আবুল কালাম আজাদের হাসির গল্প
চিরকুমার সংঘ

অবশেষে মাহাবুব ভাই আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিরকুমার সংঘে যোগ দিল।
চিরকুমার সংঘের সভাপতি মিন্নাত আলী মাহাবুব ভাইকে নিতে চেয়েছিলেন না। তিনি বলেছিলেন- দেখো বাবা, তোমার বয়স মাত্র সাতাশ। চিরকুমার সংঘে যোগ দেওয়ার মতো বয়স এটা না। তা ছাড়া, তুমি বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান। তোমার পক্ষে চিরকুমার থাকা খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত। অন্তত চল্লিশ পেরোনোর পর...।
মাহাবুব ভাই বলল- সভাপতি সাহেব, যে সিদ্ধান্ত সাতাশ বছরে নেওয়া যায় না, সেটা সাতচল্লিশ বছরেও নেওয়া যায় না। আমার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। বড়লোকের ছেলে, একমাত্র ছেলে এসব কথা বলে আমাকে ভাঙা যাবে না। জীবন আমার। সিদ্ধান্ত আমার। আমি আমার মতো জীবনকে উদযাপন করতে চাই। আমার ওপর কেউ কিছু চাপাতে পারবেন না। সভাপতি সাহেব, দয়া করে আমাকে ভর্তি ফর্ম দিন। এই নিন ভর্তি ফি এক হাজার পাঁচ টাকা।
মিন্নাত আলী আর কিছু বলার ভাষা পেলেন না। তিনি এক হাজার পাঁচ টাকা নিয়ে মাহাবুব ভাইকে একটা ফর্ম দিয়ে দিলেন। মাহাবুব ভাই মনোযোগ দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করতে লাগলো। মাহাবুব ভাইয়ে সাঙ্গপাঙ্গ আমরা তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে। আমাদের মনে আনন্দ হচ্ছিল যে, মাহাবুব ভাই আজ থেকে মুক্ত। আমাদের নিয়ে ঘুরবেন, আমাদের সাথে আড্ডা দেবেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে বেড়াবেন, কোনো বন্ধন তাকে আটকাবে না। আবার শেফালী আপার কথা ভেবে কষ্টও হচ্ছিল। বেচারী মাহাবুব ভাইয়ের মতো একটা উড়নচণ্ডেকে মন দিয়ে বসে আছে।
আমি বললাম- মাহাবুব ভাই, আপনার আরো একটু ভাবা উচিত। শেফালী আপার কথা ভাবেন। সে মনে ভীষণ চোট...।
মাহাবুব ভাই ধমকে উঠল- রাখ তোর শেফালী আপা! মেয়ে মানুষের ওইসব পুতুপুতু প্রেম আমার খুব দেখা আছে। যখন সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো পাত্র পেয়ে যাবে তখন এই ভাদাইম্যা- ভবঘুরে মাহাবুবের কথা মনেও থাকবে না।
- শেফালী আপা সেরকম না।
- মেয়ে মানুষ সবই এক। সবাই স্বামীকে বন্দী করতে চায় ভালোবাসার মায়াজালে। আমি ভাঙবো তো মচকাবো না। আমি কোনো মায়ার জালে আবদ্ধ হব না। আমি বন্ধনহীন মুক্ত স্বাধীন চিত্তমুক্ত শতদল।
দুই মাসের মধ্যে মাহাবুব ভাই চিরকুমার সংঘের জেনারেল সেক্রেটারি হয়ে গেল। তার উৎসাহ উদ্দীপনা দেখে সবাই উৎসাহিত। পাড়ার দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগালো-
* আমরা বিয়ে করবো না। আমরা শেকলে আবদ্ধ হব না।
* আমরা চিরকুমার। আমরা বন্ধনহীন চিত্তমুক্ত শতদল।
* আমরা কারো মায়ার আঁচলে আটকাবো না। আমরা কাজ করব দেশ ও মানুষের জন্য।
আরো কত রকমের স্লেøাগান! মাহাবুব ভাই চিরকুমার সংঘের সব সদস্যকে নিয়ে কয়েকটা সভাও করে ফেলল। বক্তৃতায় হৃদয় আকুল করা কথা। মাহাবুব ভাইয়ের কাজ ও কথায় আমরা উদ্দীপ্ত। আমরাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে, বিয়ে করব না। শেকলে বাঁধা পড়ব না। কিন্তু...।
কিন্তু তিন মাসের মাথায় মাহাবুব ভাই শেফালী আপাকে নিয়ে পালিয়ে গেল। পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলো। মাহাবুব ভাই সুশিক্ষিত, বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে তা ঠিক, কিন্তু এলাকায় সবাই তাকে চেনে ভাদাইম্যা, ভবঘুরে হিসেবে। শেফালী আপার বাবা মাহাবুব ভাইয়ের নামে নারী অপহরণ মামলা ঠুকে দিল।
পুলিশ মাহাবুব ভাইকে ধরে ফেলল, শেফালী আপাকে দিল তার বাবার হেফাজতে।
মামলা আদালতে উঠল। শেফালী আপা আদালতে দাঁড়িয়ে বলল- আমি মাহাবুবকে ভালোবাসি, মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আমার জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পাই না। সে আমাকে অপহরণ করেনি। আমি তার সাথে চলে গিয়েছি, কারণ আমার বাবা আমাকে তার সাথে বিয়ে দিতে চায় না। আমরা দু’জন প্রাপ্ত বয়স্ক। আমরা সজ্ঞানে পরস্পরকে বিয়ে করেছি। আমরা এক সঙ্গে সংসার সাজাতে চাই।
এরপর মামলা আর টেকে না। মাহাবুব ভাই শেফালী আপাকে নিয়ে সংসার সাজায়। আমাদেরও মন ফেরে। আহ ভালোবাসা! এর চেয়ে মধুর আর কিছুই নেই পৃথিবীতে।
মাহাবুব ভাইয়ের বিয়ে করায় ফেঁসে গেলাম আমরা। আমরা শপথ নিয়েছিলাম যে, আমরাও চিরকুমার থাকব। আমাদের শপথ ভাঙতে হবে। শপথ ভাঙা বড় কথা না। রবি ঠাকুর বলেছেন- মানুষ শপথ করে শপথ ভেঙে হাফ ছেড়ে বাঁচার জন্য। আসল কথা হল, মাহাবুব ভাই পালিয়ে বিয়ে করার কারণে আমরা বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত আনন্দ-ভোজ থেকে বঞ্চিত হলাম। মাহাবুব ভাইয়ের বাবা কি বিশাল আয়োজন করতেন তা বলাই বাহুল্য। আর সে আয়োজনের আগে-পিছে সব জায়গায় থাকতাম আমরা। আমাদের মুখের কাছ থেকে সুখাদ্যসব কেড়ে নেওয়া হল। আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারি না।
আমরা ব্যানার-ফেস্টুনসহ মিছিল বের করলাম। ব্যানার ফেস্টুনে লিখলাম-দাওয়াত ছাড়া বিয়ে কেন, মাহাবুব ভাই জবাব চাই।
পাড়ার মানুষ মহাকৌতুহলে আমাদের মিছিল দেখতে লাগল। দুইজন/চারজন করে করে অনেক মানুষ হল আমাদের মিছিলে। সবার বয়স আমাদের মতোই। মিছিল গিয়ে থামল মাহাবুব ভাইদের বাড়ির গেটে।
দেখি দোতালার বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে মাহাবুব ভাই আর শেফালী আপা। এখন আর আপা না, এখন শেফালী ভাবী। কি যে সুন্দর লাগছিল ওদের!
তার তিন মাস পর সেই চিরকুমার সংঘ বন্ধ হয়ে গেল। সেই মাঝবয়সীদের কেউ কেউ বিয়ে করেছেন, কেউ কেউ বিয়ের পাত্রী খুঁজছেন।
"









































