আমি নিজেই তখন একটা রুমে চৌদ্দ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকি। ফেসবুকে ডাক্তারদের পরামর্শ শুনে বুঝতে পারি আমি করোনা মুক্ত। আমার সেই ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দেয় নি। তারপরও চেকআপ করে নিশ্চিন্ত হলাম। অফিস ধানমন্ডি ২ নাম্বারে। পাবলিক বাসে করেই অফিসে যেতে হয়।

পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙে মৃদু একটা কণ্ঠের আওয়াজ শুনে। বুকটা ধরফর করে উঠে। মিনা’র কপালে হাত দিয়ে দেখি প্রচণ্ড জ্বর! এই করোনাকালে আবার হাসপাতালে যাওয়াও মুশকিল। ভয়ও লাগছে করোনা হলো কিনা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তাকে অনলাইনে ডাক্তারের পরামর্শে সেবা দেওয়া শুরু করি। এক সপ্তাহ পর মিনা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। 

আমার নিজস্ব কোনো গাড়ি বা বাইক না থাকায় অফিসে পাবলিক বাসেই যাতায়াত করি। সেদিন পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে বাসে উঠি। সিটে বসি। হঠাৎ একটা লোক এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। তার মুখে কোনো মাস্ক নেই। এমনিতেই দুঃশ্চিন্তা যে সিটে বসেছি সেইখানে কি আগে কোনো করোনা রোগী বসেছিল কিনা। তারপর আবার আরেকজনের যন্ত্রণা। তাকে জানালার পাশে সিট দিতে হয়। এর মধ্যে এক তরুণী এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। কোনো সিট খালি নেই। বার বার গায়ে ধাক্কা লাগছে। 

গুলিস্তান এসে পাশের লোকটি বাস থেকে নামার সময় এদিক সেদিক না তাকিয়েই আমার পায়ের উপর পা দিয়ে নেমে যায়। কমনসেন্স নেই বললেই চলে। অতঃপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি ওই ফাঁক হয়ে যাওয়া সিটে বসে। তার মুখেও কোনো মাস্ক নেই। বসে পা দুলাতে থাকে। বার বার ঐ মেয়েটির পা আমার পায়ে স্পর্শ করছে। আমি ভাবি এই বুঝি করোনা এসে লাগছে। মাঝে মাঝে আবার দু’হাত উঁচু করে খোঁপা বাঁধে। কিছুক্ষণ পর খোঁপার বাঁধন আলগা করে আবার বাঁধে। 

ঐ মেয়েটিকে এক পলক দেখে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকাই। এই করোনা মহামারির সময় চারপাশ লোকজনে গিজগিজ করছে। এর মধ্যে সামনে থেকে ঠিক আমার পাশে চলে আসে মোটামত দুটি মহিলা। তাদের মুখেও কোনো মাস্ক নেই। এসেই একজন মহিলা আমার সিটের হাতায় তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকেন। 

গাড়ি যখন বাটা সিগন্যাল এসে ট্রাফিক জ্যামে পড়েছে তখন আমি নেমে হাঁটতে শুরু করি...। ভাবনার মাঝে জীবনের গল্পটা তোলপাড় করে উঠে। ভাবনাগুলো স্পর্শ করতে থাকে এক সময়ের সুস্থ শহরের চিত্র, সেই গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, সারি সারি গাছপালা, বাবার হাতের লাঠি, টিনের চালের বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ! 

পিডিএসও/ জিজাক