বাঙালির জীবনে শোকাবহ আগস্ট

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ১১:১২

পঞ্চানন মল্লিক

বাঙালির জীবনে আগস্ট অত্যন্ত শোকাবহ একটি মাস। স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এ মাসেই আমরা হারিয়েছিলাম কতিপয় দুষ্কৃতকারীর হাতে। বাঙালির জীবনে এ শোক হারিয়ে যাওয়ার নয়। শোকের করুণ গাথা বুকে চেপে আমরা করে চলেছি দিনাতিপাত। আগস্ট এলে বুকের বাঁ পাশটা যেন ব্যথায় আরো বেশি টনটন করে ওঠে। স্মৃতির অ্যালবামে জ্বল জ্বল করে ওঠে এই নির্মম ঘটনাটি। বড়ই হৃদয়বিদারক, কখনো বিস্মৃতির বিন্দুমাত্র ধুলোয় বিমলীন হওয়ায় নয় এই শোকানুভূতি। শোকের চাদরে মোড়া এ মাসে চোখের সামনে ভেসে ওঠে জনকের স্মৃতিময় প্রিয় মুখ। তাকে কখনো ভোলার নয়। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা এই সাহসী মহাপুরুষ আবির্ভূত হয়েছিলেন বাঙালির পরিত্রাতা হিসেবে। বাঙালির জীবনে তার ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়। নিজের জীবন বাজি রেখে, জেল-জুলুম-নর্যাতন সহ্য করে তিনি বাঙালির জন্য মহান স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছিলেন।

তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বাঙালিদের। বড় ভালোবাসতেন। আর এই বিশ্বাস ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন। নিজেকে কখনো শাসক নয়, বরং বাঙালি জাতির এক মহান সেবক ভাবতেন তিনি। দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ধ্বংস স্তূপ থেকে দেশকে আস্তে আস্তে গড়ে তুলছিলেন। কোনো বাঙালি তার ক্ষতি করবে—এমনটি তিনি ভুলেও কখনো ভাবেননি। বাঙালি সবাই তার আপন এবং সমগ্র বাংলাদেশ তাঁর পরিবার আর সব বাঙালি তাঁর আপন সন্তানের মতো এমনটি ভাবতেন তিনি। সন্তান যেমন পিতার কোনো ক্ষতি করে না, তেমনি কোনো বাঙালিই তাঁর ক্ষতি চাইতেই পারে না, এ দৃঢ় বিশ্বাসে তিনি স্থির ও অবিচল ছিলেন। কিন্তু অপ্রত্যাশীতভাবে তাঁর সেই বিশ্বাস ও ভালোবাসা বিশ্বাসঘাতকতার কালিতে কালিমারঞ্জিত হলো সেনাবাহিনীর ক্ষমতালোভী কিছু বিপথগামী ব্যক্তির হাতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতির জীবনের দুর্ভাগ্যজনক সেই কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সাদামাটা বাড়িটি রঞ্জিত হলো জনক ও তাঁর পরিবার পরিজনের রক্তে। সিঁড়িতে গড়িয়ে গেল রক্তের স্রোত। একপাশে পড়ে রইল ভাঙা চশমাটি আর মেঝেতে নিথর দেহ। বাঙালি জাতির জীবনে বড়ই কষ্টের, বড়ই শোকাবহ সেই ঘটনা। দুর্বিষহ সেই ঘটনার কথা স্মরণ করলে আজও যেন কষ্টে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, এক অব্যক্ত ব্যথায় ছটফট করে ওঠে মন। জাতির জনককে হারানোর বেদনা বড়ই মর্মান্তিক, বড়ই ক্ষতির। সেই ক্ষতিতে আজও শোকের মাতম ওঠে বাঙালির হৃদয় গহিনে। ব্যথাতুর হয় মন। সেই স্মৃতি নিয়ে আজও কেউ গুমরে কাঁদেন নীরবে, কেউ শোক ব্যক্ত করেন বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে। কেউ তাঁকে খুঁজে পান আপন চেতনার অস্তিত্বে আর বিশ্বাসে। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হননি। ওইদিন তারা হত্যা করেছিল তাঁর পরিবারের সদস্যদের, দেহরক্ষী ও কাজের লোকদেরও। এমনকি মাত্র ১১ বছরের নিষ্পাপ শিশু রাসেলকেও তারা রেহাই দেয়নি। এই অবুজ শিশুর রক্তেও রঞ্জিত হলো স্বাধীন দেশের মাটি।

প্রতি বছর আগস্ট এলে তাই শুরু হয় বাঙালির শোক গাথা। জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। চারদিকে আবার বেজে ওঠে ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই। তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা। আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।’ বঙ্গবন্ধু শুধু দেশ স্বাধীন করেই বসে থাকেননি। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন দেশ ও বাঙালি জাতির উন্নয়ন। তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছিলেন দেশ গঠন আর দেশের মাটি ও মানুষের উন্নয়নের জন্য। বঙ্গবন্ধুর এ কর্মকা- দেশের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপীও সাড়া ফেলে প্রশংসা অর্জন করতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ তাঁর অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় সমগ্র বিশ্ব। তাঁর মৃত্যুতে পুরো বিশ্বে নেমে আসে শোকের তীব্র ছায়া। তাঁর মৃত্যুর পর দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লেখ করা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’ একই দিনে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকা-কে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ এমনিভাবে তার মৃত্যুতে বিশ্ব জুড়ে একদিকে শোকের বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে ঘৃণার বাষ্প বর্ষিত হয় হত্যাকারীদের প্রতি। হতবিহ্বল বাঙালি জাতি তাঁকে হারিয়ে অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েন। পিতা হারানোর বেদনাময় চাপা কান্না বুকে নিয়ে অতিবাহিত হতে থাকে বাঙালির কাণ্ডারিবিহীন জীবন। সেই থেকে তাঁকে হারানোর শোক বাঙালির বুকে জগদ্দল পাথরের মতো যেন চেপে বসে আছে। বাঙালির হৃদয় থেকে শেখ মুজিবের নাম কখনো হারানোর নয়। কিছুতেই মোছার নয় ৭৫-এর কালো দাগ। এর মাধ্যমে কিছু জঘন্য ব্যক্তি চিরতরে বিশ্বাসঘাতক হয়ে থাকবে বিশ্বের মধ্যে। আর কোটি কোটি বিবেকবান ও সচেতন বাঙালি হৃদয়ে ধারণ ও বহন করে চলবে পিতা হারানোর বহ্নিশোক। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার জল যত দিন প্রবহমান থাকবে, তত দিন ফলগুধারার মতো বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ মানব অন্তরে চির বহমান থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অমর হয়ে থাকবেন তিনি।

তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য প্রতি বছর আগস্ট এলে দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সম্পৃক্ত হন সমগ্র বাঙালি জাতি। যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর ১৫ আগস্ট পালিত হয় জাতীয় শোক দিবস হিসেবে। তবে বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় একজন মহান ব্যক্তিকে স্মরণের জন্য শুধু একটি নির্ধারিত দিনই যথেষ্ট নয়। তিনি বছরের ৩৬৫ দিনই স্মরণযোগ্য। তাঁর চিন্তা-চেতনা, জীবনাদর্শে আমরা যত বেশি উজ্জীবিত হতে পারব, ততই আমাদের জীবন সমৃদ্ধ হবে। আমরা মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারব। বিশ্বের বুকে আরো বেশি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারব। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।

বাঙালির জীবনে ফেব্রুয়ারির মতো আগস্টও এক স্বতন্ত্র শোকের মাস। ফেব্রুয়ারিতে যেমন রয়েছে ভাষার জন্য আত্মদানকারী ভাই হারানোর ব্যথা, আগস্টও তেমনি জাতির জনককে হারানোর মর্মান্তিক বেদনায় ভারাক্রান্ত একটি মাস। এই দুটি মাসের উপলব্ধি বা অনুভূতি তাই এক ও অভিন্ন। শোকাবহ আগস্ট আসে; প্রতি বছরই আসে আমাদের মধ্যে। শোকসন্তপ্ত বাঙালির হৃদয় ব্যথায় ভরে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর জন্য হু হু করে ওঠে মনটা। বাঙালির অস্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ মানে শেখ মুজিব। মুজিব বাঙালির চেতনা, আদর্শ ও বিশ্বস্ততার এক বাতিঘর। আজ তাঁর হাতে গড়া স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে চাই, তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি হয়েছে, কোনো কিছুর বিনিময়ে তা পূরণ হওয়ার নয়। তবু শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁর আদর্শ নিয়ে আমরা সম্মুখে অগ্রসর হতে চাই। কামনা করি এমন মর্মান্তিক ঘটনা বাঙালির জীবণে আর কখনো যেন না ঘটে। তাঁর মতো যেন কারো সরল বিশ্বাস আর ভালোবাসা কখনো কোনো অপশক্তি দ্বারা আর আক্রান্ত না হয়। শোকাবহ আগস্টে তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

পিডিএসও/হেলাল