কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

  ০৪ আগস্ট, ২০২১

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব কার?

মাঝারি ও ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীতে সৃষ্টি হয় মারাত্মক জলাবদ্ধতা। নগরীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা খাতুনগঞ্জ কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়। এমনিতেই প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে ডুবন্ত অনেক এলাকা। আগে সিটি করপোরেশন নালা-নর্দমা পরিষ্কার করলেও এখন করছে না। করপোরেশন দায় চাপাচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ওপর। সিডিএ বলছে, নালাণ্ডনর্দমা পরিষ্কার করার কাজ সিটি করপোরেশনের। এভাবে এ দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব আসলে কার?

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় চ্যালেঞ্জটি নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাদ্দ দেন ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বিশাল এ প্রকল্পটি এখন চলমান। আশা করা হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শহরে জলাবদ্ধতা থাকবে না। তবে বাস্তবচিত্র ভিন্ন। কারণ সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এসব কাজের সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। এ কাজ করবে কে। এ প্রশ্নে নগরীর দুটি সংস্থা একটি আরেকটির ওপর দায় চাপিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে এক দিন ভারী বর্ষণেই তলিয়ে যায় নগরীর পথণ্ডঘাট ও নিচু এলাকা। চট্টগ্রামের মানুষ দেখেছে ওই সময় হাত গুটিয়ে বসে ছিল সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। মেয়রের বাড়ির উঠোনেও কয়েক ফুট পানি ছিল তখন। আগের মেয়ররা বর্ষায় মানুষের দুঃখণ্ডদুর্দশা দেখতে বের হলেও বর্তমান মেয়রকে পানির অবস্থা দেখতে বের হতে দেখেননি কেউ। তিনি দায় চাপিয়েছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ওপর। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, খাল সংস্কারের সময় বাঁধ দেওয়ার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে গত সোমবার সিটি করপোরেশনের একটি সমন্বয় সভায় মেয়র রেজাউল করিম বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নগরীতে পানি জমবে না।’

সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এ বিষয়ে বলেন, খালের আবর্জনা পরিষ্কারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। সুজন বলেন, ‘আমি প্রশাসক থাকার সময় অনেক খাল থেকে আবর্জনা তুলেছি। এগুলো রুটিনকাজ। তবে করপোরেশনে বরাদ্দ কম থাকার কারণে এসব কাজ ঠিকমতো হয় না।’

এ ব্যাপারে সিডিএর সদস্য স্থপতি আশিক ইমরানের সঙ্গে কথা বললে, তিনি জানান জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় নেই। পানিতে নগরী যখন ডুবে যায় তখনো সবাই হাত গুটিয়ে বসে থাকে। সিটি করপোরেশনের কাজই হলো নগরীর নালাণ্ডনর্দমা সব সময় পরিষ্কার রাখা। এটি রুটিনওয়ার্ক।

আশিক ইমরান বলেন, সেনাবাহিনীর প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পথে। আর দুই বছরের মধ্যে এটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এটি নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনের যে লোকবল দরকার হবে তা এখন নেই। এখানে অনেক বিষয় আছে, যেমন স্লুইসগেট যেগুলো বসানো হচ্ছে তার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা দরকার। তা ছাড়া করপোরেশনে অভিজ্ঞ লোক নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর যদি পুরোপুরি রক্ষণাবেক্ষণ বা নজরদারি না থাকে তাহলে এত টাকা ব্যয় করার পরও এটি কোনো কাজে আসবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সেবা সংস্থাগুলোর এখন থেকে চিন্তা করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করলে তারা সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে কি না। নাকি এটি সিডিএর হাতেই থাকবে।

কয়েক দিন আগে বর্ষার বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম। অন্যদিকে জোয়ারের পানি নিয়ে বড় সমস্যায় দিন কাটাচ্ছে নগরবাসী। সামান্য বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকা ভবিষ্যতে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এখন বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিও উঠতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের বড় এলাকাগুলোতে। যেকোনো মূল্যে এ পানি ঠেকাতে হবে। এরই লক্ষ্যে কাজ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইনজিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৭ সালের প্রকল্পটি ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে কাজটি আদৌ শেষ হবে কি না সংশয় রয়েছে। কারণ সেনাবহিনী এ কর্মযজ্ঞ সামলাতে গিয়ে দেখেন নানা জায়গায় বিশাল বিশাল অবৈধ স্থাপনা, ৩৬টি খালের মধ্যে অনেকগুলো নালায় পরিণত হয়েছে, খালপাড় ঘিরে নানা অবৈধ স্থাপনা, প্রভাবশালী মহলের দখলে খাল, হাইকোর্টে মামলা। এসব কারণে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, সেনাবাহিনীর প্রথম নজর ছিল চট্টগ্রামের খালগুলোর ওপর। কারণ পানি তো এ খাল দিয়ে যাবে। এগুলো উদ্ধার করা না গেলে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না। সেনাবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের ভেতরে ৩৬টি খালের কথা উল্লেখ আছে। শেষ পর্যন্ত ৩৬টি চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযোগ আছে এমন খাল হচ্ছে ১৬টি, আর এসব খালের সঙ্গে লিংক আছে এমন খালের সংখ্যা ২০টি। সেনাবাহিনী এরই মধ্যে ৩৬টি খাল থেকে ময়লা ও কাদা অপসারণ করেছে। এসব খালের আশপাশ ঘিরে থাকা সাড়ে তিন হাজারেরও অধিক অবৈধ স্থাপনা সরানো হয়েছে। ২৮টি খালের পাড় ঘিরে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজ চলছে। ৩৫ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আরো ২৫ কিলোমিটারে নির্মাণকাজ চলছে। পানি সরবরাহ বাধামুক্ত করতে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত ড্রেন সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করতে হবে ৫৪টি সেতু ও কলভার্ট। এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৩৪টির কাজ শুরু হয়। এর মধ্যে ১৬টির কাজ শেষ। ১৮টির কাজ চলছে। বাকি ২০টি রয়ে গেছে। এগুলোতে নানা জটিলতা আছে। শিগগিরই ২০টি কাজও শুরু হবে।

চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা হয় চকবাজার, প্রবর্তক মোড়, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ ২২টি এলাকায়। সেনাবাহিনী বলছে, এই ২২ এলাকা ঘিরে আলাদাভাবে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ৫টি স্লুইসগেট রেগুলেটরের মধ্যে অন্তত ৪টির (টেকপাড়া, মরিয়মবিবি, কলাবাগিচা, ফিরিঙ্গিবাজার) কাজ শেষ হওয়ার পথে, এগুলোর কাজ করছে সেনাবাহিনী। মহেষখালের কাজও এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাতে দেওয়া ২৩টি কাজ চলছে ধীরগতিতে। অন্যদিকে সিডিএর হাতে নেওয়া ১২টি স্লুইসগেট রেগুলেটরের কাজও চলছে ঢিলেঢালা। সময়মতো এ কাজগুলো শেষ করতে না পারলে প্রকল্পের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সময়ে বিলম্বত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে নগরবাসীর ভোগান্তিও বাড়বে। চাকতাই খাল, মীর্জা খাল ও হিজড়া খাল এই প্রধান তিন খালের প্রকল্প প্রস্তাবিত ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রাথমিক ধাপে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। এ কাজেও রয়েছে ধীরগতি।

এ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত আছে প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতায় ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৩০২ কিলোমিটার ড্রেনের কাজ করছি আমরা। ৫১ শতাংশ ড্রেনের কাজ শেষ হয়েছে।’ কাজের নানা বাধাণ্ডপ্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা ১৩০০ কিলোমিটার ড্রেন অবৈধ দখলে চলে গেছে। এগুলো আবর্জনা ও নানা বর্জ্যপদার্থে পূর্ণ। এগুলো উদ্ধার করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শহরে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে তিনি জানিয়েছেন।’

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close