শামসুজ্জামান খান

  ১৪ এপ্রিল, ২০২১

নববর্ষের দীপ্ত আলোয় কাটবে করোনার আঁধার

বর্তমান বিশ্ব করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত ও স্থবির হয়ে রয়েছে। প্রত্যেক মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। একাকী থাকতে বলা হয়েছে। পরিবারের মধ্যেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে বলা হয়েছে। এ অবস্থায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন বা সাংগঠনিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কোনো বড় আকারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা উৎসব সংগঠন করা বা উদযাপন করা অসম্ভব।

বাংলাদেশেও আমরা এ অবস্থার মুখোমুখি পড়েছি। আমরাও সবাই ঘরে আবদ্ধ হয়ে আছি, বাইরে বের হতে পারছি না। কিন্তু বৈশাখী উদযাপন বা নববর্ষ মেলা বা বৈশাখী অনুষ্ঠান হলো মানুষে মানুষে মিলনের অনুষ্ঠান। এক মানুষ থেকে বহু মানুষ একত্র হয়ে আনন্দ উপভোগ করবে, গভীরভাবে নববর্ষের তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা করবে এবং প্রত্যেক মানুষ নববর্ষ থেকে বছরের জন্য কিছু আনন্দময় স্মৃতি অথবা কিছু ঘটনার কথা স্মরণীয় করে রাখবে। কিন্তু সেই সুযোগ এবারও আমাদের নেই। অতএব, প্রতি বছরের মতো বাংলা নববর্ষ আমরা উদযাপন করতে পারছি না। এ রকম ঘটনা আরেকবার ঘটেছিল। সেটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭১ সালে যে বৈশাখ মাস এসেছিল, সেটি আমরা উদ্যাপন করতে পারিনি। প্রত্যেক মানুষ আমরা ঘরে বন্দি ছিলাম। কিছুটা আনন্দে, কিছুটা ভয়ে, কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গে আমরা বৈশাখকে আহ্বান করেছিলাম। তখন এটিই বলেছিলাম এই নববর্ষ যেন আমাদের জন্য মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে।

এই বছরে সে রকম করে মুক্তির বার্তা নিয়ে আসার কথা আমরা বলতে পারছি না নববর্ষকে। কিন্তু এটি তো বলতেই পারি যে এই আঁধার আমাদের জীবন থেকে দূর হয়ে যাক। শুধু আমাদের জন্য নয়, সারা পৃথিবী থেকে দূর হয়ে যাক। পৃথিবীর মানুষ আবার হাসুক, খেলুক, আনন্দ করুক। শিশুরা তাদের ফুলের মতো দৃষ্টি নিয়ে চারদিকে ঘুরে বেড়াক। হইহুল্লোড় করুক। সাধারণ মানুষ উৎসব-আনন্দে মেতে জীবনকে সুন্দর করে তুলুক। কিন্তু সেটি শিগগিরই হচ্ছে বলে মনে হয় না।

তাই আমরা আমাদের প্রিয় নববর্ষকে একেবারেই উদযাপন করব না বা এই নববর্ষ উপলক্ষে কিছুই করব না, এটিও তো হতে পারে না। কারণ এই নববর্ষ উৎসব আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার জন্ম হয়েছে যে কয়টি উপাদানের মধ্য থেকে, নববর্ষ তার মধ্যে একটি। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় যে ধর্মনিরপেক্ষতা তারও একটি উপাদান বেরিয়ে এসেছে আমাদের নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে। আমাদের এই বিপুলসংখ্যক মানুষ একটি দিনেই আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। আর সেদিনটিই হলো নববর্ষ উৎসবের দিন। আমরা সেভাবে উৎসব করতে পারছি না। কিন্তু সেজন্যই আমরা আমাদের নববর্ষকে যে অর্জন করলাম অনেক লড়াই করে; কিন্তু আমাদের এই নববর্ষ ছিনিয়ে আনতে হয়েছে পাকিস্তানি আধা-ঔপনিবেশিক শাসকদের কবজা থেকে। তাহলে কথাটিকে আমি এভাবে তুলতে পারি, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নব উদ্ভূত শিক্ষিত নগরবাসী বাঙালি মুসলমান ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নানা গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকরণকে জাতীয় আধারে বিন্যস্ত করে নতুন এক সাংস্কৃতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে শামিল হতে প্রয়াসী হয়। কিন্তু দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক এবং পূর্ববাংলায় তার অনুসারীরা বাঙালির সমন্বিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছেন, একে নানা কৌশলে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। কারণ এর মধ্যে তারা দ্বি-জাতিতত্ত্বের মৃত্যুবীজের অঙ্কুরোদ্গম লক্ষ করেছেন। তাই এর বিরুদ্ধে শুরু করেছেন বাঙালিকে জাতিগত নিপীড়ন ও তার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে দেওয়ার কূটকৌশল। এই ধারায়ই বাধা এসেছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনেও। ১৯৫৪ সালের পূর্ববাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়ার পরই শুধু যুক্তফ্রন্ট সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে বাঙালির জাতি গঠন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা দান করেন এবং সেই বছর বিপুল উৎসাহে বাঙালি তার নববর্ষ উদযাপন করে।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উৎসমুখ খুলে যাওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ৯২-ক ধারা জারি করে স্বৈরশাসন চালু এবং রাজনৈতিক কর্মী, এমনকি সংস্কৃতি ক্ষেত্রের প্রগতিশীল সক্রিয়বাদীদের বিপুল হারে গ্রেপ্তার করায় সংস্কৃতির মুক্তধারার যে উৎসমুখটি খুলে গিয়েছিল, তা আবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হওয়ায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গণমুখী সংস্কৃতির অনুশীলন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু জনতার সংগ্রাম থেমে থাকতে পারে না। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগ বের করে গোপন লিফলেট ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা’। এ বছরেই রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের যে অসাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, সেটিও আমাদের সাংস্কৃতিক জাগৃতির এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৬২ সালে চার ছাত্রনেতার নেতৃত্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস গঠন। এই বছরেই ‘দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ওপর তীব্র আঘাত হানতে থাকে এবং বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন তার রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী ও স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। এ সময়ের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ এক নতুন ও নব দিকনির্দেশক স্লোগান হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালিত্বের চেতনার তীব্র চাপে সেই বছর (১৯৬৪) প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে। সেদিন ঢাকার বিভিন্ন নববর্ষ অনুষ্ঠানে অভূতপূর্ব জনসমাগম হয়। বাংলা একাডেমি, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, ছায়ানট, পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস, নিক্বণ ললিতকলা কেন্দ্র, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, সমাজকল্যাণ কলেজ ছাত্র সংসদ, গীতিকলা সংসদ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হাঙ্গামার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও বাংলা একাডেমির বটতলায় ‘ঐক্যতানের’ অনুষ্ঠানে এত দর্শক-শ্রোতার সমাগম হয় যে ভিড়ের চাপে কয়েকজন আহত হয়। বাঙালির নববর্ষ অনুষ্ঠানে এত বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখে দৈনিক পাকিস্তান ও অবজারভার বিস্ময় প্রকাশ করে।

এরপর বাংলা নববর্ষকে জাতীয় উৎসবে রূপ দিয়ে রমনার অশ্বত্থমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করা হয় ১৯৬৭ সালে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন শুরু করার পর এই আয়োজন এক নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। সেই থেকে বাংলা নববর্ষ সব বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের মহান রাষ্ট্রনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে নববর্ষ উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়ে আমাদের নববর্ষকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার প্রয়াস নেন।

আমরা এই নববর্ষ উৎসবে বিভিন্ন সময়ে আপ্লুত হই। বাংলা নববর্ষ সম্মিলিতভাবে মাঠে-ময়দানে, রমনার বটমূলে বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো অসাধারণ আয়োজনও করতে পারব না। তবু প্রত্যাশা করব, আমাদের হৃদয়ের গভীরে নববর্ষের এই চেতনা উদ্দীপ্ত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এই করোনাভাইরাসকে পরাজিত করে আমরা আমাদের এই জাতীয় উৎসবকে আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করব। 

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
নববর্ষ,বাঙালি সংস্কৃতি,উৎসব
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close