নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৩ মার্চ, ২০২০

জলাধার ভরাটে বাড়ছে অগ্নিঝুঁকি

পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত যাই হোক, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আর আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানী হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই ঝুঁকি বাড়ছে কয়েকগুণ। তাই দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটিগুলোর দেওয়া সুপারিশের বোঝা কাগজের আনুষ্ঠানিকতায় না রেখে বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

আগুনের তাপে গত কয়েক বছরে পুড়েছে অনেকের ঘর, নিভেছে অনেক জীবন প্রদীপ। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে নীমতলী থেকে চুড়িহাট্টা। বনানীর এফআর টাওয়ার থেকে অভিজাত শপিংমল। আগুন মানেনি পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত শহরের সীমানা। উঁচু বা নিচু তলার শ্রেণি ভেদও তোয়াক্কা করে না আগুন। অথচ নীমতলী ট্র্যাজেডির পর এখন পর্যন্ত যত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তাতে হয়েছে দফায় দফায় তদন্ত কমিটি, ভারী হয়েছে সুপারিশের তালিকা। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এসব সুপারিশের প্রয়োজনীয় বাস্তবায়নের উদ্যোগের অভাবে থেকেছে কাগজপত্রের গণ্ডিতেই। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় সর্বোচ্চ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এছাড়া সারা দেশে ১০ বছরে ছোট বড় ১৬ হাজার অগ্নি দুর্ঘটনায় মারা যান ১ হাজার ৫৯০ জন। এতে ৪ হাজার কোটি টাকার ওপর ক্ষয়ক্ষতি হয়।

এদিকে, ৮০-এর দশকের মাঝামাঝি পরীবাগ খাল ভরাটের মাধ্যমে ঢাকায় বক্স কালভার্ট নির্মাণের চল তৈরি হয়েছিল। ধীরে ধীরে এই বক্স কালভার্টগুলো নগরবাসীর জন্য বুমারেং হয়ে দেখা দেয়। উপলব্ধি ঘটে ঢাকার জলবদ্ধতার আরেক কারণ এই বক্স কালভার্টগুলোই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে উন্মুক্ত খালের আশপাশের জায়গা ভরাট করে প্লট হিসেবে বিক্রি করে মুনাফা অর্জনই ছিল উদ্দেশ্য।

খিলগাঁও ফ্লাইওভার সংলগ্ন স্থান থেকে জোড়পুকুর মাঠ হয়ে তিলপাপাড়ার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ঢাকা ওয়াসার খাল। সরকারি এ খালটি ভরাট করে সেখানে বানানো হয়েছে মার্কেট। খাল ভরাট করে ফেলায় এখন সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবন্দি হয়ে পড়ে পুরো এলাকার বাসিন্দারা। রাসেল স্কয়ার থেকে গ্রিন রোড হয়ে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল, হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজা থেকে সোনারগাঁও হোটেল, পান্থপথ থেকে পরীবাগ, ইব্রাহিমপুর বাজার থেকে মিরপুর বাউনিয়া খাল, সেগুনবাগিচা থেকে আরামবাগ হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, খিলগাঁও থেকে তিলপাপাড়া পর্যন্ত কয়েকটি বক্স কালভার্ট দেখা যায়।

কালভার্ট নির্মাণের পর ওয়াসার পক্ষ থেকে যে সতর্কতামূলক ফলক বসানো হয় তাতে ‘খালের নাম : খিলগাঁও/বাসাবো’ উল্লেখ করে বলা হয়—খালের মধ্যে অবৈধ কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না, খালের মধ্যে বাসাবাড়ির ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না, খালের মধ্যে সাঁকো, পানির লাইন, ঘরবাড়ি, টয়লেট, দোকান, রিক্সার গ্যারেজ স্থাপন দণ্ডনীয় অপরাধ।

ঢাকা ওয়াসার খাতায় এখনো খিলগাঁও-তিলপাপাড়া এলাকার খালটির অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে একটি নর্দমা মিলতে পারে; খালের কোনো চিহ্ন নেই। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বানানো এই কালভার্টগুলো কম-বেশি ভরাট হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টির পাশাপাশি ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস জমে বিপজ্জনক পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। এই পথ ধরে গিয়ে দেখা যায়, স্থানে স্থানে বক্স কালভার্টগুলো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। উন্মুক্ত কালভার্টে ময়লা-আবর্জনার স্তর জমে তাতে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ওয়াসা থেকে কালেভদ্রে পরিষ্কার করে যাওয়ার পর আবার আবর্জনা ফেলার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে অল্প কদিনেই তা আবার নর্দমা হয়ে ওঠে। খোলা কালভার্টে শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। মশার প্রজননেরও সহায়ক ক্ষেত্র হয়ে উঠছে এই কালভার্টগুলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্স কালভার্টের নেতিবাচক দিক বিবেচনা করে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসরে বক্স কালভার্ট ভেঙে খাল উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বহুবার। তবে এর বাস্তবায়নে এখন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চোখে পড়ে না। খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন বক্স কালভার্টটি তিলপাড়া, দক্ষিণ গোড়ান ও উত্তর বাসাবোর মধ্য দিয়ে আগমন সিনেমা হলের পেছন দিয়ে মান্ডা-মুগদা, সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী হয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। খাল তো খেয়ে ফেলেছেই, নদীগুলোর দূষিত হওয়ার সুযোগ বাড়িয়ে তুলছে এই বক্স কালভার্ট।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রি. জে (অব.) আবু নাঈম মো. শফিউল্লাহ বলেন, নিমতলীর অগ্নিকা-ের পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তদন্ত কমিটিতে ১৭ দফা সুপারিশ করা হলো। এরপর চুড়িহাট্টার ঘটনা ঘটল ৩১ দফা সুপারিশ করা হলো। এফআর টাওয়ারের পরপরই দেখলাম সিটি করপোরেশনের অনেক মুভমেন্ট হলো। আইনের অভাব নেই ভয়াবহতা হচ্ছে আইনের ব্যবহার নেই। যে অধিদফতর এ আইনের প্রয়োগ করে তাদের প্রশ্ন করতে হবে। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়নে এলাকাভিত্তিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

বুয়েটের পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, হাইরেস বিল্ডিং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম সাধারণত থাকে না হয় অনুমোদন দিবে না। ফায়ার এক্সিট থাকবে ফায়ার স্কেপ থাকবে। এফআর টাওয়ারে আমরা সবই দেখেছি, কিন্তু সেখানে ফায়ার ডোর নেই।

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
অগ্নিঝুঁকি,জলাধার,আগুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়