নতুন বই এবং উত্তেজনাকর হইচই

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:০৩ | আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:১৭

ভাষার মাসে বইমেলার আয়োজন; এ যেন আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে স্রোতের মতো মিশে গেছে। মুল আলোচনায় যাওয়ার আগে বইমেলার ইতিহাসটা জানিয়ে রাখা শ্রেয় মনে করছি। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়- বাংলাদেশে প্রথম বইমেলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি)। যা ছিল মূলত শিশু গ্রন্থমেলা, এর আয়োজন করেছিলেন কথাসাহিত্যিক সরদার জয়েনউদদীন। তিনি একসময় বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন। এরপর আরও বড় আয়োজনে গ্রন্থমেলা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তিনি। এই মেলায় আলোচনা সভারও ব্যবস্থা ছিল যাতে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম।

এরপর বাংলা একাডেমির বইমেলা শুরুর ইতিহাস হলো- ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। 

এভাবেই মূলত দেশে একুশে বইমেলার শুরু এবং প্রসার। বর্তমানে ২০২০ সালে বইয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি হু হু করে বেড়ে চলেছে প্রকাশক ও লেখকের সংখ্যা। মানের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে কয়টা মানসম্মত বই খুঁজে পাওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। এবারের একুশে বইমেলায় প্রথম দিন থেকে শতশত নতুন বই মেলায় আসছে। এই পর্যন্ত কয় হাজার নতুন বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও জানা সম্ভব হয়নি।

বইমেলা প্রাঙ্গণ বাংলা একাডেমি ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বলতে গেলে পুরোটাই দখল করে ফেলেছে। এখানে নাম না জানা প্রকাশনী এবং নতুন লেখকদের পদচারণায় প্রতিদিন মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত। সে অনুপাতে পাঠকের সংখ্যা কি বাড়ছে? যে পরিমাণ বই প্রকাশিত হচ্ছে সে পরিমাণ পাঠক কি আদৌ তৈরি হচ্ছে?

বই কিনতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অফার ছাড়া হচ্ছে। অনেকে লোভে পড়ে বই কিনছেও। তবে এটা ঠিক বই কিনে কেউ দেওলিয়া হয় না। সেক্ষেত্রে ফেসবুক একটা বড় ভূমিকা পালন করছে। সব লেখকরা তাদের বই প্রচারণার জন্য ফেসবুককে বেছে নিয়েছে। নানান রঙে, নানান ঢঙে বইয়ের প্রচারণা চলছে। প্রকাশকরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। কারণ তারাও জানে বই প্রচরাণায় লেখকের ভূমিকা থাকবে অগ্রগণ্য। হচ্ছেও তাই। এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে অনেক নতুন লেখক তাদের বইয়ের সেকেন্ড ও থার্ড এডিশন প্রকাশ পেয়েছে বলে খবর প্রকাশ করছে। তারা নাকি এর জন্য নিজের ফেসবুক আইডি ছাড়া বেনামি আইডিতে এমন সব খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কয়টা বইকে প্রথম এডিশন ধরা হচ্ছে। এটা কিন্তু চিন্তার বিষয়। তবে আমাদের দেশে শীর্ষ পর্যায়ের প্রকাশনীও বাণিজ্যের কথা চিন্তা করে অল্প অল্প বই প্রকাশ করে প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ সংস্করণ বলে চালিয়ে দিয়েছিল। যা সাহিত্যপ্রেমিদের অনেকেই হয়তো জানেন। এতে করে কি অন্যরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না?

মোবাইল ইন্টারনেট যুগে ছাপা বইয়ের পাঠক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বই পড়াও যে একটা বিনোদন তা মানুষ ভুলতে বসেছে। আগে মানুষ টেলিভিশনে বুদ হয়ে থাকত। এখন সেখান থেকে আরও উন্নত হয়েছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন থাকাতে আর ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়াতে মানুষ ডুবে থাকছে মোবাইল ফোনে। কাউকে বই গিফট করেও আপনি বইটি পড়াতে পারছেন না। এ ব্যর্থতা কার? এ ব্যর্থতা পুরো জাতির। আমরা ইন্টারনেট ঘেঁটে জ্ঞান অর্জন করছি। অথচ বইয়ের একটা পাতা পড়ে দেখার মতো সময় আমাদের নেই। এটা আমাদের জন্য লজ্জার। এটা সত্যি, একটি বই পড়ে আপনি কিছু না কিছু অবশ্যই শিখতে পারবেন। যা আপনার দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে কোনো না কোনো কাজে আসবেই। সুতরাং বইকে অবমূ্ল্যায়ন করা ঠিক হবে না। আর সেসব লেখকদের বলছি, অযথা অপপ্রচার করবেন না। 

লেখক : প্রতিদিনের সংবাদের অনলাইন ইনচার্জ