আরমান ভূঁইয়া

  ১৩ অক্টোবর, ২০২১

নিউমার্কেট ফুটপাত

প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায়

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে একটি চক্র। সংঘবদ্ধ এ চক্রের পেছনে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি চললেও নীরব প্রশাসন।

সরেজমিনে ঘুরে হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম ওরফে ইবুর নেতৃত্বে পুরো নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতে বসা ব্যবসায়ীদের থেকে ১১ ভাগে চাঁদা আদায় করছেন লাইনম্যানরা (চাঁদা আদায়কারী)। দোকান ভেদে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। স্থায়ী-অস্থায়ী প্রায় ৪ হাজার হকার রয়েছেন এ এলাকায়। প্রতিদিন ১০ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয় এসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে।

আরো জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পুরো নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করে ইবুর চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। তার প্রধান সহযোগী সাত্তার মোল্লা, নুর ইসলাম, সিরাজ ও বড় জাহাঙ্গীর। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তুলতে জোনভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া আছে লাইনম্যানদের। টাকা আদায়ে এসব লাইনম্যানেরও রয়েছে সহযোগী। এর মধ্যে নীলক্ষেত বইপট্টি এলাকা থেকে চাঁদা তোলেন শাহিন ও তার সহযোগী শহিদ চাচা। বলাকা সিনেমা হলের সামনে (বলাকা সিনেমা হল থেকে রাফিন প্লাজা) লাইনম্যান সেলিম ও আরিফ। তাদের সহযোগী লাইনম্যান হকার বসির।

চাঁদাবাজি সম্পর্কে জানতে চাইলে লাইনম্যান বসির বলেন, ‘আমি ফুটপাতে দোকান করি। এখানে দায়িত্বে আছে সেলিম। তিনি বাড়ি গেছেন, তাই আমাকে টাকা তোলার জন্য বলেছেন। এর বাইরে আর কিছু জানি না।’

চাঁদনী চক মার্কেট ও গাউসিয়ার সামনে চাঁদা তোলেন জাহাঙ্গীর ও সিরাজ। প্রতিদিন এখানকার হকারের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা (দোকান ভেদে) চাঁদা তোলা হয়। গাউসিয়ার সামনের ফুটওভার ব্রিজে হকারদের থেকে চাঁদা আদায় করেন লাইনম্যান কালাম। নিউমার্কেটের পূর্ব পাশে (২ ও ৩ নম্বর গেট) চাঁদা তোলেন আনিস ও মিজান। এ এলাকার একজন হকার আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি বিকাল পর্যন্ত তিনটি জামা বিক্রি করেছি। এতে আমার ৯০ টাকা লাভ হয়েছে। অথচ একটু পর লাইনম্যান মিজান এলে ২০০ টাকা দিতে হবে। একটু দেরি করলেই গালাগাল করে।’ নিউ সুপার মার্কেটের সামনে জুতাপট্টি এলাকায় চাঁদা তোলেন জলিলের নাতি জনি। মিরপুর রোডের পশ্চিম পাশের পুরো ফুটপাত দেখভাল করেন ইবুর প্রধান সহযোগী সাত্তার মোল্লা।

গাউসিয়া নুর ম্যানশনের সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করেন নুর ইসলাম ও মোরশেদ। হকার্স মার্কেটের (হকার্স থেকে গ্লোব প্লাজা) সামনের লাইনম্যান রফিক ও আকবর। তাদের সহযোগী হকার মতি। প্রিয়াঙ্গন শপিং মল থেকে মেঘনা পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত চাঁদা তোলেন লাইনম্যান বাচ্চু ও মঞ্জু। তাদের রয়েছে একাধিক সহযোগী। হকার্স মার্কেটের দক্ষিণ পাশের (এলিফ্যান্ট রোড) ফুটপাত থেকে চাঁদা নেন লাইনম্যান রমজান ও তার সহযোগী সৈয়দ। মিনি মার্কেট থেকে ইস্টার্ন মল্লিকা (এলিফ্যান্ট রোড) লাইনম্যান ছোট জাহাঙ্গীর এবং বাটা সিগন্যাল থেকে স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত চাঁদা তোলেন ইসমাইল।

হকাররা জানান, ফুটপাতে দোকান করতে হলে চাঁদা দিতে হয় তাদের। চাঁদা না দিলে দোকান ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। অথবা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার বলেন, ‘ইবুর লোকদের চাঁদা না দিলে পুলিশ দিয়ে থানায় নিয়ে যায়। থানা থেকে ছাড়া পেতে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। আবার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় অনেক হকারকে মারধর করে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে অনেক।’

হকার্স মার্কেটের সামনে ফুটপাতের এক ব্যবসায়ী সুরুজ বলেন, ‘এমনিতে সবসময় দোকান করতে পারি না। সকালে হোক বা বিকালে দোকান বসালেই ২৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এসব চাঁদাবাজ অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো কেউ নেই। আমরা তো সামান্য হকার।’

একই অভিযোগ করেন হকার আফসার উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এ দেশে বিনামূল্যে কিছুই হয় না। নিউমার্কেট এলাকায় চাঁদা দেওয়া ছাড়া কখনোই ফুটপাতে ব্যবসা করা যায় না। শুধু তাই নয়, এখানে দোকান বসাতে এককালীন ১ থেকে ২ লাখ টাকা দিতে হয়। এরপর দৈনিক চাঁদা তো রয়েছে।

বাংলাদেশ হকার্স লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এম এ কাশেম বলেন, ‘ফুটপাতে যারা ব্যবসা করে তাদের আয় খুবই কম। এর মধ্যে চাঁদা দেওয়ার কারণে তাদের ওপর একটা অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আমরা সবসময় কথা বলে আসছি।’

এম এ কাশেম আরো বলেন, ‘এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে আমরা যখনই ব্যবস্থা নিতে যাই তখন এক শ্রেণির রেজিস্ট্রেশনবিহীন হকার এসব চাঁদাবাজের পক্ষ নেয় এবং এদের পেছন থেকে সহায়তা করেন কিছু অসাধু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশ সদস্য।’

জানা যায়, ইব্রাহিম ওরফে ইবু ছিলেন ফুটপাতের একজন হকার। ২০০০ সাল থেকে তিনি এই চাঁদাবাজির কারবার শুরু করেন। আগে বিএনপি সমর্থন করলেও বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটির (নিউমার্কেট) ১৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন।

ওয়ার্ডের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা বলেন, ইবু চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনেক অর্থের মালিক হয়েছেন। মূলত টাকা দিয়েই তিনি সব জায়গা ম্যানেজ করেন।

ফুটপাতে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম ওরফে ইবু বলেন, ‘আমার জুতার ব্যবসা আছে। হৃদয় সুজ নামে একটি দোকান আছে। আমি হকারদের জুতা সাপ্লাই দেই। আগে আমরা ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেছি। এখন পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই লাইনম্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারাই এসব দেখে।’

অন্যদিকে ইবুর কথা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. সাজ্জাদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পুলিশ ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করছে- এমন তথ্যের কোনো সত্যতা নেই। বরং নিউমার্কেট এলাকার প্রধান সড়কে কোনো ফুটপাতে হকারদের বসতে দেওয়া হয় না।’

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close