আলমগীর খোরশেদ

  ১৮ আগস্ট, ২০২৩

গ্রামীণ ঐতিহ্য

গ্রামের বিয়ে

নববধূর প্রতিনিধিত্বশীল ছবি

বিয়ে হলো সামাজিক বন্ধন। বিয়ের মাধ্যমে পরিবারের সূত্রপাত হয়। আগামী উত্তরসূরির আবির্ভাবের জন্য নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ে একটি বৈধ সম্পর্ক জুড়িয়ে দেয়। বিয়েকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘হাঙ্গা’ বলা হয়। ঘটক বা রাবরের মধ্যস্ততায় কনে ও বরের পাকাপাকি দেখার পর উভয় পক্ষের লোকজন পরবর্তী করণীয় কাজ ঠিক করতে একত্রে বসেন। মতবিনিময় ও সম্মতির ভিত্তিতে উভয়েই একটা শুভবার, লগ্ন দেখে বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। অনেক লৌকিক আচার মেনে এগোতে থাকে বিয়ের কার্যাবলি। বিশেষ করে গায়েহলুদ, বিয়ে ও বৌভাত হলো বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার প্রধান কাজ।

ছোটবেলায় দেখতাম বরপক্ষ বিয়েতে মেয়ের বাবার কাছে আসবাবপত্র, টেপ রেকর্ডার, সাইকেল, সিকো ফাইভ ঘড়ি, নগদ টাকা, বিদেশ যাওয়া বা ব্যবসা করার জন্য টাকা চাইতে, যা অবস্থাভেদে আরো বাড়ত। যৌতুক দিতেই কাহিল হয়ে যেতেন মেয়ের অসহায় বাবা। মেয়ের বাবা মানেই উদভ্রান্তের মতো একজন মানুষ, যার মাথায় মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড়ের অপারগতা, দুশ্চিন্তা, ছোটাছুটি, খাওয়ার সময়ও পান না যেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাবারা বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ের জন্য মোড়ল, প্রধান, চেয়ারম্যান বা মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা আনতেন জমি বন্ধক রেখে।

ছেলে বা মেয়েকে বিয়ের দুদিন আগে তাদের গায়েহলুদ ও হাতে মেহেদি লাগানো হতো। মা, ভাবি, দাদি সম্পর্কের মুরব্বিরা এ কাজ করতেন। মেয়ে বা ছেলেকে কোলে করে উঠিয়ে এনে জলচৌকিতে বসানো হতো। একটি নতুন কুলায় কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর বাটা মেহেদি, হলুদ, দূর্বাঘাস, কয়েকটা বাতাসা, অবস্থাভেদে মিষ্টি মুখে দিয়ে কপাল ও গায়েহলুদ লাগানো হতো। আস্ত সরিষা ছোট কাপড়ে পুঁটলি বেঁধে তা বর-কনের হাতের কবজিতে বেঁধে শুরু হতো গ্রামীণ মেয়েলি গীত গাওয়া। পাড়ার বউ-ঝিরাও যোগ দিতেন—‘মেন্দি আনো হলুদ গিলা মাইয়ার অইবো বিয়া, ছাইড়েয়া যাইবো কইন্যা আমার কান্দে আমার হিয়া’, অথবা ‘হলদি বাটো মেন্দি বাটো... বিয়ার সাজে কন্যারে সাজাও জলদি।’

গায়েহলুদের দুপুরবেলা শুরু হতো রং দেওয়া ও কাদায় মাখামাখি। ‘কুনি রং’ দিয়ে দিত লুকিয়ে, কুনি রং যতক্ষণ শরীরে থাকত, পানিতে বা শরীর ঘেমে সারা শরীর লাল হয়ে যেত। স্বামী-স্ত্রী, ভগ্নিপতি, ভাবি, দেবর, দাদি, বিয়াইন-বিয়াই সম্পর্কের যারা, তারা লাল কুনি রং, পানি, গোবর এনে সম্পর্কের মানুষকে দৌড়িয়ে ধরে গায়ে মাখিয়ে দিত। জোর করে দিতে গিয়ে ছোট ছেলেমেয়েরা ভয়ে কান্নাজুড়ে দিত, এসব নিয়ে মনোমালিন্য, ঝগড়া পর্যন্ত গড়াত। বিয়ে বাড়িতে অনেকেই সারা দিন-রাত মাইক বাজাত। মাইকে ‘প্রাণো দোলে মেরা, প্রেমো দোলে মেরা... বাঁশুরিয়া’ অথবা ‘পেয়ার করনা তো ডরনা কেয়া’ কিংবা ‘ওরে ও পরদেশি’, ‘যাবার আগে দোহাই লাগে একবার ফিরে চাও’ গানগুলো বাজত। গায়েহলুদের সঙ্গে নারীরা গ্রামীণ মেয়েলি গীত গাইতেন—‘আলতা বরণ কইন্যা গো আমরার অইবো তারি বিয়া, বইয়া রইছি মেন্দি দিতাম গিলা, হলুদ দিয়া।’


মেয়ের বাবা মানেই উদভ্রান্তের মতো একজন মানুষ, যার মাথায় মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড়ের অপারগতা, দুশ্চিন্তা, ছোটাছুটি, খাওয়ার সময়ও পান না যেন


নারী সারা রাত পিঠা বানানোতে ব্যস্ত থাকতেন, ফলে রাতে গৃহস্থ বাড়িতে ঢেঁকির শব্দ শোনা যেত। পুরুষরা বাজার-সদায়, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের দাওয়াত, এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, কাজি, মৌলভি, বাবুর্চি, মেজবানির বড় ডেকচি, পাড়া থেকে সংগ্রহ, মুরগি-খাসি কেনা, অবস্থাভেদে শামিয়ানা টানানো, হ্যাজাক লাইট, হারিকেন সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতেন।

বিয়ে উপলক্ষে বাড়ি সাজানো হতো। বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার, আস্ত কলাগাছ কেটে এনে বাড়িতে ঢোকার রাস্তার দুপাশে কূপে (গর্ত করে) কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে গেট বানানো হতো। লাল-নীল-বেগুনি-হলুদ রঙের কাগজ তিন কোনা ত্রিভুজের মতো কেটে পাটের সুতলিতে (দড়ি) আটা দিয়ে লাগিয়ে দিয়ে বেড়া দিয়ে দিত। গেটপাস কত টাকা, তা লিখে কাগজ গেটে ঝুলিয়ে রাখা হতো। জামাই আসতেন রাতে। আমরা ছোটবেলায় আম্মাকে বলে রাখতাম, জামাই এলে ডাক দিয়ে ঘুম থেকে ওঠাতে। সারা রাস্তা লুঙ্গি পরে এসে শ্বশুরবাড়ির আগে কোথাও বিয়ের পাঞ্জাবি পরে নিতেন জামাই। লাল-নীল একটা ট্রাংক থাকত, তাতে বিয়ের জিনিসপত্র। অবস্থাভেদে ট্রাংকের বদলে চামড়ার সুটকেস থাকত। জামাইকে গেটে আটকানো হতো। শরবত খাওয়ানো হতো জামাইকে। শরবতে ঠাট্টা করে লবণ কিংবা লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে দিত। টেবিল বিছিয়ে জামাইকে নির্দিষ্ট করা টাকা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হতো। গেটপাস নিয়ে দুপক্ষের মুখরা ছেলেমেয়েদের তুমুল তর্কাতর্কি চলত। পরে মুরব্বিরা এসে মিলিয়ে দিতেন দেনা-পাওনার বিষয়টা। জামাই আসার পর ভেতর থেকে নারীরা গীত শুরু করতেন- ‘দুই হাতে দুই চান্দের বাতি, সারা রাতি জ্বলছে, কইনছেন গো জামাই আইতে কেন, এত দেরি অইছে।’ পটাশ (আতশবাজি) ফোটাত তরুণরা। টাশ টাশ করে শব্দ।

বর-কনের সম্মতিতে আকদ সম্পন্ন হতো। ট্রাংকে করে আনা বরের জিনিসপত্র নিয়ে খোঁচাখুঁচি হতো। এটা ভালে না, ওটা কম দামি, জামাইরা ছোটলোক, কিপ্টা, এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি, মনোমালিন্য, ঝগড়া পর্যন্ত হয়ে যেত দুপক্ষের।

এজিন (সম্মতি) নিতে উকিলসহ মৌলভি সাহেব কনের কাছে যেতেন। বেশ সময় ধরে চুপ থেকে, কান্না দেখিয়ে অনেকক্ষণ পর কনে আস্তে করে বলতে ‘কবুল’। মৌলভি সাহেব বারবার বলতেন—‘মা, কও কবুল। আফনেরা বেহেই হুনছুইন? মেয়ে কবুল কইছে।’

কাবিন ও বিয়ে হয়ে গেলে বর-কনেকে বড় থালায় খেতে দেওয়া হয়। এটাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলে সদর ভাতা। শ্যালক-শালিকা, ভাগনে, বিয়াই-বিয়াইন নিয়ে খেতে বসা হয়। অবস্থাভেদে আস্ত মুরগি ভাজি, পোলাও, ডিম, গরুর মাংস, কোরমা, কাবাব খেতে দেওয়া হয়। সাবান দিয়ে জামাইয়ের হাত ধোয়ায়ে টাকা নিত ছোটরা। বরযাত্রীদের থাকার জন্য গ্রামের বাড়িতে কাছারি ঘরের মেঝেতে ধানের খড় বিছিয়ে বিছানার চাদর দেওয়া হতো। বালিশের কভারে হাতের সুতোর কাজ করা, লেখা থাকত—‘মধুর মিলন’, ‘যাও পাখি বল তারে, সে যেন ভুলে না মোরে’, আরো কত কী! জগভর্তি শরবত, টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা পানি, নানা পদের পিঠা খেতে দেওয়া হতো। ঘরের পাট শোলার বেড়া থাকায় আঙুল দিয়ে বেড়া ফাঁক করে বাড়ির ভেতর তাকিয়ে থাকত বরপক্ষের লোকজন। এ নিয়েও অনেক ঝামেলা হতো।

বিয়ের সময় কনেকে দেনমোহর কত টাকা দিতে হবে, গেট পাস কত, উভয় পক্ষের কোনো দেনা-পাওনা-দাবি আছে কি না- এসব আগে থেকে মীমাংসা করে রাখা হতো না, বিধায় বিয়ের দিন দুপক্ষের তুমুল ঝগড়া হতো। বেশি ঝগড়া হতো দেনমোহর নিয়ে। এ নিয়ে বিয়ে ভেঙে দিতেও দেখেছি।

আজকাল আকাশ সংস্কৃতির কারণে গ্রামের মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। কলাগাছ পুঁতে বিয়ের গেট হয় না এখন। ডেকোরেশন এসে গেছে গ্রামে। যৌতুক নিয়ে আইন হওয়ায় ছেলেরা আগের মতো যৌতুক চায় না এখন। তার পরও আগের বিয়েতে প্রাণ ছিল, যা করত মন থেকে, কোনো অভিনয় ছিল না মানুষের মনে। আগে পারিবারিকভাবে হওয়া বিয়েগুলো জাত, বংশ, পরিবার, আচার-আচরণ দেখে হতো, ফলে বিয়েতে ছাড়াছাড়ি হতো না। জামাই দেখার জন্য রাত জেগে থাকা, পটাশ ফোটানো, গেটে টাকা নেওয়া, জামাইয়ের হাত ধোয়ানো, সেই সাদামাটা কিন্তু প্রাণবন্ত মুহূর্তগুলো আজকের প্রজন্মের মানুষ ডিজিটাল হয়ে মোবাইলে বুঁদ থেকে কোনো দিন পাবে না, বুঝবেও না গ্রামীণ সংস্কৃতির এ অধ্যায়।

পিডিএস/মীর

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
গ্রামীণ ঐতিহ্য,বিয়ে
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়