ফারহান ইশরাক

  ২৮ জুন, ২০২১

বিশ্লেষণ

ভার্সাই চুক্তির গর্ভে ছিল বিশ্বযুদ্ধের বীজ

পৃথিবীতে মানবজাতির বিকাশের শুরু থেকেই মানুষে মানুষে লড়াই চলে আসছে। এ লড়াই কখনো আধিপত্যের, কখনো অর্থের, কখনো ক্ষমতার, আবার কখনোবা শত্রুতার। ছোট ছোট এসব লড়াই থেকেই হানাহানি, সংঘাত ও যুদ্ধের সৃষ্টি। যুদ্ধ কখনোই ধ্বংস ব্যতীত অন্যকিছু বয়ে আনতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার কোনোটিই মানুষের জন্য কোনো ধরনের কল্যাণ সাধন করতে পারেনি, বরং এসব যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে শত সহস্র মানুষকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, মানুষের সম্পদহানি ঘটেছে, আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে। মানব ইতিহাসের প্রতিটি যুদ্ধ শেষের বিরহ কাব্য যেন একই ছন্দে লেখা। যুদ্ধ মানেই যেন মানুষের সমবেত আর্তনাদ। তবু মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধ ছেড়ে শান্তির পথে ফিরে আসেনি, বারবার জড়িয়েছে নতুন কোনো যুদ্ধে।

পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়টি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে তালিকার শীর্ষে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা, ক্ষিপ্রতা, নতুন অস্ত্রের ব্যবহার মানুষকে বিস্মিত করে তুলেছিল। পৃথিবীর মানুষ এ ধরনের যুদ্ধ কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। এই যুদ্ধকে বলা হয় পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম ত্রিমাত্রিক যুদ্ধ। কেননা, এই যুদ্ধেই সর্বপ্রথম যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমেই মানুষে মানুষে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে ভূমি ছেড়ে আকাশেও। যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা দেখে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘মহাযুদ্ধ’ হিসেবে। মানুষ ধারণা করেছিল, পৃথিবীতে হয়তো এ রকম যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু মাত্র দুই দশকের ব্যবধানেই সেই ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়। ১৯৩৯ সালে শুরু হয় পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত সংঘটিত ভয়াবহতম যুদ্ধটি। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্যাপকতা, প্রাণহানির মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল পৃথিবীর সব যুদ্ধকে। এই যুদ্ধের কারণেই মহাযুদ্ধের নাম বদলে রাখা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আর এই যুদ্ধকে বলা হতে থাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মহাযুদ্ধের পর আরো একটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হবে, এমনটি কেউ না ভাবলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ বপন করা হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষেই। আর এই বীজটিরই নাম ভার্সাই চুক্তি।

ভার্সাই চুক্তির এক পক্ষে ছিল মিত্রশক্তি ও তৎসংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো এবং অপর পক্ষে ছিল জার্মানি। যদিও চুক্তিটিতে দুটি পক্ষ ছিল, কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একপক্ষীয় একটি চুক্তি। বলা যায়, মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল চুক্তিটি। এবং জার্মানিও বাধ্য হয়েছিল চুক্তিতে সই করতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ সালে। ১৯১৭ সালের শুরুর দিক থেকেই জার্মানি বুঝতে পারে এ যুদ্ধে তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি কিংবা সমঝোতা চুক্তি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প ছিল না জার্মানির সামনে। তাই ১৯১৭ সালের শেষভাগে জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ সালের ৮ জানুয়ারি কংগ্রেসের এক অধিবেশনে তার ঐতিহাসিক ১৪ দফা উপস্থাপন করেন। এই ১৪ দফায় ইউরোপের শান্তি ফিরিয়ে আনার পক্ষে বেশ কিছু রূপরেখা বর্ণিত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় আন্তর্জাতিক মহলে এই ১৪ দফা নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। পরে ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্যারিসে একটি শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হয়। ১৮ জানুয়ারি আলোচনাটি শুরু হয়। মিত্রশক্তির ৩২টি দেশ এতে অংশগ্রহণ করে। যদিও এই শান্তি আলোচনা থেকে সব দেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়, কিন্তু এটি মূলত ছিল মিত্রশক্তির দেশগুলোর একপক্ষীয় একটি সম্মেলন। এই শান্তি আলোচনায় অক্ষশক্তির কোনো দেশকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনেই লিগ অব নেশনস সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গৃহীত হয় জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এই সম্মেলনেই মূলত ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হয়। এবং সেগুলো চূড়ান্ত করা হয় জার্মানিকে না জানিয়েই। আর এই চুক্তির শর্তগুলো নির্ধারণ করেন সেসময়ের বিশ্বমোড়লদের অলিখিত জোট ‘বিগ ফোর’। এই বিগ ফোরে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জেস ক্ল্যামেনকু এবং ইতালির ভিট্টোরিও অরল্যান্ডো।

ভার্সাই চুক্তির চুক্তিপত্রটি ছিল ২০০ পৃষ্ঠার এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় এটি লেখা হয়েছিল। এ চুক্তির ১৫টি অধ্যায়ে ধারা ছিল সর্বমোট ৪৩৯টি। যার সিংহভাগই ছিল জার্মানির স্বার্থ পরিপন্থি। ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে অর্থনৈতিক, সামরিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে ফেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে মিত্রশক্তি। এ চুক্তির ২৩১ ধারায় জার্মানির কাছে মহাযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বিপরীতে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। এই ক্ষতিপূরণের সামান্য অংশ পরিশোধ করতে গিয়েও হিমশিম খেতে হয়েছিল জার্মানিকে। এই ধারার মাধ্যমে জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। ভার্সাই চুক্তির আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারার মধ্যে ১৫৯, ১৬০, ১৬১, ১৬২ ও ১৬৩ ধারা অন্যতম। এই পাঁচটি ধারা ছিল সামরিকভাবে জার্মানির লাগাম টেনে ধরার কৌশল। এই ধারার আওতায় জার্মানির সামরিক শক্তি কমিয়ে আনতে বলা হয়। সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং তাদের কার্যক্রম কী রকম হবে, সেটিও নির্ধারণ করা দেওয়া হয় এই ধারাগুলোর মাধ্যমে। এতে সেনা সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ লাখ ও নৌবাহিনীর সেনা সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫ হাজারের মধ্যে সীমিত রাখার শর্ত দেওয়া হয়। পাশাপাশি জার্মানির যেন নিজস্ব কোনো বিমানবাহিনী না থাকে, সেটিরও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ভার্সাই চুক্তির আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য জার্মানিকেই দায়ী করা হয়। এ ছাড়াও জার্মানির ভৌগোলিক সীমানা হ্রাস, জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়াকে পৃথক করা, সমরাস্ত্র ক্রয় ও প্রস্তুতিতে নিষেধাজ্ঞাসহ অসংখ্য শর্ত আরোপ করা হয় জার্মানির ওপর। চুক্তিটির শর্তগুলো চূড়ান্ত করা শেষে মিত্রশক্তি জার্মানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার আমন্ত্রণ জানায়। ফ্রান্সের ভার্সাই রাজপ্রাসাদকে আলোচনার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ হলো ফ্রান্সের রাজার আবাসস্থল। ১৯১৯ সালের ২৮ জুন এ স্থানেই আলোচিত এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। তাই ঐতিহাসিকভাবে চুক্তিটি ‘ভার্সাই চুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। চুক্তি সম্পাদনের দিন মিত্রশক্তির প্রতিনিধিরা জার্মানির প্রতিনিধিদের একে একে সব ধারা পড়ে শোনান। ধারাগুলো নিয়ে আপত্তি থাকলেও জার্মানি সেগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়। জার্মানির চাপা অসন্তোষের মাঝেই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

ভার্সাই চুক্তি ছিল জার্মানির জন্য অপমানজনক একটি চুক্তি। আপাতদৃষ্টিতে চুক্তিটিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিরেখা মনে হলেও চুক্তির বদলা নিতে ভেতরে ভেতরে মরিয়া হয়ে উঠে জার্মানি। যুদ্ধে পরাজয়, অপমানের গ্লানি, চুক্তির বাধ্যবাধকতা জার্মানির সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলে। সব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নিজেদের অর্থনীতিকে চলমান রেখে ব্যাপকহারে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয় জার্মানি। সেই থেকেই সূত্রপাত ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। তাই ভার্সাই চুক্তিকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রভাবক বলে গণ্য করা হয়। বলা যায়, ১০২ বছর আগে আজকের এই দিনেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজটি বপন করা হয়েছিল।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স

বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়