আকমল হোসেন

  ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

বিশ্লেষণ

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য যা করণীয়

অজানাকে জানার নাম শুধু শিক্ষাই নয়, ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন সেসঙ্গে শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা সামনে চলার দক্ষতা অর্জন করাই শিক্ষা। ব্যক্তির পরিবর্তিত আচরণের দ্বারা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন হলেই তাকে শিক্ষা বলে বিবেচনা করা সম্ভব। সে কারণেই আজকে সংখ্যাগত মানের চেয়ে গুণগত মান বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান মানুষই শুধু নয়, ক্রমবর্ধমান জীব ও প্রাণীর বেঁচে থাকার প্রয়োজনে খাদ্যসহ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করতে বেশি পরিমাণ সম্পদের যেমন প্রয়োজন, সেসঙ্গে নানা ধরনের সম্পদেরও প্রয়োজন। সম্পদের মধ্যে প্রধান সম্পদ হলো জমি, কিন্তু পৃথিবীতে মানুষ ও প্রাণীর সংখ্যা বাড়লেও জমির পরিমাণ বাড়ছে না। ফলে ভারসাম্যহীন একটি অবস্থা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।

ষাটের দশকে ক্রমবর্ধমান মানুষের খাদ্য সংস্থান করতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বন-জঙ্গল কেটে খাদ্য উৎপাদনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। যার নাম দেওয় হয়েছিল ‘সবুজ বিপ্লব’। সাময়িকভাবে এ সমস্যার সমাধান হয়েছিল, এ তত্ত্বের জনক মিস্টার বোলগারর সবুজ বিপ্লবের উদ্ভাবনকারী হিসেবে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তবে তার নোবেল পুরস্কারের দুই দশক অতিক্রান্ত হতে না হতেই জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতার কারণে মোট ভূখন্ডের ২৫ ভাগ বন থাকার আন্দোলন শুরু হয়, ফলে প্রাকৃতিক বন-জঙ্গল কর্তনের ওপর যেমন আইনি নিষেধাজ্ঞা আসে, সেসঙ্গে কৃত্রিম উপায়ে বন বা বৃক্ষ লাগানোর তাগিদ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও শুরু হয় সামাজিক বনায়ন প্রকল্প। বাড়ির আনাচে-কানাচে, রাস্তা, নদীর তীর, রেললাইনের পাশে গাছ লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়; যা এখনো অব্যাহত আছে।

বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, একই জমিতে একাধিকবার ফসল ফলানো, ডোবা-নালা পরিষ্কার করে মাছ চাষ, গরু মোটাতাজাকরণ, হাঁস-মুরগির খামার, বিদেশি বেশি দুধ দেয় এমন গাভীর চাষ শুরু হয়। জ্ঞানের আঁধার মানুষের সুখ ও সুবিধা নিশ্চিত করতে স্বল্প সম্পদের বহুবিধ এবং বিকল্প ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজন থেকে উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তি গড়তে শিক্ষায় আনা হয় আমূল পরিবর্তন, তত্ত্ব আর তথ্যের ভালো না ভেবে প্রায়োগিক শিক্ষা, উৎপাদনমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ভাববাদনির্ভর তাত্ত্বিক শিক্ষার স্থলে দর্শন ও বিজ্ঞান শিক্ষার কদর বাড়ে। কারিগরি শিক্ষার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এমএ পাস করে অফিসের কেরানি হওয়ার পরিবর্তে এসএসসি পাস করে যে ছেলেটি ভেটেরেনারি প্রশিক্ষণ, হোমিওপ্যাথি কোর্স শেষ করে গ্রামে নেমেছে তার মাসিক আয় অনেক বেশি, সে নিজেই শুধু উপকৃত হয়নি, বরং তৃণমূলে অবস্থানকারী সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করতে পারছেন। এসব বিষয় বিবেচনা করেই শিক্ষার সংখ্যাগত প্রসারের চেয়ে আজ গুণগত মান বৃদ্ধির চাহিদাটি বেশি আলোচিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই।

তাইতো ২০০১ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন বিশ্ব শিক্ষা ফোরাম থেকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা আট বিষয়ের মধ্যে ২ নম্বরে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। যার অনেক বিষয় ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। ২০১৫ সালে এসে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা ফোরাম থেকে ২০৩০ সালের জন্য গৃহীত হয়েছে স্থায়ী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৪নং লক্ষ্যে ইনক্লুসিভ ইক্যুইটি ও লাইফ লং শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। স্থান, কাল, জেন্ডার ও বুদ্ধিবৃত্তিক-বিষয়ক নানা বৈষম্য দূর করে একীভূত সমতামূলক এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সীমিত সম্পদে বহুজনের নানামুখী চাহিদা মিটানোর তাগিদ থেকেই গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি। শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়টি বলা যত সহজ; করাটা হয়তো তত সহজ নয়, তাই বলে অসম্ভবও নয়। প্রয়োজন আন্তরিকতা, সদিচ্ছা আর কাজে লেগে থাকার। আর এ কাজটির জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার।

মহান মুক্তি-সংগ্রামের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ ধারায় সে ধরনের একটি শিক্ষাব্যবস্থার ধারণা দেওয়া হয়েছিল; যার আলোকে বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন, শিক্ষার দর্শন, শিক্ষার ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার অর্থায়ন বিষয়ে একটি সুপারিশ প্রণয়ন করেছিলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, সেটি বাস্তবায়িত হয়নি, বর্তমানেও হচ্ছে না। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব ও উৎকোচমুক্ত করা খুবই জরুরি। নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, শিক্ষা উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভালো শিক্ষার্থীদের (বিশেষ করে একাডেমিক) শিক্ষকতা পেশায় আসতে উৎসাহিত করা জরুরি। এজন্য পদোন্নতি, মানসম্মত বেতন প্রদান ও সম্মানের স্থানটি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষায় ৯০ ভাগ শিক্ষা পরিচালিত হয় ২৮ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪ দশমিক ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক কর্মচারী এবং নন-এমপিও সাড়ে সাত হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্বারা। এখানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছুটা স্বচ্ছতা এলেও ওই শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিচালনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়োগ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি/গভর্নিং বডির হাতে থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। নয়, গভর্নিং বডির দৌরাত্ম্য এমএ পাস শিক্ষক আর অনেক ক্ষেত্রে অষ্টম শ্রেণি পাস লোক গভর্নিং বডির সভাপতি, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বৃদ্ধির পরিবর্তে এ ধরনের গভর্নিং বডির প্রধানরা, প্রতিষ্ঠানের কাউকে চাকরিচ্যুত আবার নতুন করে নিয়োগ প্রদান, বড় ধরনের বৈষয়িক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে এ বিষয়গুলো খুবই ক্ষতিকর এবং অন্তরায়।

শিক্ষকদের জবাবদিহিতায় আনা, তাদের কাজের মূল্যায়ন সুপারভিশন এবং বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া বা পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সময়ের বিবেচনায় বা অনুপাতের ভিত্তিতে পদোন্নতির পরিবর্তে পারফরম্যান্সবেজ পদোন্নতির ব্যবস্থা করলে শিক্ষকদের পেশাদারিত্বের উন্নয়নে ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারে। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন, দলীয়করণের কালচারের পরিবর্তন হওয়া জরুরি। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে বিকল্প নিয়োগ কমিশন গঠনের দাবি করলেও তা হয়নি, সর্বশেষ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে বিকল্প নিয়োগ কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং পরবর্তীতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ অথরিটি (এনটিআরসিএ) গঠন করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির জনবল সংকট, সর্বশেষ নানা মামলাজটে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে থাকার পর তাদের কাজ শুরু হয়েছে, তবে কাজগুলো এখনো ত্রুটিমুক্ত হয়নি। আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটি নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও নিয়োগের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এমনতর অবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।

সাম্প্রতিককালে কারিকুলাম এবং সিলেবাস থেকে প্রগতিশীল কবি ও লেখকদের লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে, অনেক শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ এটাকে শিক্ষায় হেফাজতীকরণ বলে অভিহিত করেছেন। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হবে বলেই বিচক্ষণ মানুষের মন্তব্য। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ ও হেফাজতীকরণ পরিহার করে যুক্তি দর্শন, বিজ্ঞান ও কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে শিক্ষায় বরাদ্দ-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাজেট প্রদান, শিক্ষা প্রশাসনের সবস্তরে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করা জরুরি। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বিশ্বায়ন যেভাবে ত্বরান্বিত হচ্ছে; সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষকদের তথ্য ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে না বাড়ালে তাদের এ পেশায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে ‘মুজিববর্ষ’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুজিববর্ষ পালনের এই বছরেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ১৯৭২ সালের সংবিধান আর তার আমলেই গৃহীত কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির কাজটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। আশা করি, সরকার বিষয়টি আন্তরিকভাবে বুঝবেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। সর্বশেষ রবীন্দ্রনাথের সেই কথা ‘তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি’ এমনটা যেন না হয়।

লেখক : অধ্যক্ষ

সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) কেন্দ্রীয় কমিটি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়