অভিমত
তরুণদের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন থাকা চাই
মিজান মনির

তরুণরাই আগামী দিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তরুণদের অন্তরে সদা জাগ্রত থাকে দুর্বার স্পৃহা। তারুণ্য একটি প্রবল প্রাণশক্তিÑযা অফুরন্ত সম্ভাবনা ও বর্ণিল স্বপ্ন দ্বারা উজ্জীবিত থাকে সবসময়। একটি স্ফুলিঙ্গ তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত শিখায় পরিণত করতে পারে, যা হয়ে উঠতে পারে নক্ষত্রের মতো সমুজ্জ্বল। এ জন্য প্রয়োজন একটি স্বপ্নেরÑযে স্বপ্ন তরুণ সমাজকে একটি সুন্দর সফল জীবনের পথ দেখাবে। প্রতিটি তরুণেরই উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন থাকা চাই। উদীয়মান তরুণ প্রজন্ম এখন দেশের বিরাট এক জনগোষ্ঠী। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আব্দুল কালাম তার সর্বশেষ বাংলাদেশ সফরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০০ শিক্ষার্থীর সামনে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের স্বপ্নগুলো হবে বাংলাদেশের স্বপ্ন, তোমাদের ভাবনাগুলো হবে বাংলাদেশের ভাবনা এবং তোমাদের কাজগুলো হবে বাংলাদেশের কাজ।’ বর্তমান তরুণদের স্বপ্নে, চিন্তা-চেতনায়, ভাবনা-কল্পনায় এবং কাজ-কর্মের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশ ও আপামর জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ। তরুণরাই হবে জাতির মেরুদ-। এ মেরুদ-কে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার কাজে অভিভাবক সমাজ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সঠিক পরিচর্যা পেলে একদিন তরুণরাই তাদের মহৎ স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
বাংলাদেশে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় চার কোটি ৭৬ লাখ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল-২০১৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বর্তমান মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ তরুণদের সংখ্যা ১০ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে আসবে। তাই আজকের এ বিশাল কর্মক্ষম ও উদ্যমী তরুণ প্রজন্মের সামনে বিরাট সম্ভাবনা ও সুযোগের সৃষ্টি হয়েছে। তারা দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এ সম্ভাবনাময় তরুণ জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার এখনই উপযুক্ত সময়। দেশের উন্নয়নের অভিযাত্রায় এরাই অগ্রণী সৈনিকের ভূমিকা পালন করবে। অতীতে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তরুণ ও যুব সমাজ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতেও এই তরুণ সমাজ তাদের অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।
বিজ্ঞানের কল্যাণে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয়। বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার যুগে ইন্টারনেটে যে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুবর্ণ দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে; এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করছে বা করবে বর্তমান তরুণ সমাজ। তারা তাদের জ্ঞানকে শানিত করে মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির স্ফুরণ ঘটিয়ে নতুন নতুন আবিষ্কারের দ্বারা দেশ ও মানবতার কল্যাণসাধন করবে। সৃজনশীল কর্মকা-ে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগকে অবারিত করে দিতে হবে। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও সামর্থ্য অর্জন করবে। বিশ্ব জুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে চলার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বর্তমান তরুণ সমাজকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। এর জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক গুণগত শিক্ষা, যার আলো তাদের অন্তরকে আলোকিত করবে, সম্ভাবনা ও সুপ্তশক্তিকে উন্মোচিত করবে, আত্মবিশ্বাসী ও কর্মোদ্যোগী করে তুলবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা কর্মী, ব্যবস্থাপক ও উদ্যোক্তা হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে। উন্নয়নের বহুমুখী খাতগুলো তারুণ্যের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠবে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির দৌরাত্ম্যে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য পাহাড়সম রূপ ধারণ করছে। এক শ্রেণির মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড় জমছে, অন্যদিকে অগণিত দরিদ্র ও বুভুক্ষ মানুষের হাহাকারে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তরুণ সমাজকে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। প্রাচীনকাল থেকেই কৃষি এদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এক বিরাট অবদান রেখে আসছে। এখনো ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য জোগানো ছাড়াও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের উৎপাদন দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। কৃষিতে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণই হতে পারে আমাদের উন্নয়নের এক বড় নিয়ামক শক্তি। এভাবে তরুণ সমাজ তাদের উদ্ভাবনী ও সৃজনী শক্তির দ্বারা আত্মকর্মসংস্থানের বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্যে চাই তাদের জন্য শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও পরামর্শ। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে তা কখনো বিফলে যাবে না, বরং অর্থনীতির চাকা সচল হবে, দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
তরুণ সমাজের উন্নয়ন হলে জাতির মেরুদ- শক্তিশালী হবে; দেশ ও জাতি সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। দেশে আজ সুশাসন ও নীতি-নৈতিকতার বড়ই সংকট। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। দলীয় ও গোষ্ঠীগত চেতনায় জাতীয় চেতনাবোধ বিলুপ্তপ্রায়। যার ফলে দেশের তরুণ সমাজ বিভ্রান্তি ও হতাশায় নিমজ্জিত। একটি উন্নয়নকামী সভ্য দেশের জন্য এ অবস্থা আদৌ কাম্য নয়। দেশে পরিবর্তন আনার এখনই সময়। জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক আমাদের তরুণ সমাজ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারাই পারে সব ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে। সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের তরুণ সমাজকে নোংরা রাজনীতি, সন্ত্রাস ও কালো টাকার ছোবল থেকে রক্ষা করতে হবে। দেশবাসীর আশা পূরণে তারা এমন একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেÑযেখানে থাকবে না কোনো হানাহানি, মারামারি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নির্যাতন ও শোষণ। দেশ ও জাতিকে তারা উপহার দেবে একটি শান্তি ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশ; একটি সুন্দর বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক
"




































