বদরুল আলম মজুমদার

  ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

এবার জয় হবে মেধার

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্য সব খাতের সঙ্গে শিক্ষাকেও যুগোপযোগী করাই সরকারের লক্ষ্য। একটি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মুখস্থ বিদ্যা থেকে বেরিয়ে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষায় জোর দিয়েছে সরকার। ঘোষণা করা হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে বের করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাকে। এতে পথ খুলবে মেধাবিকাশের।

নতুন শিক্ষাক্রমের পথরেখা অনুসারে, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের কাজটি আগামী বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে। এ পদ্ধতি চালুর জন্য লেখা হবে নতুন পাঠ্যবই। আর এর সবকিছুই হবে ২০২৩ সাল থেকে। পর্যায়ক্রমে ২০২৫ সালে গিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি কার্যকর হবে। এর মধ্য দিয়ে নতুন, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষার মহাসড়কে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।

সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, মুখস্থ করে পড়া শেখার পদ্ধতি জ্ঞানের প্রতি ভীতি জাগিয়েছিল। জ্ঞানের মতো আনন্দময় বিষয় আর কিছু নেই। কিন্তু মুখস্থ পদ্ধতির কারণে তা আমাদের কাছে দানবের মতো মনে হয়েছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আরো বলেন, মুখস্থ সর্বস্ব বোকাদের যুগ শেষ হচ্ছে। সামনে মেধাসম্পন্ন, আনন্দময় আর বুদ্ধি ক্ষমতার যুগ। মুখস্থ নয়, যাদের চিন্তাশক্তি বেশি তারাই ওপরে থাকবেন।

নতুন শিক্ষাক্রম প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই এটি খুব ভালো কথা। পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের ওপর পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে না দেওয়ার বিষয়টি আগেও নানাভাবে বলা হয়েছে। তবে এটি আরো স্পষ্ট করা উচিত।

এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান এই প্রতিবেদকে বলেন, আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জন্য আলাদা কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়ার কারণে এই স্তরে সমন্বয় থাকত না। এবার একসঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কারিকুলাম পরিমার্জন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হবে না। প্রাথমিক স্তরের কারিকুলামের ক্ষেত্রে সময়ের চাহিদাগুলো বিবেচনায় আনা হচ্ছে। বইয়ে কাগজের নৌকার ছবি থাকলে শিক্ষার্থীদের তা শ্রেণিকক্ষেই বানিয়ে দেখাতে হবে। এতে শিশু-শিক্ষার্থীর কাজের দক্ষতা বাড়বে।

গত সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রীও পরিমার্জিত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন কারিকুলামে শিক্ষার্থীরা সনদের জন্য শিক্ষা লাভ করবে না, একটি নির্দিষ্ট পারদর্শিতা অর্জনের জন্য শিক্ষা নেবে, পরিমার্জিত শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নের জন্য নেবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, নতুন কারিকুলামে শিক্ষা হবে আনন্দঘন। এ কারিকুলামে মুখস্থ জ্ঞাননির্ভর শিক্ষা থেকে সরে এসে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিক শিখন নিশ্চিত করা হচ্ছে। পরীক্ষার বিষয় ও পাঠ্যপুস্তকের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের মতো কিছুটা সময় কাটাতে পারে তা নিশ্চিত করতেই নতুন কারিকুলাম।

মুখস্থ জ্ঞাননির্ভর নয়, শিক্ষার্থীরা যাতে কিছু করার মাধ্যমে শিখতে পারে তা নিশ্চিত করা হয়েছে নতুন কারিকুলামে। শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, নতুন কারিকুলামে মুখস্থ বিদ্যার বদলে অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে খেলাধুলা বা নিজে কিছু করে শিখতে পারে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। সনদ দিয়ে যদি শিক্ষার্থী উদ্বুদ্ধ বোধ করেন সেজন্য সনদটা। সনদের জন্য শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতেই শিক্ষা। তারা যে পারদর্শিতা অর্জন করেছে তার স্বীকৃতিই সনদ। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা পারদর্শিতা অর্জন করুক ও তারা স্বীকৃতি হিসেবে সনদও পাবে।

কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০) প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, কারিকুলাম হলো শিক্ষার পথরেখা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠার পথরেখা অনুসরণ খুবই জরুরি। পরীক্ষার চাপমুক্ত পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনটা আসলে খুব দরকার।

এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জন্য পৃথক সময়ে কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়ার কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে কোনো সমন্বয় থাকত না। এবারই একসঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কারিকুলাম পরিমার্জন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হবে না। তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক স্তরের কারিকুলামের ক্ষেত্রে সময়ের চাহিদাগুলো বিবেচনায় আনা হচ্ছে। বইয়ে কাগজের নৌকার ছবি থাকলে শিক্ষার্থীদের তা শ্রেণিকক্ষেই বানিয়ে দেখাতে হবে। এতে শিশু-শিক্ষার্থীর কাজের দক্ষতা বাড়বে।

এদিকে পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুসারে, শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান নাকি অন্য কোনো শাখায় পড়বে, তা নির্ধারণ করা হবে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে। দশম শ্রেণির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। শুধু দশম শ্রেণির কারিকুলামের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। ২০২৪ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) এবং পঞ্চম শ্রেণির প্রাইমারি এডুকেশন সার্টিফিকেট (পিইসি) পরীক্ষা আর কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হবে না। বিদ্যালয়েই বার্ষিক পরীক্ষার মতো এসব শ্রেণির মূল্যায়ন করা হবে। তবে এসব শ্রেণিতে জেএসসি, জেডিসি ও পিইসি সনদ দেওয়া হবে। আর প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাতেই থাকবে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে, অর্থাৎ প্রতি বছর শেষে হবে পাবলিক পরীক্ষা। আর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close