নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৭ আগস্ট, ২০২৪

শিবলীর আর্থিক কেলেঙ্কারির নেপথ্যে মাহমুদুল

আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জকে (বিএসইসি) দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। গত ১৫ বছরে দেশের পুঁজিবাজার থেকে জাল-জালিয়াতি, কারসাজি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহার, মানি লন্ডারিং ও অর্থ পাচারের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। তার আর্থিক কেলেঙ্কারির নেপথ্য ভূমিকায় ছিলেন কমিশন সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহমুদুল হক। যিনি নিয়ম ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। আর তার নিয়োগ অবৈধভাবে হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগে বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করে বিদ্রোহ করাচ্ছেন।

কমিশন সূত্র বলছে, মাহমুদুল হক এখন কমিশন সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পালন ছাড়াও মার্কেট ইন্টেলিজেন্স, ইন্সপেকশন, এনকোয়ারি অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টে ও জনসংযোগ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম তার সময়কালে সরকারের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে মাহমুদুল হককে পদোন্নতি দিয়েছেন ও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে বসিয়েছেন। শিবলী রুবাইয়াতের বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুবিধার্থে মাহমুদুল হককে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগের কমিশনের বিরুদ্ধে যাতে কোনো তদন্ত না হয় কিংবা তিনি যেন দায়িত্ব পালন করতে পারনে, সেজন্য তার সুবিধামতো লোক নিয়োগে চেষ্টা করছেন। এজন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কমিশনে কর্মকর্তাদের নিয়ে বিদ্রোহ করেছেন। এছাড়া এ বিদ্রোহে যারা আসতে চাননি, তাদের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এমন অনেক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেছেন। কথিত আছে, মাহমুদুল হক ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের আর্থিক খাতে দুর্নীতি করানোর ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়তাকারী। ফলে তিনি চাচ্ছেন শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম ও সালমান এফ রহমানের অনুসারীরা এখানে চেয়ারম্যান হয়ে আসুক।

জানা গেছে, ২০১২ সালে থেকে মাহমদুল হক আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিএসইসির ছুটি এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়াই কানাডায় চলে যান। পরবর্তী সময়ে কমিশন তাকে ২০১৪ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। দীর্ঘদিন পর কানাডা থেকে দেশে ফিরে আবারও ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। কমিশন এ আবেদন বিবেচনায় এনে শর্তসাপেক্ষে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে। কিন্তু চাকরিতে পুনর্বহালের পর অধিকাংশ শর্তই পূরণ করেননি তিনি।

শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর আরো প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন মাহমুদুল হক। চাকরি বিধিমালা অনুসারে কমিশন সচিব পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। কিন্তু ওই তফসিল লঙ্ঘন করে ২০২২ সালের ৯ নভেম্বর অফিস আদেশের মাধ্যমে মাহমুদুল হককে কমিশন সচিবালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শিবলী কমিশন সভার সিদ্ধান্তগুলো (এজেন্ডা, তারিখ) অন্যান্য কমিশনারকে না জানিয়েই নিজের মতো করে পরিবর্তন করে ফাইলে অন্তর্ভুক্ত করতেন।

শিবলী কমিশনের কুকর্মের পুরস্কার হিসেবে মাহমুদুল হককে ক্ষমতাধর ডিপার্টমেন্ট ইনকোয়ারি এবং ইনভেস্টিগেশনের পরিচালক হিসেবে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শিবলী রুবাইয়াতকে কোনো কোম্পানি অনৈতিক সুবিধা না দিলে সেসব কোম্পানিকে হয়রানির জন্য বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেন। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এনকোয়ারির নামে বিভিন্ন ব্রোকার হাউসকে হয়রানি করা। এক্ষেত্রে মাহমুদুল হক শিবলী রুবাইয়াতের অনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করে এসেছে। পদোন্নতি পদায়নসহ অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।

উচ্চমহলে যোগাযোগ থাকার কারণে তিনি কমিশনের অভ্যন্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, ফলে তার প্রতি অনেকেরই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অপসারণ না করে বিএসইসির সংস্কার করা হলে পুঁজিবাজারে এর কোনো সুফল আসবে না। তাই এসব কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে মাহমুদুল হকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। খুদেবার্তা ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও উত্তর মেলেনি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়