মুহা. ইসমাইল হোসাইন খান, মনোহরদী (নরসিংদী)

  ১৪ অক্টোবর, ২০২১

গ্রাহকের অর্ধশত কোটি টাকা নিয়ে উধাও

নরসিংদীর মনোহরদীতে শাহ সুলতান সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি নামে বেসরকারি একটি এনজিও গ্রাহকদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। লোভনীয় মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এনজিওটি। এতে নিঃস্ব শতশত মানুষ। গত মঙ্গলবার সকালে আমানতকারী গ্রাহকরা আমানত ফেরত নিতে গিয়ে এনজিওটির কার্যালয় তালাবন্ধ দেখেন। এ সময় হতাশায় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী গ্রাহকরা কার্যালয়ের সামনেই অবস্থান নেন। ভুয়া এনজিওর খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন প্রায় ৫০০ অসহায় মানুষ।

মনতলা ফাযিল মাদরাসার সহকারী মৌলভী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যক্তি নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া-সংগীতা রোডে গাজী মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা দেখিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। ২০ সদস্যের কমিটির এই সমিতির সহসভাপতি পশ্চিম বীরগাঁও বালিকা দাখিল মাদরাসার সুপার হাবিবুর রহমান পাঠান, সাধারণ সম্পাদক মনতলা ফাযিল মাদরাসা সহকারী মৌলভী মো. মফিজ উদ্দিন। ওই মাদরাসার ইবতেদায়ী মৌলভী মুজিবুর রহমান ছিলেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য। তাদেরকে সহযোগীতা করেছেন মনতলা আশরাফিয়া বালিকা দাখিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক মাওলানা মুজিবুর রহমান, চরসাগরদী আলিম মাদরাসার শিক্ষক উসমান গণি, পাড়াতলা গ্রামের হাদিউল ইসলাম। সমিতির কার্যালয় তালাবদ্ধ করার পর আবুল কালাম আজাদ, মো. মফিজ উদ্দিন এবং মুজিবুর রহমান সাহীকে সাময়িক বরখাস্ত, বেতন স্থগিত এবং চাকুরিচ্যুত কেন করা হবে না এই মর্মে কারণ দর্শনোর নোটিশ দিয়েছে মনতলা ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ।

জানা যায়, শাহ সুলতান সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি নামে ২০১৩ সালে সালে জেলা সমবায় কার্যালয় থেকে (০০০৪০) রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর বাজার এলাকায় ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম শুরু করে। এনজিওটি ইতিমধ্যে খিদিরপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। তারা মাঠ কর্মীর মাধ্যমে ১ লাখ টাকার ডিপিএস করলে প্রতিমাসে এক হাজার ৪০০ টাকা লাভ দেওয়ার কথা বলে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রকল্পে সঞ্চয় স্কীমের নাম করে বিপুল পরিমাণ জামানত আদায় করা হয়। এ হিসেবে ওই কার্যালয়ের কয়েকশ গ্রাহক থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা সংগ্রহ করে সমিতিটি।

কাজিরচর গ্রামের দিনমজুর ফালু বলেন, সমিতির সভাপতি মাওলানা আবুল কালামকে বিশ্বাস করে তার এনজিওতে জমি বিক্রির চার লাখ টাকা আমানত রেখেছিলাম। এই টাকা না পেলে ভিক্ষা করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।

খিদিরপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের হাজেরা বেগম জানান, প্রবাসী স্বামীর কষ্টার্জিত সব আয়, মা, বোন এবং ভাগিনার কাছে ১৯ লাখ টাকা এনে সমিতিতে জমা রাখি। এই টাকা না পেলে স্বামীর সংসার ছাড়তে হবে। বাবার বাড়ীতেও জায়গা হবে না।

কালিরচর গ্রামের তারা মিয়া বলেন, নিজের সাত লাখ, ভাগিনার সাত লাখ, বোন ভগ্নীপতির ১২ লাখ, চাচীর চার লাখ এবং মামা-মামীর তিন লাখসহ সর্বমোট ৩০ লাখ টাকা এনজিওতে রাখি। কিন্তু সেই টাকা নিয়ে কর্মকর্তারা পালিয়েছে। এখন ভাই বোনেরা আমার উপর রাগ করে কথা বলেন না। টাকা না পেলে বোনের শ্বশুর বাড়িতে সমস্যা হতে পারে। আমি এখন কী করি? বেশি লাভের প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা।

এ ছাড়াও রামপুর গ্রামের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার তপন কুমার বণিক ও তার পরিবারের এক কোটি পাঁচ লাখ, চরমান্দালিয়া গ্রামের কানন মিয়া ও তার প্রবাসী শ^শুর এবং ফুফার ৩৮ লাখ টাকা, রামপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ৩০ লাখ, নয়াপড়া গ্রামের নিপা বেগমের ১০ লাখ, কালিরচরের জনি আক্তারের সাড়ে ৬ লাখ, একই গ্রামের কাউসার মিয়ার ৫ লাখ টাকা, পশ্চিম চরমান্দালিয়া গ্রামের আব্দুস সালামের ৮ লাখ, সুবর্না আক্তারের ৬ লাখ টাকা, আব্দুল কাদিরের ২ লাখ, সোহেল মিয়ার সাড়ে ৪ লাখ, সাবিনা আক্তারের সাড়ে ৪ লাখ, ঝরনা বেগমের ২ লাখ টাকা আমানত রেখেছেন। এমন ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান গ্রাহকরা।

এ বিষয়ে কথা বলতে আবুল কালাম আজাদের বাড়ীতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার মেয়ে নাইমা জানিয়েছেন তার বাবা পলাতক নয়। জরুরী কাজে নরসিংদী গেছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক জানান, শাহ সুলতান সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির তালাবদ্ধ করে কর্মকর্তারা পালিয়ে গেছেন বলে জানতে পেরেছি। আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এস এম কাসেম বলেন, ‘বিষয়টি খিদিরপুর ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে সমিতি পরিদর্শন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close