বেড়ায় মৃৎশিল্পীদের দুর্দিন

অ্যালুমিনিয়াম ও ননস্টিক বাসনপত্রে ঝুঁকছে মানুষ

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

আরিফ খান, বেড়া (পাবনা)

পাবনায় মাটির বাসনপত্রের জন্য সুপরিচিত বেড়া উপজেলার মৃৎশিল্পীরা এখন আছেন দুর্দিনে। একসময় এখানে মাটির তৈরি বাসনপত্রের কদর ছিল অনেক। এখন প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে মাটির বাসনপত্রের ব্যবহার, সেইসঙ্গে কমেছে মৃৎশিল্পীদের কাজের পরিধি। এতে উপজেলার নিভৃত পল্লীতে কয়েক যুগের স্মৃতি বহনকারী কুমোরপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পীরা পূর্বপুরুষদের পেশা বদলাতে চাচ্ছেন।

প্রান্তিক অনেক পেশার মতো এ গ্রামের কুমাররাও এত দিন টিকে ছিলেন নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। কিন্তু এঁটেল মাটির অভাব, পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা ও ব্যাংক ঋণ পাওয়ায় সংকট অনেক দিন থেকেই ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় পেশা ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে কুমারদের।

উপজেলার মালদাহপাড়া, পেঁচাকোলা গ্রামে অবস্থিত কুমারপাড়া। সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা গ্রামগুলো। এই কুমারপল্লীর শোভা বর্ধন করে নিপুণ হাতে মাটির কলস, চাড়ি, হাড়ি, পাতিল, খুঁটি, দোয়ার, ধুপাতি ও বৈচিত্র্যময় খেলনাসহ নানা সামগ্রী তৈরি করেতেন পাল পরিবারগুলো। কিন্তু এখন তা নেই। পাল বাড়ি ঘুরে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি বাড়িতে তৈরি হচ্ছে ছোট বড় দইয়ের ঘুটি, গুরের হাঁড়ি, ছোট আকারের প্রতীমা, মুড়ি ভাজার ঝাঁঝড়-ছাবনা, পিঠা তৈরির সাঁজসহ আরো কয়েকটি পদ। এগুলো মাটির তৈরি না হলে মানুষের ব্যবহারে অনুপযোগী হতো।

মৃৎশিল্পীরা জানান, কুমাররা নিজেদের তৈরি বৈচিত্র্যময় বাসনপত্র এখনো বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করে। কিন্তু মাটির সামগ্রীর পরিবর্তে প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তাদের জিনিসের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। তাই এখন কুমারপাড়া গ্রামে মাত্র ১০-১২টি পাল পরিবার টেনেটুনে তাদের পৈত্রিক পেশা ধরে রেখেছেন।

হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের মালদাপাড়া গ্রামের মেনে বালা পাল (৫৫)। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি জানান, আগের মতো মাটির তৈরি জিনিসের আর কদর নেই। তা ছাড়া এঁটেল মাটি ও মাটির বাসন তৈরির অন্য সামগ্রীও আগের মতো সহজে পাওয়া যায় না। তাই এ পেশায় এখন আর স্বাবলম্বী হওয়া তো দূরের কথা, দুই বেলা দুমুঠো খাবার জোটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই এলাকার বিপেন পাল বলেন, এ শিল্পকে ধরে রাখার জন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় এঁটেল মাটি, মাটি পোড়ানোর জন্য চিটাধান এবং অন্যান্য সামগ্রীর মজুদ রাখতে হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি আমাদের নেই। বাধ্য হয়ে পেশা বদলাতে হচ্ছে।

একই কথা বলেন অবিনাশ পাল ও লালু পাল। এই মৃৎশিল্পীরা বলেন, হাজার বছরের ঐতিহ্য পাল বংশের রক্ষায় কেউ এখন এগিয়ে আসছে না। আমরা কি দিয়ে এই ঐতিহ্য রক্ষা করব? পাল সম্প্রদায়টিতে আগের চেয়ে শিক্ষার হার কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু তাতে তাদের বড় বাধা জীবন-জীবিকা। কারণ পালদের কাজে বউ ঝিরাসহ বাড়ির ছোট ছেলে-মেয়েরা সহযোগিতা করে।

এলাকার বয়োজেষ্ঠ্যরা মনে করেন, গ্রামীণ ঐতিহ্যর ধারক ও বাহকদের এই মৃত্তিকা শিল্পীকে ধরে রাখার জন্য সরকার এবং এনজিওসহ সংশ্লিষ্টদের এখনি এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে বাজার ঘুরে দেখা গেছে মাটির জিনিসপত্রের পরিবর্তে ননস্টিক হাড়ি, ফ্রাইপেন, কড়াই এবং অ্যালুমিনিয়ামের বাসনপত্র ব্যবহার করছেন। শরীরের জন্য এগুলোতে ব্যবহার মারাত্মক ক্ষতিকর জেনেও কমছে না এর ব্যবহার। বিশেষজ্ঞদের মতে, ননস্টিক পাত্রে রান্না করলে ক্যানসার, থাইরয়েড রোগ হতে পারে এবং অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করলে এলজিমা ও স্মৃতিবিভ্রাট রোগও হতে পারে।

সম্প্রতি ইন্ডিপেন্ডেন টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন বলেন, অ্যালুমিনিয়ামের জিনিস যেসব যন্ত্রাংশ গলিয়ে তৈরি করা হয়, তাতে লেড নামক পদার্থ থাকে যা শিশুদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্টে ক্ষতি করে। দীর্ঘ মেয়াদে এই বাসনে খেলে কিডনিসহ নানা সমস্যা হতে পারে।

ননস্টিক পণ্যে পালিমারের আস্তরণ থাকে। রান্নার সময় সেখান থেকে এক ডজনের অধিক ক্ষতিকর গ্যাস বেরিয়ে আসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ণ ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নূরনবী বলেন, গ্যাসে ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রান্নার সময় ননস্টিক পাত্রে থাকা গ্রিসে ভাঙতে থাকে।

বিভিন্ন স্টাডিতে দেখে গেছে, এই গ্রিসে ভেঙে গ্যাস বের হয়ে আসে যার কিছু কিছু কারসিনজিক। এই কারসিনজি শরীরে ক্যানসার উৎপাদন করতে পারে। এর প্রতিকার হিসেবে মাটির বাসনপত্র ব্যবহারের পক্ষে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

 

"