দুষ্টচক্রের থাবা এখনো আলুর বাজারে

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৯:২৪ | আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৫

হাসান ইমন

আলুর বাজার এখনো দুষ্টচক্রের নিয়ন্ত্রণে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কেজিপ্রতি আলু বিক্রি হয়েছে ৪০-৫০ টাকায়। কেজিপ্রতি ২০ টাকায় বিক্রি করলেই লাভ হওয়ার কথা থাকলেও দ্বিগুণের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। হিমাগার পর্যায়ে আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। খুচরা বাজারে এসে দাম দাঁড়াচ্ছে ৫০ টাকায়। অথচ সরকারি-বেসরকারি কোনো হিসাবেই এ মুহূর্তে আলুর ঘাটতি নেই দেশে। সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিমুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছেন হিমাগারে আলু সংরক্ষণকারী ব্যবসায়ীরা—অভিযোগ পাইকারি ব্যবসায়ীদের।

এদিকে চাল ও পেঁয়াজের দামও চড়াই আছে। মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬২ টাকায়। মাঝারি (পাইজাম ও লতা) চালের দাম প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নিম্নবিত্তদের খাদ্য হিসেবে পরিচিত মোটা চালের দাম। এই চালের (স্বর্ণ ও চায়না ইরি) দর এখন ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি। আমদানি করা পেঁয়াজের বর্তমান দর ৯০ থেকে ১১০ টাকা। তবে আগের মতোই দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। আলুর দাম অস্বাভাবিক বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ অক্টোবর ভোক্তা, আড়ত ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দিয়ে কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে ৬৪ জেলার প্রশাসক তথা ডিসির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এক সপ্তাহ পর জানাজানি হয় বিষয়টি।

জেলা প্রশাসকদের ভোক্তাপর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয় কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে। সেই সঙ্গে কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২৩ টাকা এবং আড়তে ২৫ টাকা কেজি দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

কৃষি বিপণন অধিদফতর থেকে আলুর দাম বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হলে গতকাল দিনভর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিষয়টি। কম দামে আলু পাওয়ার আশায় গতকাল সকালে অনেক ক্রেতাই ছুটে যান বাজারে। তবে বাজারে গিয়ে তাদের হতাশ হতে হয়েছে। কারণ আগের মতোই আলুর দাম চড়া।

এ বিষয়ে কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (খ্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘সরকার বলছে, আলু, চাল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের ঘাটতি নেই। বাজারে সরবরাহ আছে ঠিকঠাক। তাহলে কেন দাম বাড়ছে! নিশ্চয়ই এরই মধ্যে আরেক পক্ষ রয়েছে, যারা এখান থেকে মুনাফা নিচ্ছে। তাহলে সরকারকে এই পক্ষটাকে খুঁজে বের করতে হবে এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে দ্রুতই দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।’ তিনি আরো বলেন, সরকারকে ভোক্তাবান্ধব হতে হবে। ভোক্তাবান্ধব হলে সবকিছুর দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ বিষয়ে গতকাল সচিবালয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা আলু কিনেছেন ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে। কিন্তু এটা তাদের ৪৫-৫০ টাকা করে কেন বিক্রি করতে হবে? ন্যূনতম একটা নৈতিকতা তাদের মধ্যে কাজ করে না।’ তিনি আরো বলেন, এটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসন চেষ্টা করে। তবে বাস্তবে এটা করা যায় না। বাজারে চাহিদা ও তাদের (ব্যবসায়ী) নানা কারসাজির কাছে এটা করা খুব কঠিন একটা কাজ। তবে আমরা চেষ্টা করছি। আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছি না।’

রামপুরা বাজারে আলু কিনতে যাওয়া আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘গণমাধ্যমে দেখলাম, সরকার আলুর দাম খুচরা পর্যায়ে ৩০ টাকা বেঁধে দিয়েছে। কম দামে আলু কিনতে পারব এই আশায় বাজারে এসেছি। কিন্তু সবাই গতকালের মতো প্রতি কেজি আলুর দাম ৫০ টাকা চায়। বাজারে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের তো কোনো বাস্তবায়ন দেখছি না।’

আলুর দাম নিয়ে একই রকম হতাশা ব্যক্ত করেন কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে যাওয়া রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুধু দাম বেঁধে দিলে হবে না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত মাঠে নামতে হবে। কঠোর মনিটরিং করতে হবে। তা না হলে কেউ সরকারের কথা শুনবে না।’

কারওয়ান বাজারে এক নম্বর আড়তের মালিক ও পাইকার আলু ব্যবসায়ী মো. হানিফ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বর্তমানে কারওয়ান বাজারে রাজশাহীর প্রতি কেজি পাইকারি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকায়, বিক্রমপুরের আলু ৪১ টাকায় এবং লাল আলু ৪০ টাকায়। আর ছোট-বড় একত্র করে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৮-৩৯ টাকা। এক দিন আগেও রাজশাহী ও রংপুরের আলু বিক্রি হয়েছিল ৪৬ টাকা, বিক্রমপুরের আলু ৪৫ টাকা এবং লাল আলু ৪৩ টাকা দরে।

আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সালাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারণ করেছে ২৫ টাকা কিন্তু সেই দামের আলু কেন আসছে না, সেটা দেখা প্রয়োজন। আমরা আরো কম দামে বিক্রি করতে পারব, তবে আমাদের কম দামে দিতে হবে। না হলে আমরা কোথায় পাব, কীভাবে বিক্রি করব?’

কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টন। দেশে আলুর চাহিদা ৭০ লাখ টন। সে হিসেবে উদ্বৃত্ত আলুর পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ টন। আগস্ট পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, দেশে ৩৬৯টি হিমাগারে ৩০ লাখ টন আলু মজুদ আছে। উৎপাদনের ২৭ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট আলু কৃষকপর্যায়ে সংরক্ষণ হয়।

পিডিএসও/হেলাল