কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.)

  ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

হজ্বে স্বাস্থ্য সুরক্ষা 

কর্নেল ডা. নাজমুল হুদা খান (অব.) ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হজ্ব—যা সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য একবার পালন করা ফরজ। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মত্যাগ, ঐক্য ও গভীর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২০ লাখ মুসল্লি সৌদি আরবে সমবেত হন এই পবিত্র ইবাদত পালনের জন্য। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর প্রায় ৯০ হাজার হাজী হজ্বে অংশগ্রহণ করেন এবং এ বছরের হজ্ব কার্যক্রম শুরু হয়েছে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।

তবে এই মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে । বাংলাদেশের অধিকাংশ হাজীই বয়োজ্যেষ্ঠ, ফলে তারা নানা শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। বয়সজনিত দুর্বলতা, অপরিচিত পরিবেশ, প্রচণ্ড গরম, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম—সব মিলিয়ে হজ্ব একটি কঠিন শারীরিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। এর সঙ্গে যদি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যা যুক্ত থাকে, তাহলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, হজ্বকালীন মৃত্যুর বড় একটি অংশ হৃদরোগজনিত কারণে ঘটে, পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগও উল্লেখযোগ্য ।

হজ্ব মৌসুমে সৌদি আরবের আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল থাকে। তাপমাত্রা প্রায়শই ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, যা শরীরে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন, হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া ও বমির মতো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। গরম থেকে স্বস্তি পেতে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পানীয় গ্রহণের ফলে গলা ব্যথা, কাশি ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাজী এ ধরনের সমস্যায় ভোগেন।

খাদ্য নিরাপত্তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষ ও হজ্ব এজেন্সিগুলো খাবার সরবরাহে সচেষ্ট, তবুও খাদ্য প্রস্তুতি ও সংরক্ষণে সামান্য ত্রুটির কারণে এসিডিটি, পেট ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগমে এসব ছোট সমস্যা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে।

অন্যদিকে, হজ্বের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় বিপুল জনসমাগম শারীরিক ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। দীর্ঘ সময় হাঁটা, ভিড়ের চাপ, পায়ে ফোসকা, পেশীর ব্যথা এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে, বিশেষ করে মিনা ও আরাফাত এলাকায়। ধুলাবালি ও পরিবেশগত দূষণ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ঘনবসতির কারণে সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে মেনিনজাইটিস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

ঘুমের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় অবহেলিত সমস্যা। হজ্বের ব্যস্ত সূচি, যাতায়াত এবং অন্যান্য কার্যক্রমের কারণে অনেক হাজী পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন না, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

এ বাস্তবতায় হজ্বের আগে যথাযথ প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক হাজীর উচিত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং মেনিনজাইটিস ও ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ সকল প্রস্তাবিত টিকা গ্রহণ করা। সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যেমন জ্বর ও ব্যথার ওষুধ, ওআরএস, পেটের ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন ইত্যাদি। সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক ব্যবহারও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

হজ্ব চলাকালীন কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। যেমন—সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, ছাতা বা সান প্রোটেকশন ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান করা, স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং ঢিলেঢালা হালকা রঙের পোশাক পরিধান করা। দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে হাঁটা-চলা করাও জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। হৃদরোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং সঠিক সময়ে খাবার ও ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। হাঁপানি রোগীদের ইনহেলার সঙ্গে রাখা এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করা উচিত।

নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রেও আলাদা বিবেচনা প্রয়োজন। নারীরা প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মাসিক সংক্রান্ত বিষয় ব্যবস্থাপনা করতে পারেন। গর্ভবতী নারীদের জন্য হজ্ব এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের সঙ্গে না নেওয়াই উত্তম; তবে নিতে হলে তাদের পরিচর্যা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত পানি পান করানো এবং টিকা সম্পন্ন করা জরুরি।

স্বস্তির বিষয় হলো, হাজীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাজার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েছে এবং আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারও মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় পৃথক মেডিক্যাল টিমের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে।

হজ্ব শুধু আত্মার পরিশুদ্ধির যাত্রা নয়, এটি শারীরিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। সঠিক প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে এই পবিত্র ইবাদতকে নিরাপদ ও সফল করা সম্ভব। তাহলেই হাজীরা নির্বিঘ্নে তাদের হজ্ব সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন।

জনস্বাস্থ্য ও হাইপারবারিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, লেখক ও কলামিস্ট

পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়