গাজী শাহনেওয়াজ

  ০৬ জুন, ২০২১

এনআইডি পৃথক্করণে অচল হবে ইভিএমও

* একই কাজ দুই সংস্থার অধীনে চললে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে * ভোটারদের কাছে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ভোটার তালিকা আলাদা কর্তৃপক্ষের অধীনে গেলে নানামুখী সংকট তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, একই ধরনের কাজ পৃথক সংস্থার পরিচালনার কারণে একদিকে ভোটার ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটবে, অন্যদিকে দেখা দেবে সাংবিধানিক সংকট। নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের ফলে ভোট ব্যবস্থায় মানুষের মধ্যে যে আস্থা তৈরি হয়েছিল সেখানেও চিড় ধরবে। আর প্রযুক্তিবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকারের আন্দোলনের ফল নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সেটিও হুমকিতে পড়বে। এখন পর্যন্ত ৭ কোটির বেশি মানুষের তথ্য ইভিএমে সংযোজিত হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিদ্যমান ও নতুন ভোটারের তথ্য সংযোজন হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ব্যবস্থায় ইভিএম ব্যবহার করাও হুমকিতে পড়বে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এসব অভিমত দিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনার মো. মাহবুব তালুকদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র একটি আরেকটির সঙ্গে জড়িত। দুটি আলাদা কর্তৃপক্ষের হাতে গেলে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেইস নির্ভর ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হবে। এটি করা হলে সংবিধানের ১১৯ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনও সম্ভব হবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে এনআইডি স্থানান্তর কমিশনের অঙ্গচ্ছেদের নামান্তর। এ বিষয়ে কমিশনকে না জানানো নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশের শামিল। নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে এমন দুর্দিন আর আসেনি। সংবিধানের ১০৮ (৪) ধারায় বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন।’ এটি কমিশনের জন্য রক্ষাকবচ হলেও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এখন কোথায়? আমি মনে করি, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগ অন্যত্র স্থানান্তর সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার অন্তিমযাত্রার আয়োজন।

------
নির্বাচন কমিশনের আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল কাশেম মো. ফজলুল কাদের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘জাতীয় ভোটার তথ্য ভান্ডারের সার্ভারই ভোটার তালিকার সার্ভার। নতুন আরেকটি সার্ভার স্থাপন করা ছাড়া ভোটার তালিকা থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রকে আলাদা করা যাবে না। কারণ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক সংস্থা, এই সার্ভারটি তাদের নিজস্ব সম্পত্তি।’ তিনি বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত স্মার্টকার্ড ছাড়া ইভিএম অচল। কারণ এনআইডি নম্বর দিয়েই কাস্টমাইজ করে ইভিএমকে নির্বাচনের জন্য উপযোগী করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার জাতীয় পরিচয়পত্রকে নিয়ে যেতে চাইলে সমস্যা অবশ্যই তৈরি হবে। কারণ সার্ভার একটি। তাই বিদ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা ছাড়া সরকার এটি নিতে পারবে না। এছাড়া বিদ্যমান জনবলও স্থানান্তর করতে পারবে না। জনবল বলতে, থানা-উপজেলা নির্বাচন অফিসার, জেলা নির্বাচন অফিসার এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তারাই জাতীয় পরিচয়পত্রটি করে দেন। তাদের প্রধান কাজ ভোট পরিচালনা এবং দ্বিতীয় কাজ ভোটারদের নিবন্ধন করা। এসব লোককে কি সরকার নিতে পারবে? তাহলে সরকারের সামনে দুটি সমস্যা রয়েছে একটি বিদ্যমান জনবল এবং বিদ্যমান অবকাঠামো। এবার আসি ইভিএমের বিষয়ে। ইভিএম যখন কাস্টমাইজ বা পারসোনালাইজেশন করা হয় তখন এর মধ্যে ভোটারের তথ্য দিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন ভোটারের তথ্য প্রতিনিয়ত আপডেট করা হয়। পাশাপাশি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তথ্য আপডেট করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র যদি চলে যায় তাহলে ইভিএমও অচল। সবই অচল হয়ে যাবে। এরই মধ্যে বিদ্যমান ভোটারের তথ্য আপলোড করা আছে এবং প্রতিদিনই সারা দেশে ৫ হাজার নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত হচ্ছে। প্রত্যেকটি জায়গায় নতুন নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত হচ্ছে। এসব ভোটারকেও ইভিএমে অ্যাড করা হচ্ছে। যদি জাতীয় পরিচয়পত্র চলে যায় তাহলে ইভিএমের কাস্টমাইজেশন বন্ধ হয়ে যাবে।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সরকারের অধীনে নেওয়া হলে ভোটার তালিকা প্রণয়নে সংকট তৈরি হবে। পাশাপাশি এনআইডি হওয়ার পর ব্যক্তির বিভিন্ন ভুলের কারণে যে সংশোধন হচ্ছে, সেটাও ডিজিটালি করা হচ্ছে। এই সংশোধন চলে যাবে অন্য দপ্তরের অধীনে। এই কারণে তথ্যের গোপনীয়তা যেমন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনিভাবে এটা যথাযথ হওয়া নিয়েও সমস্যা তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, এর আগে আমরা দেখেছি ১ কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার ছিল। ছবিসহ ভোটার তালিকা থাকার পরও মানুষের মধ্যে বিশ্বস্ততার ঘাটতি রয়েছে। এখন দুটি জায়গায় চলে গেলে এই ঘাটতি ও সংশয় আরো বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় অসুবিধা হবে ভোটার তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে একই ধরনের কাজের প্রযুক্তি থাকার কারণে। কারণ আগে এক নিয়মে চললেও আগামীতে পৃথকীকরণের পরে দুভাবে এটি চলবে। ইভিএমের সঙ্গে ভোটার সার্ভারের সম্পর্ক না থাকলেও ভোটারদের তথ্য পরিচয় সেখানে সন্নিবেশ করানো আছে। তাই এটিও অচল হয়ে পড়বে। জাতীয় পরিচয়য়পত্র ও ভোটার আলাদা হলে একটা ঝামেলা তৈরি হবে। আর এটাকে ঠিক করতেও তখন আরো সময় লাগবে। কারণ এখন নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ছবিসহ ভোটার তালিকা মানুষের বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশনের ডেটাবেইস, অবকাঠামো এবং জনবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করার; এর ফলে একদিকে যেমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমাদের ভোটার তালিকার ওপরে নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে, তেমনিভাবে এটা আরো জটিলতার সৃষ্টি করবে। কারণ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি এভাবে নির্দেশ দিতে পারেন না। এটা সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমাদের ভোটের ক্ষেত্রেও একটা প্রভাব পড়তে পারে। আর আগামীতে নির্বাচন ইভিএমে হবে এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এটা কাস্টমাইজ করার জন্য স্মাটকার্ডের প্রয়োজন হবে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যদি এর ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকে তাহলে তারা ভোট প্রদান ও ভোটের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। এটা কারোই কল্যাণ বয়ে আনবে না।

এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেছিলেন, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) কার্যক্রম ইসির কাছ থেকে অন্য কোনো সংস্থার অধীন ন্যস্ত করা হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। তাই এটি ইসির অধীনেই থাকা উচিত। তবে গত ২ জুন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র দ্রুতই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের সেবা এক মাসের মধ্যেই নিশ্চিত করা হবে যা কমিশন দিতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে দাবি তার।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close