বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবীণদের নিরাপত্তা দেওয়া দরকার

সতীর্থ রহমান

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সফলতার কারণে প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা উন্নত বিশ্বসহ সব দেশকে ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশেও এই ভাবনার বাইরে নয়। ১৯৮২ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় প্রথমবারের মতো বিশ্ব প্রবীণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বার্ধক্য সমস্যা মোকাবিলার প্রথম বিশ্ব উপকরণ হিসেবে এ সম্মেলনেই প্রণয়ন করা হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন অন এইজিং’। প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, প্রবীণ ভোক্তাদের স্বার্থসংরক্ষণ, আবাসন ও পরিবেশ, সমাজকল্যাণ, আয়, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় এই সুপারিশগুলোতে স্থান পেয়েছিল। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন করা হচ্ছে। ১৯৯৯ সালকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ বর্ষ হিসেবে ঘোষণা এবং সব বয়সিদের জন্য সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। ২০০২ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বিশ্ব প্রবীণ সম্মেলন। বিশ্বব্যাপী প্রবীণরা নিগৃহীত, অবহেলিত ও তাদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশ্বের ৩২টি দেশের প্রবীণদের নিয়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রবীণরা দেশে দেশে অবহেলিত এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।

বৃদ্ধ বয়স বা বার্ধক্য একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া। মানবজীবনে এই প্রক্রিয়া জৈবিক, দৈহিক ও সামাজিকভাবে পরিবর্তন নিয়ে আসে। মূলত বৃদ্ধ বয়স হচ্ছে জীবনের এমন একপর্যায়, যার সমাপ্তি ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। শিশু থেকে বার্ধক্যে গমন-প্রকৃতিরই নিয়ম। বৃত্তাবদ্ধ জীবনব্যবস্থায় বয়সের আধিক্য মানুষকে জরাজীর্ণ ও সংকুচিত করে ফেলে। বৃদ্ধ বয়সের প্রধানত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জরাজীর্ণতা। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের কর্মোদ্দীপনার পর আসে প্রৌঢ়। প্রৌঢ়ের কর্মতৎপরতা ও স্বাভাবিক চিন্তাশক্তির বিলোপ ঘটলেই বার্ধক্যের শুরু। বার্ধক্যে গ্রাস করে অসহনীয় শারীরিক দুঃখ-কষ্ট। বার্ধক্যে মানুষ সাধারণত ছেলেমেয়ের আশ্রয়ে জীবনযাপন করে। বর্তমান সমাজে বৃদ্ধদের মূল্যায়ন ও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বৃদ্ধরা বেশির ভাগই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে বলে সমাজ ও জাতিকে তেমন কিছু দিতে পারে না। জরাজীর্ণ ক্লান্তিকর দেহই থাকে একমাত্র সম্বল। নানা রোগ-শোকে শরীর তিলে তিলে দগ্ধ হয়। শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগের মতো আর সচল থাকে না। তাই একটার পর একটা রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বার্ধক্যে মানুষ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। সমাজ সংসারে কোনো উপকারে আসতে পারে না বলে সমাজে তারা অবহেলিত হয়। মানুষের জীবনে বার্ধক্যের জরাজীর্ণতা প্রকৃতির নিয়মে আসবেইÑ এই আত্মজিজ্ঞাসায় বৃদ্ধদের গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

প্রবীণরা কালের সাক্ষী। কেউ কেউ ফেলে আসেন সোনালি অতীত। প্রবীণদের ঘটনাবহুল স্মৃতি, বিচক্ষণ চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতার ফসল, ইতিহাসের দীক্ষা, বর্ণিল জীবনাচরণ উজ্জীবিত করতে পারে দেশের চালিকাশক্তি তথা যুবসমাজকে। ফলে চৈতন্য ফিরে পেতে পারে দিকভ্রষ্ট যুবক। একজন বিশেষজ্ঞের সঠিক পরামর্শে কারো ভাগ্যের প্রভূত উন্নতি হতে পারে। প্রবীণ জনগোষ্ঠী জনসংখ্যার একটি বিশেষ অংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বর্তমানে দেশে শতকরা ৬ দশমিক ২ জন মানুষ প্রবীণ। অর্থাৎ তাদের বয়স ৬০ বা তদূর্ধ্ব। দেশে প্রবীণের সংখ্যা প্রায় ৮৫ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ প্রবীণ।

আমাদের সমাজে প্রবীণদের জীবনযাপন খুবই করুণ ও বিচিত্রময়। একসময় মনে করা হতো বার্ধক্য শুধু উন্নত বিশ্বেরই সমস্যা। কিন্তু না বার্ধক্য উন্নয়নশীল, অনুন্নত দেশেরও সমস্যা। গ্রামাঞ্চলে প্রবীণদের কায়িক ও মানসিক দুধরনের অত্যাচারের শিকার হতে হয়। শহরাঞ্চলে বাহ্যিক চিত্তবিনোদনের সুযোগ থাকলেও ঘর-সংসারে এই সুযোগ নেই। তবু শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রবীণদের সমস্যাই বেশি। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে প্রবীণরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো মেটাতে পারে না। প্রবীণরা কর্মক্ষম না হওয়ায় সমাজে অনেক ক্ষেত্রে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। আমাদের দেশে প্রবীণদের বেশির ভাগই কর্মহীন থাকায় তাদের সামাজিক মর্যাদাটুকুও তারা পায় না। সমাজ সংসার সর্বক্ষেত্রেই একটা তাচ্ছিল্য ভাব। পদে পদে তারা চরম অবহেলা ও অনাদরের শিকার হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে বয়সের ভারে অত্যন্ত কষ্ট হলেও কৃষিকাজসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হতে হয় প্রবীণদের। অবসর জীবনযাপন করতে না পারা, চিত্তবিনোদনের অভাব, সংসারে পরাধীন হয়ে থাকা, সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকা-ে সম্পৃক্ত হতে না পারা ও কর্মহীনতার কারণে প্রবীণরা চরম হতাশায় ভোগে। একসময় গ্রাম্যসালিশ দরবারে বা সামাজিক নানা সমস্যা সমাধানে নিজ নিজ এলাকায় প্রবীণ ব্যক্তির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

বয়স বাড়ার একপর্যায়ে বার্ধক্য এসে মানুষের শারীরিক সামর্থ্য কমে যায়, কাজ থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। কর্মহীন হয়ে পড়ার কারণে তাদের আয়-রোজগার কমে যায়, আর্থিক অসচ্ছলতা গ্রাস করে। অন্যদিকে বয়স যত বাড়তে থাকে প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তত হ্রাস পেতে থাকে। ফলে নানা ধরনের রোগব্যাধি তাদের শরীরে দেখা দেয়। অর্থাভাবে তারা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। আর্থিক দৈন্যতা, শারীরিক অক্ষমতা, রোগ-ব্যাধির যন্ত্রণা তাদের পীড়াদায়ক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। এ সময় তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জীবিকার জন্য ছেলেমেয়েদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রবীণদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধের অভাবে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ব্যয়ভার বহন করতে চান না।

বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের এক জরিপে জানা যায়, প্রবীণদের সমস্যা মূলত স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত এবং আর্থ-সামাজিক। তারা খুব অসহায় ও পরনির্ভর। আর্থিক অসচ্ছলতা তাদের নিত্যসঙ্গী। গ্রামবাংলায় অনেক প্রবীণ আছে যারা দুবেলা দুমুঠো ভাত ঠিকমতো পায় না। পায়না পরিধানের বস্ত্র। বৃদ্ধ বয়সে তাদের অনেককেই মাটিকাটা, রিকশা-ভ্যান চালানোর মতো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়। কালের ধারায় পেশাগত কারণে ও অভাব-অনটন ইত্যাদি কারণে যৌথ পরিবার ব্যবস্থায় ফাটল ধরায় প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা লোপ পাচ্ছে। প্রবীণরা পরিবারের বোঝাস্বরূপ হয়ে উঠেছে। যারা আজ প্রবীণ তারা একসময় দেশের সেবা, সমাজের সেবা করেছেন। বৃদ্ধ বয়সে তাদের এখন স্বস্তি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্যদের সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে বার্ধক্য কল্যাণের বিষয়টি লিপিবদ্ধ থাকলেও দেশে প্রবীণদের জন্য আজ পর্যন্ত একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়নি। দেশে প্রবীণদের জন্য স্পেশাল কোনো হাসপাতাল তৈরি হয়নি। বর্তমানে প্রবীণদের সাহায্যার্থে সরকার সীমিত আকারে বয়স্ক-ভাতা চালু করেছেন। দেশের প্রতি, ইউনিয়নের প্রতি ওয়ার্ডে ১০ জন প্রবীণ দরিদ্র ব্যক্তিকে (৫ জন পুরুষ ও ৫ জন মহিলা) মাসে ১০০ টাকা হারে বয়স্ক-ভাতা দেওয়া হয়। সরকারি শান্তি নিবাসগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সমাজে প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি তাদের কোনো সুযোগ-সুবিধা। সরকারের কিছু কিছু পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রবীণদের সমস্যা মোকাবিলার জন্য তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যান্য আন্দোলনের মতো প্রবীণ ইস্যুটাকেও সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে সরকারের কাছ থেকে অধিকার আদায় করতে হবে। মোটকথা, প্রবীণদের সহানুভূতির চোখে দেখতে হবে। তাদের অবহেলা না করে ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে হবে। উৎসাহ-উদ্দীপনা আর মিষ্টিমধুর কথা দিয়ে আমরা প্রবীণদের মনপ্রাণ ভরে দিই।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বৃদ্ধদের জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্দিষ্ট বসবাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বৃদ্ধরা সঙ্গী, চিত্তবিনোদন, খাদ্য, চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে বৃদ্ধদের জন্য তেমন কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশ্চাত্যের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে বৃদ্ধদের জন্য আলাদা ‘নার্সিক্যাল হোম’ নামে বসবাসের ব্যবস্থা রয়েছে। ইউরোপীয় সভ্যতা অনুসারে বৃদ্ধ পিতা-মাতার ছেলেমেয়ের খুব একটা যোগাযোগ থাকে না। ‘নার্সিক্যাল হোমে’ চিত্ত-বিনোদনের মাধ্যমে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাটায়। আমাদের দেশে সন্তানহীনতার জন্য বৃদ্ধরা অনেক সময় দারিদ্র্যের কারণে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়। এ সমস্যা নিরসনে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃদ্ধদের নিরাপত্তা দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ তথা বিশ্বে যে হারে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমবয়সির সংখ্যা কমছে, তাতে ২০৫০ সালে প্রথমবারের মতো প্রবীণদের সংখ্যা নবীনদের ছাড়িয়ে যাবে বলে পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন। তখন এটি হবে প্রধানত প্রবীণদের পৃথিবী। বার্ধক্য মূলত বয়সেরই একটি নির্মম পরিণতি। বার্ধক্যে মানুষ শক্তিহীন, কর্মহীন, দুর্বল এবং বাচ্চাদের মতো অবুঝ হয়ে পড়ে। প্রবীণরা যাতে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে, সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বৃদ্ধদের প্রতি সম্মান ও তাদের নিরাপত্তা বিধান করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বৃদ্ধরা যাতে বিনোদনহীন, নিরাশ্রয় ও অসহায়ভাবে জীবনযাপন না করে সে বিষয়ে সবার লক্ষ রাখতে হবে। বার্ধক্য যন্ত্রণাকে ভুলে যাতে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সুখী থাকতে পারে, সে বিষয়ে সবার নজর রাখতে হবে। জাতীয়ভাবে বয়স্ক-ভাতার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, নার্সিক্যাল হোম, বৃদ্ধাশ্রম, শান্তি নিবাস ও বিভিন্নভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও বৃদ্ধদের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ অতি জরুরি।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

স্বনির্ভর কৃষি ক্লাবের রূপকার, সদর, দিনাজপুর

[email protected]

 

 

"