বাঁশের ফার্নিচার তৈরিতে যুক্ত হচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা

সাশ্রয়ী উপকরণ হিসেবে বাঁশের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ ধরনের ফার্নিচার তৈরিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। বিশ্ববাজারেও বাঁশের তৈরি পণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি শুরু করেছে দেশের বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
বিএফআরআই ও সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গাছের ওপর চাপ কমাতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন গবেষণাগার ইনস্টিটিউট ২০০৪ সাল থেকে বাঁশের নানামুখী ব্যবহার ও দৃষ্টিনন্দন ফার্নিচার তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করছে। দীর্ঘ একযুগ প্রচেষ্টার পর বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের দরজা, আলমারি, ওয়্যারড্রোব, ডাইনিং সেট, খাট, শোকেস, সোফা সেট, ড্রেসিং টেবিল, পার্টিকেল বোর্ড, বেড, মেঝে ও দেয়ালের টাইলসসহ সব ধরনের ফার্নিচার বানাতে সক্ষমতা অর্জন করেছে বিএফআরআই। বাঁশ ব্যবহারের মাধ্যমে শোপিস, খেলনাসহ নিত্যব্যবহারের প্রায় ৫০ ধরনের সামগ্রীও তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
বিএফআরআইর প্রকল্প পরিচালক ড. খুরশীদ আকতার এ প্রসঙ্গে বলেন, ২০০৪ সালে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার তৈরির এ প্রকল্প নেয়া হয়। চলতি বছর প্রকল্পটি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে। আগে একটি বাঁশের অর্ধেক অংশই নষ্ট হতো। এখন প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে তৈরি ফার্নিচার দুই-এক বছরের মধ্যে নষ্ট হয়ে যেত। নতুন পদ্ধতিতে বাঁশের সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত করে স্থায়িত্ব ভালো মানের কাঠের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাঁশের এসব ফার্নিচার তৈরিতে খরচ কয়েক ভাগ নেমে আসায় ক্রেতাদের সামর্থ্যের মধ্যেই সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিএফআরআই থেকে প্রশিক্ষণ সহায়তা নিয়ে বাণিজ্যিক বিপণনের জন্য চট্টগ্রামে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কারখানা করেছে চট্টগ্রামভিত্তিক একে খান গ্রুপের একে খান ফ্লাইং উড লিমিটেড। এছাড়া ঢাকার ডিজাইন টেক্স প্লাস লিমিটেড ও চট্টগ্রামের আহমেদিয়া এন্টারপ্রাইজ ফার্নিচার তৈরি, বিপণন ও রফতানি শুরু করেছে।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব সামগ্রী চট্টগ্রামে বিপণনের পাশাপাশি একে খান গ্রুপ মালয়েশিয়া ও জার্মানিতে রফতানি করেছে। বিএফআরআই থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কারখানা ও চারটি শোরুমে নিয়ে পাঁচ বছর ধরে ব্যবসা করে আসছে ডিজাইন টেক্স প্লাস লিমিটেড। সম্প্রতি ৩৫ জন কর্মীকে বিএফআরআই থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আহমেদিয়া এন্টারপ্রাইজ বাঁশের ফার্নিচার তৈরি কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগ্রুপও বাঁশের দিয়ে এ পদ্ধতিতে ফার্নিচার তৈরির পরিকল্পনা করছে।
বাঁশের তৈরি ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডিজাইন টেক্স প্লাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এখলাসুর রহমান বলেন, আমি গত পাঁচ বছর ধরেই বাঁশের তৈরি ফার্নিচারের ব্যবসা করে আসছি। বিএফআরআই থেকে কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঢাকায় কারখানা স্থাপন করে দেশীয় বাজারে বিপণন করা হচ্ছে। দেশে চারটি বিক্রয়কেন্দ্রে উৎপাদিত ফার্নিচার বিক্রি ছাড়াও বিশ্ববাজারে রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। বাঁশের উন্নতমানের ফার্নিচার তৈরির জন্য ২ কোটি টাকার বেশি মূলধনি যন্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে।
চট্টগ্রামে বিএফআরআইর কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, পরিপক্ব বাঁশ যন্ত্রের সাহায্যে ৮ থেকে ১০ ফুট আকারে কেটে রাখছেন শ্রমিকরা। এর পর শুকিয়ে প্ল্যানার মেশিনে এসব বাঁশের বিভিন্ন অংশ মসৃণ করে তোলা হয়। মসৃণের পর স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য বোরাক্স-বোরিক এসিডের দ্রবণে ট্রিটমেন্ট করা হয়। ইউরিয়া ফরমালডিহাইড গ্লু ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগে বিভিন্ন স্তরবিশিষ্ট বাঁশের ফ্লাইবোর্ড করার পর তা ফার্নিচার তৈরির কাজে লাগানো হয়।
বিএফআরআইর গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বাঁশ প্রক্রিয়াজাত করে বিশেষ উপায়ে তৈরি এ ফার্নিচার দেখতে দৃষ্টিনন্দন। সেগুনগাছের ডাইনিং সেট (একটি টেবিল ও ছয়টি চেয়ার) বানাতে যেখানে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ হয়, বাঁশ দিয়ে তা বানাতে খরচ হবে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। এছাড়া চেয়ার, টেবিল, সোফাসেট, দরজাসহ বাঁশের যেকোনো ফার্নিচারই কাঠের তৈরি ফার্নিচারের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ কম খরচ পড়বে। স্থায়িত্বের দিক দিয়েও এটি অন্যান্য কাঠের মতো ২৫-৩০ বছর টেকসই হবে। তাছাড়া ফানেল ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এর স্থায়িত্ব ৫০-৫৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, নতুন উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি আরো জনপ্রিয় হলে বনাঞ্চল রক্ষার পাশাপাশি রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
আহমেদিয়া এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান গনি জানান, এক বছর আগেও দেশীয় বাজারে শুধু উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে বাঁশের ফার্নিচারের অর্ডার আসত। বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতেও বাঁশের কদর বাড়ছে। সর্বপ্রথম একে খান ফ্লাইং উড লিমিটেড বাণিজ্যিকভাবে বাঁশের ফার্নিচার তৈরি করে দেশের বাজারে সরবরাহ শুরু করে। চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ববাজারে রফতানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রামের অক্সিজেনে একটি কারখানা স্থাপন করেছি।
বাঁশের বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়ে ড. খুরশীদ আকতার আরো জানান, একটি ভালো মানের গাছ পরিপক্ব হয়ে ব্যবহার উপযোগী হতে ১৫-২৫ বছর সময় লাগে। কিন্তু একটি বাঁশ মাত্র তিন-চার বছরেই পরিপক্ব হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ এগিয়ে এলে বাঁশের পণ্য তৈরি ও বিপণনে নতুন দিগন্তের শুরু হবে বলে আশা করেন তিনি।









































