নিজস্ব প্রতিবেদক

  ০১ আগস্ট, ২০২১

অর্থনৈতিক উন্নয়নে নদী খনন জরুরি

অর্থনীতিতে নদীপথের অবদান বাড়ানোর লক্ষ্যে নদীপথের অভিগম্যতা বৃদ্ধি ও টেকসই নদী খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ, জাতীয় বাজেটে এখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ড্রেজিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রীম কর হ্রাসকরণ, নদী খনন ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কার্যক্রমকে সরকারের ফাস্ট-ট্রাকের আওতায় অন্তর্ভুক্তিকরণ, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আর্থিক প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) গতকাল ‘টেকসই নদী খনন : চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকার’ শীর্ষক ওয়েবিনারের আয়োজন করে। এতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। জাতীয় সংসদের সদস্য ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার ওয়েবিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সারা দেশে নদীরগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে এবং এলক্ষ্যে নদী ব্যবস্থাপনার প্রতি বেশি গুরুত্বারোপের পাশাপাশি বর্তমান সরকার আরো ৩৫টি ড্রেজার সংগ্রহে কাজ যাচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, বিগত ১২ বছর ধরে সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করে যাচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে এর ইতিবাচক প্রভাব পরীলক্ষিত হবে। তিনি বলেন, সারা দেশে নদী খননে ড্রেজার ব্যবহার দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়ায় অনেকাংশে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। এরই মধ্যে মংলা বন্দরের সক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দরের মতো উন্নীত করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, করোনা মহামারি সময়কালে বেসরকারি খাতে সহায়তার লক্ষ্যে বেশকিছু প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সাফল্যকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে, দেশের নদ-নদী খনন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সরকার যুগোপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) এমপি বলেন, এ কাজে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ড্রেজিং সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের সব সংস্থার মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানো একান্ত আবশ্যক। তিনি বলেন, ড্রেজিং মেশিনারিজ আমদানিতে সম্প্রতি সরকার প্রবর্তিত বিভিন্ন শুল্ক আরোপ বেসরকারি খাতে নিরুৎসাহিত করেছে এবং এগুলো হ্রাসকরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে ড্রেজিং কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানে ডিপিএম ব্যবস্থা ব্যবহারের ওপর তিনি জোর দেন। এছাড়াও তিনি দেশীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কবির বিন আনোয়ার বলেন, যথাযথ নদী খনন কার্যক্রম বাস্তবায়নে মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত নীতিমালা আবশ্যক এবং এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সারা দেশে নদী খনন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের ৫০০টি ড্রেজারের প্রয়োজন হলেও সর্বমোট রয়েছে ১৫৬টি, এমন বাস্তবতায় সরকারের পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতকে এখাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি জানান, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য নদী রয়েছে এবং গ্রামীণ এলাকার নদীপথ, পুকুর ও হাওর-বাঁওড় উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে নানামুখী প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্ষা মৌসুম ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে সারা দেশে ৬৯টি বড় পুকুর পুনঃখনেন কাজ করা হচ্ছে।

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, নদীপথে সাশ্রয়ীমূল্যে পণ্য পরিবহনের সুবিধা থাকায় সুপ্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনায় নদীপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে ক্রমাগত পলিজমে নদীগুলোর গভীরতা হ্রাস পাওয়াসহ বেশকিছু কারণে নদীপথ সংকীর্ণ হওয়ার কারণে আমাদের অর্থনীতি সে সুবিধা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নকে বেগবান করতে নদী পথে অভিগম্যতা বাড়তে টেকসই নদী খনন ও ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মত প্রকাশ করেন, ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি জানান, অতীতে বর্ষা মৌসুমে আমাদের নদীপথের দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার বর্গমাইল হলেও, বর্তমানে তা ৬ হাজার বর্গমাইলে নেমে এসেছে এবং শুকনো মৌসুমে এটি ৩ হাজার ৬০০ বর্গমাইলে গিয়ে পৌঁছায়। তিনি বলেন, সরকার দেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথের প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করার কার্যক্রম গ্রহণ করলেও তা থেকে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, নদী খনন প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন, নদীশাসন এবং নদী তীরবর্তী এলাকার ব্যবহার প্রভৃতি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, দেশে একটি টেকসই নদী খনন কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ড্রেজিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিতে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রীম কর হ্রাসকরণ এবং এ ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রমকে সরকারের ফাস্ট-ট্রাকের আওতায় নিয়ে এসে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করার প্রাস্তাব করেন। সেই সঙ্গে এখাতে বেসরকারি খাতের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে আর্থিক প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বারের সভাপতি।

ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। তিনি জানান, ড্রেজিং প্রধানত মেইনটেন্যান্স ও ক্যাপিটাল দুই ধরনের হয়ে থাকে এবং এ ক্ষেত্রে নদীর চ্যানেল ব্যবস্থাপনা ও গভীরতা বৃদ্ধি, বন্দর উন্নয়ন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়গুলো অতীব জরুরি।

তিনি বলেন, টেকসই ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে সবসময়ই অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশকে প্রধান্য দেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। তিনি আরো বলেন, ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে, আমদের অর্থনীতি আরো উপকৃত হবে। বাংলাদেশের নদী ও খালগুলোর ড্রেজিংয়ের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং এজন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা আবশ্যক বলে, তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি আরো বলেন, ড্রেজিং কার্যক্রম সফল করার লক্ষ্যে দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার ব্যবহার এবং ট্রেজিংয়ের কারণে পরিবেশে কি ধরনের প্রভাব পড়বে তা নিরূপণ করার বিষয়ে আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close