ব্রেকিং নিউজ

বিশ্লেষণ

দূষণমুক্ত পরিবেশ রক্ষায় বায়োটেকনোলজি

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

মাহমুদ কামাল এনামুল হক

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াগুলোর ব্যবহার ও চাহিদা দ্রুত যধদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে যেসব প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নয়নের মাত্রাকে বৃদ্ধি করছে, জৈবপ্রযুক্তি এরমধ্যে অন্যতম। জৈবপ্রযুক্তি এমন একটি প্রযুক্তি, যা বিভিন্ন পণ্য বিকাশ বা তৈরি করতে জৈবিক প্রক্রিয়া, জীবজন্তু বা এর কিছু অংশ ব্যবহার করে। অপরদিকে পরিবেশগত জৈব প্রযুক্তি (এনভায়রনমেন্টাল বায়োটেকনোলজি) হলো জৈবপ্রযুক্তি, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রয়োগ করতে ব্যবহৃত হয় এবং পরিবেশগত জৈবপ্রযুক্তির দ্বারা বোঝা যায়, যে কেউ বাণিজ্যিক ব্যবহার ও শোষণের জন্য জৈবিক প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করার চেষ্টা করে। পরিবেশগত জৈবপ্রযুক্তি আরো সংজ্ঞায়িত করে যে, দূষিত পরিবেশের প্রতিকারের জন্য জৈবিক প্রক্রিয়ার বিকাশ, ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণে জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভিদ, প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং শ্যাওলার মাধ্যমে প্রকৃতির সর্বাধিক ব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। তাছাড়া জৈবপ্রযুক্তি দূষিত জল, বায়ু এবং কঠিন বর্জ্য প্রবাহের পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, মডেলিং ও চিকিৎ্সা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য কাজে লাগানো যায়। পরিবেশ দূষণকারী উৎস শনাক্ত এবং জৈবিকভিত্তিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে প্রক্রিয়া মডেলিং ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব¡পূর্ণ হয়ে উঠছে, মূলত এই জাতীয় কৌশলগুলোর যথার্থতার কারণে। আজকাল উপলব্ধ বিভিন্ন জৈবপ্রযুক্তি এইভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তিগুলোর মতো বর্জ্য জল, বায়ু এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর টেকসই ব্যবহারের কাজ করছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জল, বায়ু এবং মাটি দূষণ দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে স্থায়ী পরিবেশগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশগত কুজনেট কার্ভ (ইসিসি) ব্যবহার করে দেখা গেছে যে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অর্থনৈতিক বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে, পরিবেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি উচ্চমূল্য প্রদান করেছিল কারণ মানবজাতি সব সম্ভাব্য মূল্যবান সংস্থানকে কাজে লাগানোর জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। কৃষিক্ষেত্রগুলোতে প্রক্রিয়া সহজেই জমির নিষ্কাশন এবং ভূপৃষ্ঠের জলকে মূল্যবান পানির উৎসগুলোতে স্থানান্তরিত করে। যার ফলে পানির গুণগত মানের অবনতি ঘটে, যা পানির গুণাগুণ নিরীক্ষণের জন্য অভিনব বায়োসেন্সর ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়।

দ্রুত শিল্প প্রবৃদ্ধির ফলে জলাশয়ে বিষাক্ত রাসায়নিক এবং ভারী ধাতুর উচ্চতর নির্গমন ঘটে। জলাশয়গুলোতে সঞ্চারিত একটি নির্দিষ্ট দূষণকারী মাত্রা আশপাশের শিল্প-কারখানার ওপর নির্ভর করে। টেক্সটাইল, মাইনিং, ট্যানারি, মেটাল প্যাটিং, সার এবং কৃষিশিল্প, ব্যাটারি, কীটনাশক, আকরিক শোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যালস এবং কাগজ উৎপাদন প্রভৃতি শিল্পগুলো মাটি, বায়ু এবং জলের দূষণজনিত সমস্যায় ব্যাপক অবদান রাখে। কিছু রাসায়নিক বায়োডেগ্রেটেবল হয় না, তাই মাটি, বায়ু এবং জলের মধ্যে জমে এবং খাবার শৃঙ্খলেও সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। এর ফলস্বরূপ মানুষের স্বাস্থ্যের সমস্যা ও জলজ জীবের মৃত্যু ঘটে। জলাশয়ে নাইট্রোজেন এবং ফসফরাসের উপস্থিতি জলজ ব্যবস্থায় বায়োমাসের উৎ্পাদন বৃদ্ধি করে, যার ফলে পানির গুণমান হ্রাস পায় এবং এই বাস্তুতন্ত্রগুলোর প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ে। যদিও অনেক দেশে বর্জ্য জল থেকে কড়া নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস স্রাবের মান নির্ধারণ করে। শিল্প-কারখানা প্রায়ই এই প্রয়োজনীয়তা পূরণে সমস্যার মুখোমুখি হয়। একটি নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রক দৃষ্টিকোণ থেকে, সর্বশেষ নির্গমনের মান মেনে চলার জন্য বিদ্যমান বর্জ্য জল ব্যবস্থাপনা জৈবপ্রযুক্তিগুলোকে নতুনভাবে বিকাশ বা সহজ করা প্রয়োজন।

ভারী ধাতু এবং কীটনাশক জাতীয় পরিবেশ দূষণকারীরা সাধারণত অ্যাসিড খনি বা অন্যান্য শিল্প এবং কৃষিজাতীয় নির্গত পানিতে উপস্থিত থাকে। এই বিষাক্ত দূষক জীবগুলোতে জমে এবং কার্সিনোজেনসিটি ও তীব্র বিষাক্ততার মতো বিরূপ প্রভাব তৈরি করতে পারে। সক্রিয় ব্যাকটেরিয়া/ছত্রাক/মিশ্রিত মাইক্রোবিয়াল ব্যবহার করে এমন জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ খনিজায়ন করা যায় এবং এই দূষকগুলো ও তাদের বিষাক্ত উপজাত অপসারণ করা সম্ভব। ভারী ধাতু, দূষিত বর্জ্য জলের ক্ষেত্রে, বায়োসোরপশন একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্বল্প ব্যয়ের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং যেখানে জৈবিক অনুঘটকগুলো জলীয় দ্রবণ থেকে ভারী ধাতব সরিয়ে এবং পুনরুদ্ধারে নিযুক্ত করা হয়। এটি একটি সুপরিচিত সত্য যে, বিভিন্ন উৎস থেকে নর্দমার জলের নগর নদী বা স্রোতে নির্গত হয়। প্রচলিতভাবে জলাশয়ের জলের গুণমান নির্ধারণের জন্য জলের গুণমানের সূচক পদ্ধতির অন্যতম সেরা সরঞ্জাম সাম্প্রতিক গবেষণা নগর জলাশয়ের পুনর্বাসনের জন্য এবং তাদের মান উন্নত করার জন্য উদ্ভাবনী এবং উদ্ভাবনী সমাধানের প্রস্তাব করেছে। ব্যাকটেরিয়াল প্রযুক্তি (বিটি) হ্রদ, নদী এবং প্রবাহের মতো নগরায়িত জলাশয়গুলোকে পুনর্বাসিত করতে পারে। বিটি যেসব সুবিধাগুলো সরবরাহ করে; জনস্বাস্থ্যের জন্য টেকসই ও নির্ভরযোগ্য, স্বল্প রক্ষণাবেক্ষণ, ন্যূনতম পরিচালন ব্যয় এবং অপারেশনের যেকোনো স্তরে পুনঃব্যবহার।

গ্রিন হাউস বা সবুজ ঘরের সঙ্গে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। শীতপ্রধান দেশে গাছপালাকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কাচের ঘরে গাছ লাগানোর পদ্ধতি বা গ্রিন হাউস তারই একটি। কিন্তু মানুষ ক্রমে এই পৃথিবীটাকেও একটু একটু করে গ্রিন হাউসে পরিণত করে ফেলেছে। শিল্প-কারখানার কালো ধোঁয়া, জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি) ব্যবহারে বায়ুমন্ডলে বাড়ছে কার্বন-ডাই অক্সাইডসহ অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ। এই বিষাক্ত গ্যাসগুলো সবাই মিলে আমাদের এই সবুজ পৃথিবীর চারপাশে তৈরি করেছে কাচের মতো একটি দুর্ভেদ্য স্তর। পৃথিবীর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ব্যাপারটি কিন্তু আজ থেকে বহু বছর আগেই উত্থাপন করেন সুইডিশ বিজ্ঞানী আরহেনিয়াস, ১৮৯৬ সালে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে জলবায়ুর ওপরে যে রকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পৃথিবীর দরিদ্র দেশের মানুষ।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকাতে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। পরিবেশ দূষণ এড়িয়ে এই পৃথিবীটাকে মানুষের বাসযোগ্য করে রাখতে ১৭২টি দেশের অংশগ্রহণে ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলন। ১৯৯৭ সালে ডিসেম্বরে জাপানের কিয়োটোতে জাতিসংঘ ক্লাইমেট চেঞ্জ কনভেনশনের উদ্যোগে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যা কিয়োটো প্রটোকল নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক ছয়টি গ্যাস নির্গমন ও নিঃসরণ হ্রাসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এই ছয়টি গ্যাস হচ্ছেÑ কার্বন-ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, হাইড্রোফ্লুরো কার্বন, পারফ্লুরো কার্বন এবং সালফার হেকসাফ্লুরাইড।

পরিবেশ দূষণের আরেকটি ভয়াবহ দিক হচ্ছে ওজনস্তরের ক্ষয়। পৃথিবী থেকে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ওপরের ওজনস্তরটি আমাদের অতিবেগুনি বা আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে রক্ষা করে। এর ফলে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ছাড়াও উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ওজনস্তরের ক্ষয়ের জন্য যে রাসায়নিক পদার্থটি বেশি দায়ী তার নাম ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, সংক্ষেপে সিএফসি।

জৈবপ্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দুর্দান্ত সুযোগ তৈরি করছে এবং কীটনাশক, সারের মতো কৃষি রাসায়নিকগুলোর হ্রাসের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বায়োটেকনোলজি সুন্দর পরিবেশ অর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ও পরিবেশবান্ধব ফসল যেমন পোকামাকড় প্রতিরোধী, ভেষজনাশক সহনশীল প্রজাতি ব্যবহার করে টেকসই উন্নয়ন করছে। এমন ফসল উৎপাদন করছে, যা নাইট্রোজেন ঠিক করতে পারে এবং পরিবেশকে পরিশোধিত করে। বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে অপরদিকে বিদ্যমান জমি ও কৃষি ক্ষেত্রের মধ্যে উৎ্পাদন এবং আধুনিক উদ্ভিদ প্রজনন পদ্ধতির ব্যবহার উন্নত হয়েছে, যা মাটির কাঠামো, জৈব পদার্থ এবং উর্বরতা উন্নত করতে লেবুগাছের মতো ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এগুলো জৈবিক উৎস সংরক্ষণ এবং মাটি ক্ষয় রোধ করতেও ভূমিকা রাখে। পশুর কিছু উপকারী প্রভাব পরিবেশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আলোচিত হয়েছে।

প্রযুক্তির বিপ্লবে আমাদের জীবনধারা পাল্টে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই প্রযুক্তির একটি বিরাট অংশজুড়ে আছে রাসায়নিক প্রযুক্তি। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠছে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা। এসব শিল্প-কারখানায় তৈরি হচ্ছে আমাদের বিভিন্ন ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।

পরিবেশ দূষণ পৃথিবীর সব দেশেরই একটি অভিন্ন সমস্যা। দূষণ রোধে বিভিন্ন ধরনের সম্মেলন, সেমিনার, চুক্তি হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলছেন। কিন্তু পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের ভবিষ্যৎটাও ক্রমশ হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তার জন্য ধনী দেশগুলো বেশি দায়ী। তবে এই পরিবেশ দূষণের নেতিবাচক প্রভাব থেকে কোনো দেশেরই মুক্তি নেই। এই পৃথিবীতে আমাদের টিকে থাকতে হলে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করাটা জরুরি। আর তা না পারলে পৃথিবী থেকে আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়াটাও অসম্ভব কিছু নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

[email protected]

 

"