নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ইলিশ আছে দাম বেশি

ইলিশের কথা শুনলেই বাঙালির জিভে জল আসে। ইলিশ ভাজা, ইলিশের পাতুরি, সর্ষে ইলিশ, দই-ইলিশ, ইলিশের ঝোল- বাঙালির রসনারাজ্যে ইলিশের শত রূপে, শত স্বাদে আনাগোনা। কিন্তু তাতে বাদ সেধেছেন ব্যবসায়ীরা। দাম বাড়াতে বাড়াতে ইলিশকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছেন তারা- যেন সবার ইলিশ খেতে নেই অবস্থা এমনই।

গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে সপ্তাহের অন্যদিনের তুলনায় ক্রেতার চাপ তুলনামূলক বেশি। ভরা মৌসুমে অনেকেই সোয়ারি ঘাট থেকে কমদামে ইলিশ কিনতে আসেন। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় হতাশ তারা। একজন ব্যবসায়ীর মতে, আড়তে ইলিশের যে দাম হাঁকা হচ্ছে তাতে খুচরা বাজারে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়বে।

গতকাল শুক্রবার সোয়ারিঘাটে জাটকা (৩০০ গ্রাম ওজনের নিচের ইলিশ) বিক্রি হতে দেখা যায়, ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং ৮০০ থেকে ১ কেজির নিচের মাছের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। ১ কেজির ওপরে ইলিশের কেজি ১ হাজার ১০০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। দেড় কেজি ওজনের বড় ইলিশের কেজি ১৫০০ টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এক বাসিন্দা নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় প্রতিদিনের সংবাদের। তিনি জানান, এখানে এসে ইলিশের যে দাম তাতে কেনা মুশকিল। তার মতো আরো যারা এসেছেন তারা জানান, নাগালের বাইরে ইলিশের দাম। বড় আকারের মাছও তেমন নেই। সোয়ারিঘাট মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি

মো. শফিকুল ইসলাম জানান, পাইকারি এখন প্রতি মণ এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৪২ হাজার টাকা। আগে যা ছিল ৩২ হাজার টাকা। প্রতি মণে ১০ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। আর ছোট আকারের ইলিশ প্রতি মণ এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা। আগে ছিল ১৮ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় ইলিশ এখন প্রতি মণ ৫৫ হাজার টাকা, যা আগে বিক্রি হতো ৪২ হাজার টাকা। রপ্তানির খবর পাওয়ার পর থেকেই ইলিশের দাম বাড়তে শুরু করে প্রতিদিনই বাড়ছে। এ বছর ইলিশ কম বলা হলেও আগের বছরের তুলনায় কম নয়।

ঢাকার কারওয়ান বাজারেও ইলিশের দাম বাড়তি। খুচরা বাজারে বড় আবারের ইলিশের সরবরাহ কমে গেছে বলে জানান ইলিশ ব্যবসায়ী জামাল হোসেন। তিনি মনে করেন, সরবরাহ দু-এক দিনে আরো কমে যাবে। তিনি জানান, গত দুদিনে হঠাৎ করেই ইলিশের দাম কেজিতে গড়ে ২০০ টাকা বেড়ে গেছে।

এদিকে চাঁদপুরের ইলিশ ব্যবসায়ী খান এন্টারপ্রাইজের গিয়াস উদ্দিন খান বিপ্লব বলেন, প্রধানত তিন কারণে ইলিশের দাম বেড়ে গেছে। ভারতে ইলিশ রপ্তানির চাপ, জো না থাকায় মাছ কিছুটা কম ধরা পড়ছে আর ৪ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। আর প্রতি বছর ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হলেও এবার হচ্ছে দুই হাজার টনের বেশি। ফলে চাপ বেশি পড়ছে।

গিয়াসউদ্দিন জানান, কয়েক দিন আগেও এক কেজি ওজনের একটি মিঠাপানির পদ্মার ইলিশ বিক্রি হতো এক হাজার ১০০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২৫০ টাকায়। গত বছর এই ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৯০০ টাকায়। এর থেকে ছোট আকারে ৫০০-৭০০ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হতো সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা। তার মতে, অনলাইনে বেচাকেনার সুযোগ বাড়ার কারণেও ইলিশের দাম বাড়ছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন চাঁদপুরের ইলিশ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করায় চাহিদা বেড়েছে।

একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায় দেশের অন্য এলাকার ইলিশের আড়তে যোগাযোগ করে। দক্ষিণের বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি এনামুল হোসেন বলেন, ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন আর বড় ইলিশ কিনে খেতে পারছেন না। তারা জাটকা সাইজের ছোট ইলিশ খেয়েই তৃপ্ত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ভারতে বড় আকারের ইলিশ রপ্তানি শুরু হওয়ায় দাম অনেক বেড়ে গেছে।

ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে। ৫২ জন রপ্তানিকারক এই রপ্তানির অনুমতি পেয়েছেন। প্রত্যেক রপ্তানিকারক ৪০ টন করে রপ্তানি করতে পারবেন। বেনাপোলের ইলিশ রপ্তানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্ট বিশ্বাস ট্রেডার্সের মালিক নুরুল আমিন বিশ্বাস জানান, গত বুধবার রাত থেকে রপ্তানি শুরু হয়েছে। প্রথম চালানে ৭৮ টনের বেশি ইলিশ পাঠানো হয়েছে ভারতে। বৃহস্পতিবার প্রায় একই পরিমাণ রপ্তানি হয়। তারা ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ রপ্তানি করতে পারবেন। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি কেজি ইলিশ তারা ১০ ডলারে রপ্তানি করছেন। তবে তিনি জানান, ইলিশ রপ্তানিকারকরা ভারতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসা করেন। বাজারে যে দামে শেষ পর্যন্ত বিক্রি হবে তার ওপর তারা লাভ ভাগাভাগি করে নেবেন। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত হাওড়া, শিয়ালদা ও পাটিয়াপুকুর পাইকারি বাজারে ইলিশ যায়। সেখান থেকে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন খুচরা বাজারে ইলিশ বিক্রি হয়।

২০১২ সালে ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করা হয়। এরপর ২০১৯ সালে আবার রপ্তানি শুরু হয়। তখন থেকে প্রতি বছর ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হতো। কিন্তু এবার রপ্তানি করা হচ্ছে চার গুণেরও বেশি। গত বছর বাংলাদেশে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন ইলিশ আহরণ করা হয়। বাংলাদেশে মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের পরিমাণ ১২.৫ ভাগ।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close