কিশোর গ্যাংকে না বলুন

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩১

আজহার মাহমুদ

কিশোর গ্যাং শব্দটি আমাদের সমাজে এখন খুব বেশি পরিচিত। গ্যাং বলতে আমরা জানি একাধিকজনের একটি দল, যা বর্তমানে নেতিবাচক কর্মকান্ডকে নির্দেশ করে। কিশোর গ্যাং অনেকটা সে রকম। এসব গ্যাং তৈরি হয় বিপথে যাওয়া কিশোরদের মাধ্যমে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব কিশোর নিজেদের কার্যকলাপ শেয়ার করে। এসব কিশোরের মধ্যে এ সময় হিরোইজম তৈরি হয়। প্রথম দিকে অপরাধের সঙ্গে সঙ্গে হাতে মাদকও উঠে আসে। এলাকার আধিপত্য নিয়েও এক ধরনের অহমিকা কাজ করে ওদের ভেতর। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নিজেদের এলাকায় নিজেরাই রাজা। রাতে স্পিডে মোটরসাইকেল রেস, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ছিনতাই বা চাঁদাবাজিও এদের অন্যতম কাজ। এরপর একসময় মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে এসব কিশোর। এ ছাড়া এক এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অন্য এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের সব সময়ই দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। দ্বন্দ্ব থেকে প্রায়ই হুমকি-ধমকি ও শারীরিক আঘাতের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। প্রকাশ্যে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েই একদল আরেক দলের ওপর হামলা চালায়। এতে খুন-খারাপির মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। সম্মানিত ও বয়োজ্যেষ্ঠদের তাদের কাছে কোনো মূল্যই নেই, তাদের কোনো তোয়াক্কাই করে না এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এদের পরনে বেশির ভাগ টি-শার্ট, চোখে সানগ্লাস। চুলে নিত্যনতুন অভিনব স্টাইল। গান গায় উচ্চৈঃস্বরে। পর্দার আড়ালের গ্যাং লিডার বড় ভাইরূপী গডফাদাররা এদের ‘দেখভাল’ করে। বড় ভাইরা তাদের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে এদের ব্যবহার করে। তাদের মিছিল মিটিং মারামারি এসবে ব্যবহার করে। এভাবেই তারা হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য এবং ভয়ংকর। অথচ যেখানে এ বয়সে কিশোরদের চোখে থাকার কথা দেশকে ভালোবাসার স্বপ্ন, নিজেকে যোগ্যতর করে গড়ে তোলার স্বপ্ন; সেই কিশোরদের চোখে আজ হিংসার আগুন। তাদের হাতে কলমের পরিবর্তে চাপাতি, রামদা, চুরসহ বিভিন্ন অস্ত্র। তাদের মুখে মাদকের নেশা। তাদের কাজ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি দখল, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ এমনকি হত্যা।

সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও দেখে দেশের মানুষ আতঙ্কিত এবং স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। কিছু কিশোর এবং যুবক মিলে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে। ৩২ দিন পর সেই ভিডিও ফেসবুকে ছেড়ে দেয় তারা। কারণ তাদের অনৈতিক প্রস্থাবে রাজি হননি ওই গৃহবধূ। তাদের বাহনর নাম দেলওয়ার বাহীনি। এমনও অনেক বাহিনী আছে আমাদের সমাজে। যাদের পেছনে আছেন রাজনৈতিক নেতারা। ধর্ষণ করলে, খুন করলে, মাদক সেবন করলে তারাই আড়াল থেকে সহযোগিতা করেন। যার কারণে এসব কিশোর প্রতিনিয়ত ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

পত্রপত্রিকায় বা টেলিভিশনে এদের গ্রেফতারের খবর মাঝে মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ধরনের চক্র ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের মাথাব্যথার কারণ এখানেই। এসব কিশোর সমাজ নির্মাণের কারিগর হতে পারত। অথচ আজ তাদের আচরণ বা তাদের চলন দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে আমাদের এ কিশোর প্রজন্ম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। যদিও কয়েকটি গ্রুপ বা কয়েকজন কিশোর-কিশোরী নিয়ে সামগ্রিক বিচার করা ঠিক না, তবে এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে যে একসময় আমাদের বড় সংকটে পড়তে হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।

সারা দেশে কিশোর অপরাধ নিয়ে এখন আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। এদের সংশোধনের উপায় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। যে ভুল পথে এরা এগিয়ে চলেছে, তা যে অন্ধকার তা তাদের মস্তিষ্কে ঢোকাতে হবে। যে পথের না আছে কোনো শুভ সমাপ্তি। যে পথে রয়েছে পদে পদে অনিশ্চয়তা, সেখানে এসব কিশোরের দেখলে মনে হয় এরা অপার শান্তি পায়। তাদের এই বোধ কেন হলো। কোনো নিঃসঙ্গতার জালে পড়ে এসব পথে তরুণরা পা বাড়াচ্ছে; সেটাও ভাবার বিষয়। শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা সমাজের জন্য ভয়ংকর। তাদের এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। যেখানে এসব ছেলেদের হাতে থাকার কথা বই। এদের কালচার হবে একাডেমিক। রাস্তায় কুপিয়ে মানুষ মারতে এদের হাত কাঁপে না। অথচ ওদের হাতেই দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব ছিল।

তবে এসব গ্যাংয়ের সদস্য বেশির ভাগ ভেঙে যাওয়া পরিবারের সন্তান; যারা ছোটবেলা থেকেই একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শৈশবকালীন পার করেছে, পথশিশু যারা সমাজে সর্বদাই অবহেলিত এবং আনন্দের কোনো উপলক্ষ পায়নি এবং সেসব কিশোর যারা প্রযুক্তিকে নেতিবাচক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। এসব ছাড়াও আরো কারণ রয়েছে কিশোরদের বিপথগামী হওয়ার। এসব কিশোরের সংশোধন করা জরুরি কেবল শাস্তি দিয়েই সমস্যার সমাধান করা যায় না।

বিশ্লেষকদের মতে, দরিদ্রতা, খেলাধুলার অভাব, পারিবারিক মনিটরিং-এর অভাবে ছেলেরা এই বিপথে হাঁটছে। তাই এটা নিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের কারণে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। পিতা-মাতা সন্তানদের নিয়ে রয়েছেন চিন্তিত। এই বুঝি সন্তান কোন দলের সঙ্গে জড়িয়ে গেল।

তবে আমি মনে করি, পিতা-মাতা ও অভিভাবকরা চাইলেই নিজেদের সন্তানকে এসব থেকে দূরে রাখতে পারেন। এজন্য অবশ্যই নিজের কিশোর বয়সের সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলাভাবে মিশতে হবে। বুঝতে হবে সন্তান কী চায়! অবশ্যই সন্তানের সব অন্যায্য চাহিদা পূরণ নয়, বরং যেটা দরকারি সেটাকেই পূরণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে কিশোরগণ আমাদেরই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এদের সুপথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের সবার।

পরিশেষে বলতে চাই, একটি দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ এই কিশোররাই। তাই তাদের বিপথগামী থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আপনার আমার আমাদের সকলের। এসব কিশোর কারো ভাই, কারো ছেলে, কারো বন্ধু। তাই আমাদের উচিত তাদের সচেতন করা এবং এসবের কুফল বর্ণনা করা। সচেতনতাই পারে আমাদের রক্ষা করতে।

লেখক : আজহার মাহমুদ
কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল