মমিনুল ইসলাম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)

  ২ ঘণ্টা আগে

ময়মনসিংহের ত্রিশাল : ভাঙা বেইলিতে আতঙ্ক, অসমাপ্ত সেতুতে ভরসা মই

দুই উপজেলার লাখো মানুষের ভোগান্তি

ভাঙাচোরা বেইলি ব্রিজের ক্ষত ঢাকতে বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তার তালি। আর নির্মাণাধীন নতুন সেতু পার হতে ভরসা কাঠের তৈরি অস্থায়ী মই। এমন ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায় প্রতিদিন চলাচল করছেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার লাখো মানুষ। জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ। ফলে দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছেই।

সরেজমিনে ত্রিশালের পোড়াবাড়ী বাজার এলাকায় খিরু নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো বেইলি ব্রিজ ঘুরে দেখা যায়, ব্রিজটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সরে গেছে পাটাতন। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয়রা ভাঙা অংশে বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা বসিয়েছেন। পুরো ব্রিজে শতাধিক বস্তা দিয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হলেও দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই গেছে। অনেক পথচারী ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ এড়িয়ে পাশের নির্মাণাধীন নতুন সেতুর একপাশে কাঠের তৈরি অস্থায়ী মই বেয়ে পারাপার করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বয়স্ক মানুষ।

স্থানীয়রা জানান, খিরু নদীর এক পাশে ত্রিশাল উপজেলা এবং অন্য পাশে ফুলবাড়িয়া উপজেলা। দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ১৯৮০-এর দশকে নদীর ওপর নির্মিত হয় বেইলি ব্রিজটি। দীর্ঘ ব্যবহারে এটি এখন অত্যন্ত নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় ২০২২ সালে পুরোনো বেইলি ব্রিজের পাশেই নতুন একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রায় দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম মিয়া বলেন, ‘এই ব্রিজডা দুই উপজেলার লাখ লাখ মাইনষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। শতাধিক ভাঙা-চোরা জায়গায় প্লাস্টিকের বালির বস্তা দিয়া তালি দিয়া মানুষ চলাফেরা করতাছে। দুর্ঘটনার ডরে অনেক মানুষ পাশের অসমাপ্ত নতুন সেতুর গায়ে কাঠের মই লাগাইয়া পারাপার করতাছে। দ্রুত নতুন সেতুর কাম শেষ কইরা চালু না করলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিপু দাশ বলেন, বেইলি সেতুতে উঠতে ভয় হয়। মনে হয় এই বুঝি পাটাতনসহ নিচে পড়ে যাব। তবু আতঙ্ক নিয়ে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।

স্থানীয় রুবায়েত হোসেন বলেন, ‘ত্রিশাল পৌর শহরে যাতায়াতের জন্য এই বেইলি ব্রিজটিই আমাদের একমাত্র ভরসা। বিকল্প পথে গেলে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও টাকা দুইটাই বেশি লাগে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতা দূর কইরা নতুন সেতুটা দ্রুত চালু করা দরকার।’

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যরে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজটি পায় এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালের আগস্টে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। জমির মালিক ও ওয়ারিশ মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ২২ জন রয়েছেন।

জমির মালিকদের একজন বাসন্তী রানী চৌধুরী বলেন, জমি অধিগ্রহণে আমার তিন শতকের ভিটে পড়েছে। অধিগ্রহণের টাকা পাইনি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জমির দখল ছাড়া হবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন বলেন, প্রায় ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে অতিদ্রুতই কাজ শেষ করা যাবে।

এ বিষয়ে এলজিইডির ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ করার কথা থাকলেও জমির মালিকদের বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারা অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত শুধু তাদের জমির অংশেই নয়, প্রকল্পের অন্যান্য অংশেও কাজ করতে দিচ্ছেন না। ওই অংশের কাজ সম্পন্ন করা গেলে সেতুটি মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হতো। জমি, স্থাপনা ও গাছপালার মূল্য নির্ধারণ করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং অবশিষ্ট কাজ শেষ করে নতুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়