মেহেদী হাসান
কৃষি খাতে দরকার বিশেষ নজর

খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কৃষি বাজেটের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। ফসল উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাত উদ্ভাবন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, সেচ এলাকার উন্নয়ন এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মতো কার্যক্রম হাতে নিতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ কৃষি অর্থনীতিবিদদের। জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দের পরিমাণ টাকার অঙ্কে কিছুটা বাড়ছে, তবে মোট বাজেটে শতাংশ হিসেবে কমছে। এমনকি টাকার হিসেবেও দুই বছর আগের তুলনায় কৃষিতে বরাদ্দ বড় অঙ্কে কমে যাচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানো উচিত ছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে বরাদ্দ কমার প্রবণতা উদ্বেগজনক। কারণ সম্প্রতি কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং চাল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে উৎপাদন বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃষি। তাই শুধু টাকার অঙ্কে নয়, মোট বাজেটের অনুপাতে কৃষি খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর দিকে সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি খাতের স্থবিরতা আরো প্রকট হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ে জন্য ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। এতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয় বা বিভাগের তালিকায় ৮ নম্বরে থাকছে কৃষি মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ছে ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। তবে বাজেটের মোট আকারের শতাংশের হিসেবে চলতি বছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমছে। চলতি বছরের মোট বাজেটের ৩.৪৫ শতাংশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়াবে ৩.০৭ শতাংশ। অর্থাৎ বাজেটের আকার হিসাবে আগামী অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কমছে ০.৩৮ শতাংশ। বিগত বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত প্রবৃদ্ধির হার ৬.৫৫ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ২.৪২ শতাংশে অবস্থান করছে। সার্বিক কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩.৩ শতাংশ। এ হার ২০০৯-১০ অর্থবছরে অর্জিত ৬.৫৫ শতাংশের অর্ধেক মাত্র। ২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪.৮৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সে তুলনায় কৃষি বাজেট বাড়েনি। এ সময় কৃষি বাজেট বেড়েছে ৩.৬৯ গুণ। ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট বাজেটে কৃষি বাজেটের হিস্যা ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা নেমে আসে ৫.৮৬ শতাংশে। একইভাবে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা নেমে আসে ৬.৪ শতাংশ থেকে ২.১৮ শতাংশে। অর্থাৎ যে হারে মোট বাজেট বেড়েছে, সে হারে কৃষি বাজেট ও ভর্তুকি বাড়েনি।
চলতি অর্থবছরে ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২.৩৭ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল; যা খুবই কম। ফসল কৃষি খাতের বরাদ্দে আগের বছরের সংশোধিত বরাদ্দ থেকে ১৮.২১ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা কমিয়ে রাখা হয় ১৭ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে কৃষি খাতের হিস্যা বাড়ানো উচিত। বৃহত্তর কৃষি খাতে মোট বাজেটের ন্যূনপক্ষে ১০ শতাংশ এবং ভর্তুকিতে মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো সাজানো হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হতে পারে। এ বাজেটে যে ১০টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তার তালিকায় রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং টাকার অঙ্কে বরাদ্দের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। তবে কৃষি খাতে প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। চলতি বছরের মতো আগামী অর্থবছরেও কৃষি খাতের জন্য প্রণোদনা রাখা হচ্ছে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বড় অঙ্কে কমে যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৩৩ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে কৃষি মন্ত্রণালয়ে টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কমছে ৪ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেটের ৫.৭ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে এ বরাদ্দ সংশোধন করে ৫৬ হাজার ২ কোটি টাকায় বৃদ্ধি করা হয়, যা সংশোধিত মোট বাজেটের ৭.৮ শতাংশ।
বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরে কৃষি খাতের বরাদ্দ টাকার অঙ্কে কিছুটা বেড়েছে বটে, তবে মোট বাজেটের তুলনায় এর অংশীদারত্ব কমে গেছে। মূল সমস্যা হলো জাতীয় বাজেট যে হারে বাড়ছে, কৃষি খাতের বরাদ্দ সে হারে বাড়ছে না। ফলে নামমাত্র অর্থে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও আপেক্ষিক অর্থে কৃষি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে কৃষি খাতে মোট বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। একইভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের অংশও ধারাবাহিকভাবে কমছে। মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে কৃষি খাতের প্রকৃত বরাদ্দ আরো সংকুচিত হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে তার ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। অর্থাৎ প্রকৃত অর্থে কৃষি বাজেট কমছে।
তিনি বলেন, এমন সময়ে কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কারণ খাতটির প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪২ শতাংশ, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় অনেক কম। কৃষি উৎপাদন পর্যাপ্ত হারে না বাড়লে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে এবং নিম্নআয়ের মানুষের ওপর দারিদ্র্যের চাপ আরো বৃদ্ধি পাবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষি খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এজন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত।
একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে কৃষি খাতের জন্য কীটনাশকের প্রস্তুত পণ্য আমদানিতে মূসক না থাকলেও কাঁচামাল আমদানিতে মূসক দিতে হয় বলে অভিযোগ করে বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেন, প্রস্তুত পণ্যে ৮ শতাংশ শুল্ক থাকলেও কাঁচামাল আমদানিতে দিতে হয় ৫৮ শতাংশ। তাই কাঁচামাল আমদানিকারকদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয় এবং অনেক পণ্য দেশে উৎপাদন করা যায় না। কাঁচামালে শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে দেশেই ৯০ শতাংশ কীটনাশক উৎপাদন সম্ভব।
চলতি বছরের এপ্রিলে কৃষি খাতের ১০টি সংগঠনের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রাক-বাজেট আলোচনায় নানা বিষয় উঠে আসে। ফল আমদানিতে বেশি শুল্ক থাকায় ব্যবসা কমছে বলে জানায় বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, চোরাচালানের মাধ্যমে অনেক ফল দেশে আসছে। কারণ শুল্কহার ২৫ শতাংশ, আরডি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কহার ২০ শতাংশ। মূসক ১৫ শতাংশ। শুল্ক-কর অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ফল কিনতে পারছে না। ফলকে বিলাসপণ্য বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন করপোরেট করহার কমানোর দাবি জানায়। সংগঠনটির সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার দাবি জানান। এছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন তিনি।
সংগঠনটির মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, খামারিদের বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হচ্ছে। ৭০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে খাদ্যে। তাই লাভ না পেয়ে খামারিরা ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলে সেই জায়গা দখলে নেবে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের মহাসচিব মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘ফিড তৈরিতে আমাদের ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। তাই আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক।’
সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ইহতেশাম বি শাহজাহান বলেন, ‘কম করে হলেও আমাদের ১ হাজার কোটি টাকার অগ্রিম আয়কর এনবিআরে পড়ে আছে।’ তারা ন্যায্যতার ভিত্তিতে কর দিতে চান বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৃষি যন্ত্রপাতিতে মূসক অব্যাহতির দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির সভাপতি আলীমুল এহসান চৌধুরী বলেন, অনেক নতুন কৃষিযন্ত্র এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। নতুন নতুন বিনিয়োগ আসছে। কিন্তু তালিকায় এসব যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত না থাকায় মূসক ছাড় পাওয়া যাচ্ছে না।
"









































