মো. সৈকত সোবাহান, বদলগাছী (নওগাঁ)

  ১৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সোমপুর বিহার, ভুলে যাওয়া সভ্যতা 

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট নওগাঁর বদলগাছীর সোমপুর বিহার। এর নিচে চাপা পড়ে আছে বাংলার এক আলোকিত অধ্যায়। বাংলাদেশে অবস্থিত তিনটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে বিহারটি অন্যতম। সোমপুর বিহারের অবস্থান নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে। তাই অনেকের কাছে সোমপুর বিহারটি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার নামেও পরিচিত। পাল বংশ বাংলায় ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৪০৬ বছর রাজত্ব করেছিল। পাল শাসকরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ও উদার ছিলেন। মূলত বাংলা ও বিহার কেন্দ্রিক পাল রাজ্য সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্তর পশ্চিমে পাকিস্তানের খায়বার-পাখতুনখওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

ধারণা করা হয় পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপালের সময়ই নির্মিত হয়েছিল এই সোমপুর বৌদ্ধবিহার। আবার অনেকেই ধারণা ধর্মপাল নন তার পুত্র রাজা দেবপাল ছিলেন এই বিহারের নির্মাতা। সোমপুর বিহার স্থাপত্য শিল্পে অনন্য এবং আকারে সর্ববৃহৎ।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সুদূর চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও জ্ঞানচর্চার জন্য আসতেন। মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান খ্রিস্টিয় দশম শতকে এই বিহারের আচার্য ছিলেন বলে অনেকে অনুমান করেন। তার সুখ্যাতি বাংলার গন্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সুদূর তিব্বতে। এই মহান পন্ডিতের বাড়ি ছিল ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে।

মোটামুটি ৬০০ বছর স্মৃতির অতলে হারিয়ে থাকার পর পুনরায় এর হদিস মেলে ১৮০৭-১৮১২ সালের দিকে। এরপর স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিমহাম ১৮৭৯ দিকে এবং ব্রিটিশ ভারতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯২০ এর দশকে আংশিক খনন কাজ চালায়। ১৯৮০ সালের দিকে পুনরায় খনন কাজ শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করে।

২০১৪ সালে বৌদ্ধ বিহারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও দর্শনশীল করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন এডিপির অর্থায়নে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এ সংস্কার কাজ শুরু হয়। ৩ বছর ধরে চলে এ সংস্কার কাজ। আর এসব কাজের মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনশীল ও আকর্ষণীয় মূল প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বারের দক্ষিণ পার্শ্বের কক্ষে রয়েছে প্রত্নতত্ত্বের সামগ্রী ও বই। উত্তর পার্শ্বে কক্ষে রয়েছে টিকিট কাউন্টার। তার পার্শ্বে রয়েছে মহিলা টয়লেট ও পুরুষ টয়লেট। নির্মাণ করা হয়েছে একটি মসজিদ। তৈরি করা হয়েছে অফিসারদের জন্য কোয়ার্টার, আনসার কোয়ার্টার, স্টাফ কোয়ার্টার। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য তৈরি করা হয়েছে ১০টি ছাউনি। ছাউনিগুলোর পার্শ্বেই রয়েছে ১টি পুকুর। এছাড়া পাথওয়ের মাঝে রয়েছে একটি বসার স্থান। আর এ পাথওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে মনোরোম পরিবেশে। রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। এর মধ্যে পিকনিক কর্নার থেকে সরাসরি বৌদ্ধ মন্দির প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয়েছে ১টি সেতু। মন্দিরের প্রধান ফটকসহ ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে ৩টি ব্রিজ। আর বৌদ্ধ মন্দিরের চূড়ায় উঠার জন্য তৈরি করা হয়েছে কাঠের সিঁড়ি।

পাহাড়পুরের স্থাপত্য শিল্পের হিসাব-নিকাশ, প্রায় ২৭ একর জায়গাজুড়ে বিহারটি বিস্তৃত। এতে রয়েছে ১৭৭টি কক্ষ। মাঝখানের মন্দিরটিকে দূর থেকে পাহাড়ের মতো দেখায়। এ মন্দিরের বেসমেন্ট ক্রুশাকার। প্রতিটি ক্রুশবাহুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১০৮.৩ মি. ও ৯৫.৪৫ মি.। মধ্যবর্তী স্থানে আরো কয়েকটি অতিরিক্ত দেয়াল কৌণিকভাবে যুক্ত। কেন্দ্রে দরজা-জানালাবিহীন একটি শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণাকার প্রকোষ্ঠ আছে। প্রকোষ্ঠটি মন্দিরের তলদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। মূলত এ শূন্যগর্ভ প্রকোষ্ঠটিকে কেন্দ্র করেই সুবিশাল এ মন্দিরের কাঠামো নির্মিত। মন্দিরের বর্তমান উচ্চতা ২১ মিটারের মতো। তবে ধারণা করা হয় একসময় হয়ত ৩০ মিটারের বেশি ছিল। মূল মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার দেখার মতো। সেখানে বিভিন্ন রকমের মূর্তিসহ আজও জীবন্ত হয়ে আছে হাজার বছর আগের শিল্পীর কল্পনা। ধারণা করা হয়, তান্ত্রিক সাধক ও শিক্ষার্থী ভিক্ষুকরা অবস্থান করতেন এই ঘরগুলোতে।

ধারণা করা হয়, বাংলায় ক্ষীয়মাণ বৌদ্ধ শাসন, হিন্দুপ্রধান সেনবংশের উত্থান এবং বাংলায় মুসলিম বিজয়ের পর নব্য রাজনৈতিক পটভূমিকায় আস্তে আস্তে বিহারটি লোকশূন্য হতে হতে একসময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।

শেষ বিকালে প্রতিটি ইটের লালাভ উজ্জ্বলতায় মনে করিয়ে দিতে থাকবে মাটিচাপা পড়া এক সভ্যতার কথা।

কীভাবে আসবেন : ঢাকা থেকে নওগাঁর দূরত্ব ২৮০ কিমি। ঢাকার আবদুল্লাহপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর কিংবা গাবতলী থেকে মোটামুটি যেকোনো সময়ই নওগাঁগামী বাস পাওয়া যায়।

এ ছাড়া নওগাঁ শহরের অদূরেই আছে শান্তাহার রেল জংশন। শান্তাহার থেকে নওগাঁর ২০ মিনিটের পথ। ছোট যমুনার কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা নওগাঁ জেলা শহর অত্যন্ত ছিমছাম ও নিরিবিলি। শহর থেকে পাহাড়পুরের দূরত্ব ২৮ কিলোমিটার। থাকার জন্য পাহাড়পুর প্রত্নতত্ত্ব রেস্ট হাউস রয়েছে। শনি ও রবিবার মিউজিয়ামের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এছাড়া সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে মিউজিয়াম।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
সোমপুর বিহার,ভুলে যাওয়া সভ্যতা
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়