প্রকাশ ঘোষ বিধান
সতর্কতা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ

ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি এর ধরনও পাল্টাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ জনপদের প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙন ইত্যাদি দুর্যোগের কোনো না কোনোটি প্রায়ই এদেশে আঘাত হানে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় জানা গেছে, প্রতিবছর সমুদ্রের পানির স্তর ৩-৮ মি.মি. বাড়ছে। ফলে সুন্দরবন তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে সব থেকে বিপদে পড়বে এ এলাকার বন্যপ্রাণী। পানির তল যদি মাত্র ৪৫ সে.মি. বৃদ্ধি পায়, তাহলে বাংলাদেশ এবং ভারতের সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ সমুদ্রগর্ভের তলিয়ে যাবে। খুব দ্রুত সমুদ্রের পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে সুন্দরবন এলাকায়। ভূমিক্ষয় ও পানির স্তর বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক ও জনবসতির মাত্রাতিরিক্ত সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন কর্মকা-কে দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বেশি ঘটে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁঁকি বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এদেশের জনজীবনে প্রায় নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে জলাবদ্ধতা, অগ্নিকা- ও ভবন ধস। এছাড়া সিসমিক জোনে অবস্থান হওয়ায় এ দেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পেরও আশঙ্কা রয়েছে।
দুর্যোগকালীন অবস্থা মোকাবিলার চেয়ে আগাম সতর্কতা অবলম্বন অনেক বেশি ফলপ্রসূ। এজন্য সরকার নানা ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছে। ফলে আগের থেকে এখন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতিও অনেক কম হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অন্যান্য দেশ থেকে অনেক ভালো। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা এবং জলোচ্ছ্বাস হতে উপকূলীয় এলাকার জনগণ ও গবাদি পশু রক্ষায় সাইক্লোন শেল্টার বা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। দুর্যোগকবলিত বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর। এর মধ্যে রয়েছে দুর্যোগে আগাম বার্তা প্রচার, দুর্যোগ ঝুঁকি ও বিপন্নতা নিরূপণে জিআইএস ও দূর অনুধাবন প্রযুক্তি, নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা দূর অনুধাবন প্রযুক্তি, বিভিন্ন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, ওয়েব বেইজড সাইক্লোন শেল্টার তথ্য ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা তথ্য প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনা, প্লাবিত এলাকার গভীরতার মান চিত্রায়ন ইত্যাদি। দুর্যোগবিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্যোগ বিপদসঙ্কেত পদ্ধতি, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস পদ্ধতি, সাড়া দান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন ইত্যাদি কার্যক্রমে সরকার তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। দুর্যোগকালে মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করতে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ের ডিজিটাল সেন্টারগুলো অবদান রাখছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সফলতা থাকলেও নতুন নতুন হুমকি ও
চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি যত বেশি থাকবে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ততটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির শিকার জনগোষ্ঠীর অবস্থা
সহনশীল পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে সরকার দুর্যোগ সম্পর্কিত জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে দুর্যোগ ঝুঁকিমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হবে। আর এ লক্ষ্যে দেশে সম্ভাব্য দুর্যোগ বিষয়ে ঝুঁকি হ্রাস এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : সাংবাদিক
"




































