মোঃ মনিরুজ্জামান, ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম)

  ২২ আগস্ট, ২০২২

ভূরুঙ্গামারীতে পলিথিন বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল

সাড়া ফেলেছেন মোশাররফ 

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে পারভেজ মোশাররফ নামের এইসএসসি পরীক্ষার্থী পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল পুড়ে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল তৈরি করছেন। তার এ প্রতিভাকে এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন এলাকাবাসী। এতে এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার পাথরডুবী ইউনিয়নের মইদাম গ্রামের কৃষক বদিউজ্জামানের ছেলে পারভেজ মোশাররফ (১৯)। বাড়ির উঠানেই একটি আবদ্ধ ড্রামে পরিত্যক্ত পলিথিন রেখে আগুনে তাপ দিয়ে পলিথিন গলিয়ে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন তৈরি করেছেন। এসব জ্বালানি দিয়ে মটর সাইকেল চালনা করে এলাকার মানুষকে হতবাক করে দিয়েছেন। এছাড়া মাটি ও পানিতে ওই তরল পদার্থ ফেলে আগুন জ¦ালিয়ে পেট্রল প্রমাণ করেছেন। তার দেয়া পেট্রল ও অকটেন ব্যবহারকারী এলাকার বেশ কিছু মটর সাইকেল চালক বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আর ডিজেল দিয়ে চলছে কৃষিতে ব্যবহৃত পাওয়ার টিলার ও স্যালো মেশিন।

পারভেজ মোশাররফ জানান, তিনি মইদাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি পাশ করেন। পরে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত মইদাম মহাবিদ্যালয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। আড়াই বছর আগে ইউটিউবে তৌহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তৈরির একটি ভিডিও দেখেন। পরে সেখান থেকে গবেষণা করে তিনি পরিত্যক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল পুড়িয়ে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল তৈরির চেষ্টা করেন। সে সময় প্রায় ১২০ লিটার জ্বালানি তেল সংগ্রহ করেন। পরে সারা দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় তার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পরে তার কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় গত ১৯ আগস্ট থেকে পুনরায় জ্বালানি উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু করেন।

পারভেজ জানান, পরিত্যক্ত পলিথিন যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে এগুলো সংগ্রহ করে একটি আবদ্ধ ড্রামে রেখে আগুনে অতিমাত্রায় তাপ প্রয়োগ করে গলিয়ে ফেলা হয়। বাষ্পায়িত হয়ে ডিজেল এবং নল দিয়ে বের হয়ে পেট্রল ও অকটেন তৈরি হয়। সর্বশেষ পাইপ দিয়ে গ্যাস বের হলে সেখানে আগুন দিলে আগুন লেগে থাকতো। যত তাপমাত্রা বেশী দেয়া হয় তত বেশি তরল পদার্থ নির্গত হয়। সেই সাথে গ্যাস বের হয়। এসব সংগৃহীত তরল পদার্থ ছাকনি দিয়ে পরিশোধন করা হয়।

পারভেজ বলেন, এই তরল পদার্থ হাইড্রোকার্বন তাই এগুলো ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও এলপি গ্যাস। তিনি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সুযোগ না পেলেও প্রাথমিকভাবে মাটিতে ঢেলে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করেছেন।

তিনি জানান কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বাজার থেকে তেলের একটি বড় টিনের ড্রাম , একটি মাঝারি প্লাস্টিকের ড্রাম, ছোট দুইটি ড্রাম ও কন্টেইনার, প্রায় ৭ ফুট স্টিলের পাইপ ও কয়েক হাত প্লাস্টিকের ফিতা কিনে কাজ শুরু করেন। পরিত্যক্ত পলিথিন ৩০ টাকা কেজি দরে কিনে নেন। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিথিনগুলো টিনের ড্রামে ভরে প্রায় আধাঘণ্টা ড্রামের নিচে খড়ি দিয়ে তাপ দেন। এতে প্রায় ১ মণ জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হয়। এরপর ড্রাম থেকে নির্গত গ্যাস স্টিলের পাইপ দিয়ে এসে প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে রাখা পানিতে ঠাণ্ডা হয়ে পেট্রল এবং ডিজেলের ছোট কন্টেইনারে জমা হয়। ১০ কেজি পলিথিন থেকে প্রায় ৭ লিটার জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রতি লিটার জ্বালানি ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায়। এর মধ্যে উচ্ছিষ্ট পলিথিনের ছাই ফটোস্ট্যাট মেশিনের কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ওই জ্বালানি দ্বারা মোশাররফ নিজের মোটর সাইকেল চালান বলে জানান। এলাকার বাসিন্দা হাবিল উদ্দিন ও রুবেল বলেন, ওই জ্বালানি দ্বারা আমরা আমাদের মোটর সাইকেল চালাচ্ছি। এতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।

সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার এ প্রতিভা বিকশিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসী। পাথরডুবী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সবুর বলেন, আগে জানতাম পলিথিন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এ পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল তৈরি করা হয় তা জানতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত পারভেজের পাশে দাঁড়ানো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, ড. মোঃ সাইফুর রহমান সরকার বলেন, পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য হতে জ্বালানি পদার্থ যথা ডিজেল, পেট্রল বা অকটেন উৎপাদনে পারভেজের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ ধরণের উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে করা গেলে তা যেমন পরিবেশ দূষণ কমাতে সহায়ক হবে তেমনি জ্বালানির চাহিদা পূরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতপক্ষে, সারা বিশ্বের বৈজ্ঞানিকগণ পলিথিন বা প্লাস্টিক বর্জ্য হতে জ্বালানি উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তারা অনেকাংশে সফল হয়েছেন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য হতে বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদনের প্লান্ট রয়েছে।

এ ব্যাপারে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপক কুমার দেব শর্মা বলেন, বিষয়টি শুনেছি। এর কার্যকারিতা কতটুকু ও পরিবেশবান্ধব কি-না তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ণয় করা হবে। পরিবেশবান্ধব হলে তা আরো উন্নতভাবে তৈরি করতে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ভূরুঙ্গামারী,পলিথিন বর্জ্য,জ্বালানি তেল
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়