ব্রেকিং নিউজ

পরিবেশ

সবুজ জলবায়ু তহবিলের এখনই সুযোগ

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

শফিকুল আলম

২০১০ সালে মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত ষোড়শ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতে জলবায়ু অর্থায়নের প্রবাহ বাড়িয়ে প্রশমন ও অভিযোজনকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের জলবায়ু-সংক্রান্ত উইং ইউএনএফসিসিসির আওতায় সবুজ জলবায়ু তহবিল গঠিত হয়। ২০১৫ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্যারিস চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় এ তহবিলের গুরুত্ব আরো সুস্পষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্যারিস চুক্তিতে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে।

প্যারিস চুক্তিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সামগ্রিক সফলতা নির্ভর করবে আমরা কী ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি আর বাস্তবায়নে তার সম্ভাব্যতা কতটুকু। আবার কিছু বিষয় ভাবনার খোরাক জোগাচ্ছেÑ আমাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কোনোভাবেই বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে যে প্যারিস চুক্তি করা হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এ শতাব্দীর শেষে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবেÑ এমন পরিস্থিতির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। আশঙ্কার বিষয় হলো, ইতোমধ্যে দীর্ঘায়িত বন্যার কবলে পড়ে বাংলাদেশ এ বছর অপ্রত্যাশিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তদুপরি উষ্ণ জলবায়ুতে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বন্যার তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়বে, যা কিছু সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়। এমতাবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিঘাত মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোকে সহায়তার মাধ্যমে সামনের দিনগুলোতে সবুজ জলবায়ু তহবিলের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এদিকে, করোনায় বাধাগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন দেশের হাতে ভালো বা মন্দ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে এবং তা হতে পারে শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আশাব্যঞ্জক হলো, করোনা উন্নয়নশীল, উন্নত ও অনুন্নত অনেক দেশকে সবুজ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নীতিমালা প্রণয়ন বা পরিমার্জনে উদ্বুদ্ধ করেছে। আগামী দিনগুলোতে এ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অনেক দেশই জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করবেÑ এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলো এই সবুজ বিনোয়োগের চাহিদা মেটাতে সম্পদের অপ্রতুলতার মুখোমুখি হতে পারে। সবুজ জলবায়ু তহবিল এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত আর্থিক উপকরণ ব্যবহার করে এ দেশগুলোর সবুজ অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।

আবার করোনাকালে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অনেকটা কমেছে। অনেক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার সংকোচনে জ্বালানি নীতিমালা পর্যালোচনার কথা ভাবছে। অবশ্য এর সংগত কারণও রয়েছে। কয়লাকে এখন আর সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি বলা যায় না, বরং বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির (জলবায়ু ঝুঁকি, পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অকালমৃত্যু ইত্যাদি) আর্থিক মূল্যায়ন করা হলে এটি অনেক ব্যয়বহুল জ্বালানি হিসেবে প্রতীয়মান হয়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। আশার কথা হলো, কিছু দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে তাদের জ্বালানি চাহিদার পুরোটাই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের এ আকাক্সক্ষাকে অনেক দেশের জন্যই উচ্চাভিলাষ বলে মনে হয়। তবে সে উদ্দেশ্যে এগোলে অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমবে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে নির্দ্বিধায় সবুজ জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে এবং বাড়বে বিতরণের হার।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী না হওয়া সত্ত্বেও অনুপাতহীনভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবুজ জলবায়ু তহবিল এই ভুক্তভোগী দেশগুলোর অভিযোজনে অর্থায়ন করে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি দেশকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে পরিবর্তনের তত্ত্ব এবং দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তনের কথা বলে যাচ্ছি বছরের পর বছর, তা অর্জনে সবুজ জলবায়ু তহবিলকেই প্রভাবকের দায়িত্ব নিতে হবে।

তবে প্রকল্প অর্থায়নে, অভিযোজন ও প্রশমনের মাঝে ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা অনেক দিন ধরেই সবুজ জলবায়ু তহবিলের বোর্ডকে বলে আসছেন। তথাপি ফলাফল হলো, এ তহবিলের সহায়তা পাওয়া প্রকল্পের বিন্যাস থেকে দেখা যায়, গ্রিন হাউস গ্যাস প্রশমন প্রকল্পে ৪০ শতাংশ অর্থায়ন বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোজনের অভিপ্রায়ে নেওয়া প্রকল্পের ভাগে পড়েছে ২৫ শতাংশ। বাকি ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোতে প্রশমন ও অভিযোজন দুটির সংমিশ্রণ রয়েছে। অথচ এই তহবিলের সুবিধাভোগী হলো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ, যেগুলোর গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের হার খুবই কম। সে আলোকে এ তহবিলের কাছে অভিযোজন অগ্রাধিকার না পেলেও কমপক্ষে প্রশমনের সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অর্থাৎ ক্ষেত্রটি সুষম প্রতিযোগিতার জন্য হলে ভালো হয়।

পরিশেষে করোনা-সৃষ্ট এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবুজ জলবায়ু তহবিলের ভূমিকা ও পরিসর আরো বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে তাদের নীতিনির্ধারকদের নেওয়া উদ্যোগের সঙ্গে সবুজ অর্থায়ন পরিপূরক হিসেবে কাজ করলে গ্রিন হাউস গ্যাসের লাগাম টানা সম্ভব, যা আমাদের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে। যেহেতু বিভিন্ন দেশ কয়লাভিত্তিক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে ক্রমে সরে আসছে, সবুজ জলবায়ু তহবিলের জন্য দ্রুত অর্থায়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিপ্লব ঘটানোর এটাই মোক্ষম সময়। করোনা ও জলবায়ু পরিবর্তন দুটি ভিন্ন বিষয় হলেও কিছুটা সামঞ্জস্য তো রয়েছেই। যেমন- উভয় ক্ষেত্রেই সহায়তা প্রয়োজন যাদের সক্ষমতা কম। সে বিবেচনায় এ তহবিল কৌশলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা বাড়াতে পারে এবং তা সম্ভব হবে যদি অভিযোজন ও প্রশমনকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

লেখক : প্রকৌশলী ও পরিবেশ অর্থনীতিবিদ

 

"