বদরুল আলম মজুমদার

  ৪ ঘণ্টা আগে

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে মুখোমুখি সরকার ও বিরোধী দল

বাংলাদেশ তথা এশিয়ার বৃহৎ ইসলামী ভাবধারার ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক নিয়ে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হতে পারে। বহুল আলোচিত এ ব্যাংকটির মালিকানায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পুরোনো। গত মঙ্গলবার সংসদে আনীত একটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধীপক্ষের নেতারা তুমুল বির্তকে জড়িয়ে পড়েন। বিরোধী নেতারা বিষয়টি নিয়ে রাজপথে গ্রাহক ব্যানারে নানা আন্দোলনের প্রচ্ছন্ন হুমকিও প্রদান করেছেন। একইসঙ্গে ব্যাংকটি ধ্বংসের হোতা খ্যাত এস আলম গ্রুপের হাতে ব্যাংকটি যেতে না দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী ব্যাংক খাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা চলমান রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। তারই অংশ হিসেবে ব্যাংকটিতে নতুন একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগটি নিয়েই মূলত সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছে।

গত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বির্তকিত এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির ৮২ শতাংশ মালিকানা কেড়ে নেয়। কেড়ে নেওয়া ব্যাংকটি থেকে ঋন নিয়ে মালিকানা জোর করে কেনা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ফ্যাসিবাদ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটিতে জামায়াত সংশ্লিষ্টরা ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয়। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মাথায় ব্যাংকটিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এস আলমের হাতে ব্যাংকটি পিরিয়ে দেওয়া পক্রিয়া তারা শুরু করেছেন। এতেই ক্ষেপেছেন জামায়াত-সংশ্লিষ্টরা। তারা গত দুই সপ্তাহ থেকে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল এবং এস আলম গ্রুপের হাত থেকে ইসলামী ব্যাংককে মুক্ত করার আন্দোলন করছেন।

জামায়াত নেতারা বলছেন, সরকার এস আলম গ্রুপের সঙ্গে কোনো এক আঁতাতের কারণে এশিয়ার বৃহৎ এ ব্যাংকটি ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। এটি তারা হতে দেবেন না। দলটির এক নেতা বলেন, অন্য অনেক ইস্যুতে সরকারকে ছাড় দেওয়া হলেও ইসলামী ব্যাংক দখলের ইস্যুটি জামায়াত বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না। তারা এ ইস্যুতে গ্রাহক ব্যানারে সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। অনেকে এটিকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে নামার টেস্টকেস হিসেবে বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে লেখালেখি করছেন। এর প্রতিফলন দেখা যায় রাজপথে টানা দশম দিনের মতো গতকালও অর্ধমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়ার নামে বড় একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন গ্রাহক ব্যানারে। সেটিতে হাজার লোকের অংশগ্রহণও দেখা গেছে।

মূলত ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এই প্রথম ব্যাংক খাতের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় সরকার ও বিরোধী দলের

শীর্ষনেতারা এত দীর্ঘ বিতর্কে জড়ালেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে জোরজবরদস্তি করে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের যে শেয়ার ডাকাতি করেছিল, তা প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে না দিয়ে বর্তমান সরকার উল্টো এস আলমের দোসর ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসাচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ব্যাংকটিকে গতিশীল করতে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মালিকদের হাতে শেয়ার ফিরিয়ে দিতেই এ অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক এবং দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক হয়রানি ও অপপ্রচারের মধ্যেও ২০১৬ সালে ব্যাংকটি ৪৪৭ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করেছিল এবং সে সময় খেলাপি বিনিয়োগের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ব্যাংক লুটপাট করে, যার ফলে ব্যাংক ও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে চরম অব্যবস্থা চলছে। ৮৯ কোটি টাকার একজন ঋণখেলাপি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন। অন্যদিকে গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আমানতকারীরা।

তিনি বলেন, এদেশে রিজার্ভ চুরির মতো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ডিজিএফআইর নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। এস আলম গ্রুপের কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বলা হয়, ইসলামী ব্যাংককে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। এটি কেন বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাংক হবে? আবদুল আউয়াল মিন্টু একটি ব্যাংকের কর্ণধার, আমরা কি সেটাকে বিএনপির ব্যাংক বলব? মির্জা আব্বাস ঢাকা ব্যাংকের ডিরেক্টর, সেটা কি বিএনপির ব্যাংক? কিংবা প্রয়াত আবদুল জলিল যে ব্যাংকের ডিরেক্টর ছিলেন, সেটাকে কি আমরা আওয়ামী লীগের ব্যাংক বলব?

বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জোরপূর্বক দখল করা শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দিয়ে সৎ লোকদের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিচালনা করা না হলে ৩ কোটি গ্রাহক রাস্তায় নামবে এবং দেশে বড় ধরনের গণআন্দোলন তৈরি হবে। বর্তমান চেয়ারম্যানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি একজন পরীক্ষিত দুর্নীতিবাজ এবং অর্থ আত্মসাৎকারী। এরা এস আলমের মতোই জনগণের বাকি টাকা লুট করে নিয়ে যাবে। এ কারণেই গ্রাহকের মধ্যে বিরাট আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল কিংবা চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অপসারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তার পূর্ণ রেগুলেটরি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ইবনে সিনার মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার ব্লক মার্কেটে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করার রেকর্ড রয়েছে। বর্তমানে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপের কাছে ব্যাংকের প্রায় ৮১ থেকে ৯২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। কোন শেয়ারহোল্ডার কীভাবে এই শেয়ার কিনেছেন, তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা আইনি তদন্তের ওপর জোর দেন তিনি। ব্যাংক কোম্পানি আইনের সেকশন ৪৫, ৪৬, ৪৭ এবং ৫৭ (এ)-এর কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, জনস্বার্থে মুদ্রানীতি ও ব্যাংক নীতি রক্ষার্থে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণকারী যেকোনো কার্যক্রম প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ বা তদন্ত প্রমাণ হয়নি, নতুন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তা তদন্ত করা হবে।

তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহককে উসকানি দিয়ে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ-সংক্রান্ত অডিও ও ভিডিও ফুটেজসহ সব প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলাম নাকি ব্যাংকের মালিক না। আবার তারা বলছে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের ওপর হাত দেবেন না দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।

প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টা জবাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংকটির শেয়ার ডাকাতি করা হয়েছিল, অবিলম্বে তাদের কাছে সেই শেয়ার ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কীভাবে তারা শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন সেটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা তো আগেই এক্সপোজড, সারা দুনিয়া জানে। এ ব্যাংক থেকে এস আলম তার নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা নিয়েছেন। আর সমুদয় যে শেয়ার তিনি কিনেছেন, যার মাধ্যমে তিনি ৮২ শতাংশের মালিক হয়েছেন, সেগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিনি শুধু কইয়ের তেল দিয়ে কই ভাজেননি, শোল মাছও ভেজেছেন।

ব্যাংকটিতে অবৈধ নিয়োগ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘১০ হাজার কর্মচারীকে সামান্য কোনো নিয়মনীতি না মেনে ফ্যাসিস্ট আমলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের ফের পরীক্ষায় বসার জন্য ডাকা হলেও তারা কেউ আসেনি।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তোলা এক অভিযোগের জবাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ৭০০ কোটি টাকার লোন কোনো একটি দলের নির্বাচনী ফান্ডে যাওয়ার কথা বলেছেন। উনি যদি এর দ্বারা জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়ে থাকেন, তবে আমি চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি। এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি মেডেল দেব।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়