ইকবাল হোসেন জীবন, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)

  ২০ আগস্ট, ২০২৩

কার্যকারিতা হারাচ্ছে ফেনী নদীর মুহুরী সেচ প্রকল্প

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ওসমানপুর ইউনিয়নে সিডিএসপি বাঁধ এলাকা। ছবি সম্প্রতি তোলা- ইকবাল হোসেন জীবন

চট্টগ্রাম ও ফেনী সীমান্তবর্তী এলাকার ফেনী নদীতে বাস্তবায়ন হওয়া মুহুরী সেচ প্রকল্প কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ভাটি এলাকায় জমে যাওয়া পলির স্তরের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতি বদলে যাচ্ছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে এখানকার সিডিএসপি বাঁধ, বিস্তীর্ণ এলাকা ও শত শত মৎস্য ঘের। এতে ১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পটি ভেস্তে যেতে বসেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন বলছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে গেলে এখানে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ হারাবে ভিটেবাড়ি, কৃষক হারাবে জমি, নদীগর্ভে বিলীন হবে শত শত মৎস্য ঘের। ব্যাহত হবে এ এলাকায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের উন্নয়ন কাজ। কার্যকারিতা হারাবে সেচ প্রকল্প

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের ভাটিতে প্রায় ৭০০ বর্গমিটার এলাকা পলি জমে ৭৫ ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। এতে নদীর পানি প্রবাহের পথ বদলে একদিকে ছোট ছোট চর জেগে উঠছে অন্যদিকে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আবার সেচ প্রকল্পের বেশ কিছু জল কপাট (স্লুইস গেট) এরই মধ্যে পলি জমার কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে।

মিরসরাইয়ের ওসমানপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা দুখু মিয়া দেশ বর্তমানকে জানান, ২০১৯ সালের শুকনো মৌসুমে প্রকল্পের মুখে বালি ও মাটি জমাট শুরু হয়। ওই বছর বর্ষা শুরু হলে ভাঙন দেখা দেয়। যা গত ৩৫ বছরেও এখানকার মানুষ দেখেনি। এরই মধ্যে শতাধিক মৎস্য ঘের নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

এদিকে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় মিরসরাই, ফেনী ও সোনাগাজী উপজেলার ২৭.১২৫ হেক্টর জমি ইরি চাষের আওতায় আসে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ভরা বর্ষা শুরু হওয়ার আগে নদীতে পলি জমা এলাকা জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং করা না হলে একদিকে নদীর উজানে গ্রামের পর গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে অপরদিকে এখানকার জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকবে। সিডিএসপি বাঁধ ভাঙলে বিপর্যয়

মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ জনপদকে বঙ্গোপসাগরের ভাঙন থেকে রক্ষা করতে ১৯৯৪ সালে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্পের (সিডিএসপি) আওতায় বাস্তবায়ন করা হয় ১১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বাঁধ। এ বাঁধের কারণে এখানকার বাঁশখালী ও ইছাখালী এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার একর মৎস্য ঘের। যা থেকে চট্টগ্রামের মৎস্য খাদ্য চাহিদার ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয়।

এদিকে আশঙ্কা করা হচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে সিডিএসপি বাঁধের পশ্চিম পাশে সুরক্ষা ব্লক না বসালে চলতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।

সরেজমিনে সিডিএসপি বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের উত্তর অংশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ফেনী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। বাকি অংশটুকু বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগর অববাহিকায়। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় নদী ও সাগর থেকে বাঁধের দূরত্ব ছিল প্রায় ৭০০ মিটার। বর্তমানে কোথায় ১০ মিটার আবার কোথাও ১৫ মিটার দূরত্ব রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের বর্ষা মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ এ বাঁধ ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়বে।

দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় ভাঙন রোধে সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে সুরক্ষার জন্য সিসি ব্লক বসালেও বর্তমানে তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

সিডিএসপি বাঁধের ভাঙন প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এলাকার লোকজনের কাছ থেকে জেনে আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি। সেখানে ভয়ংকর অবস্থা। যেকোনো সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে ২০২১ সালে আমরা পানিসম্পদমন্ত্রী ও সচিব বরাবরে ই-মেইলে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। কার্যত এটির কিছুই হয়নি।’ ব্যাহত হবে শিল্পনগর উন্নয়ন

মিরসরাইয়ের বঙ্গোপসাগর উপকূলে জেগে ওঠা ৩০ হাজার একর ভূমিতে দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর বাস্তবায়নের কাজ চলছে। যার উত্তরাংশের পুরোটাজুড়ে প্রতিরক্ষার কাজ করছে এখানকার সিডিএসপি বাঁধ। এটির ভাঙন দেখা দিলে শিল্প নগরের উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হবে এমন আশঙ্কা করছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজা জেরিন বলেন, ‘খুব সহসা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে। এখানকার জনবসতি, মৎস্য প্রকল্প ও বাস্তবায়নাধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজ ক্ষতির মুখে পড়বে। আমি বিষয়টি দেখছি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলব।’

মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙনের বিষয়টি নিয়ে আমি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা এ ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। পরে আমি বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি তবে এখনো কিছুই হয়নি।’

পাউবোর বক্তব্য : এ বিষয়ে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান চৌধুরী জানান, নদীর ভাটি এলাকায় জমে থাকা পলি ড্রেজিংয়ের জন্য আমরা আরো আগে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ বিষয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি নেই।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ফেনী নদী,মুহুরী সেচ প্রকল্প
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়