ইসমাইল মাহমুদ
স্মরণ
একজন উৎপল দত্ত

টিনের তলোয়ার হাতে এক মহান অভিনয়শিল্পী নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যেকোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি, আমি প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়।’ সেই মহান অভিনয়শিল্পী হলেন উৎপল দত্ত। যার পরিচয় তিনি একজন অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক। এ ছাড়া তুখোড় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বামপন্থি রাজনীতিবিদ এবং মার্কসবাদী। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে তিনি আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকার হিসেবে সুপরিচিত।
উৎপল দত্তের জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ অবিভক্ত বাংলার বরিশালে (বর্তমানে বাংলাদেশের বরিশাল জেলা)। গণনাট্য আন্দোলনের সময়ে বিশিষ্ট অভিনেতা এবং নাট্যকার উৎপল দত্ত কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৭ সালে ‘লিটল থিয়েটার’ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সে সময় শেক্সপিয়র, বার্নাড শ, ক্লিফর্ড ওডেটস প্রমুখের নাটক ইংরেজিতে প্রযোজনা করতেন তিনি। একসময় তিনি লিটল থিয়েটার গ্রুপকে বাংলা প্রযোজনার দিকে পরিচালিত করেন। সেই সঙ্গে তিনি দর্শক সমাজের কাছে পৌঁছার এবং গণনাট্য সংঘে ও রাজনৈতিক পথনাটিকার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তার রচনা ও পরিচালনায় ‘অঙ্গার’, ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘কল্লোল’ প্রভৃতি নাটকে রাজনৈতিক বোধ নাটক ও নাট্যাভিনয়ের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের অঙ্গনে যে কজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন উৎপল দত্ত।
১৯৭১ সালে পিপলস লিটল থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এ থিয়েটারের ‘টিনের তলোয়ার’ নাটক তার একটি বৃহৎ পদক্ষেপ। ‘টিনের তলোয়ার’ রাজনৈতিক নাটকের মধ্যে শ্রেণি, ইতিহাস ও মধ্যবিত্ত চেতনার এক অপূর্ব মিশেল তাকে অন্যভাবে পরিচিত করে তুলে থিয়েটার অঙ্গনে। এর পাশাপাশি একজন কৌতুক অভিনেতা হিসেবে তার পারদর্শিতা-পারঙ্গতা ছিল অনন্য-অসাধারণ। ‘গুড্ডি’, ‘গোলমাল’, ‘শৌখিন’ প্রভৃতি ছবিতে তার কৌতুকাভিনয় এখনো মানুষকে চরম আনন্দে ভাসায়। তিনি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ও ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। উৎপল দত্তের অসাধারণ অভিনয় গুণে এসব চলচ্চিত্র এখনো দর্শকের মনের মণিকোটায় সমাদৃত। মননশীল বাংলা ছবি ছাড়াও অসংখ্য বাণিজ্যিক ধারার ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেছেন। তার অভিনীত প্রতিটি ছবিই দর্শকনন্দিত হয়েছে।
উৎপল দত্ত ছিলেন পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিশ্লেষক। মানুষ সম্পর্কে তার গভীরতম ধারণা তার নাটকগুলোকে করেছে অত্যন্ত সফল। উনিশ শতকের বঙ্গীয় সামন্তশ্রেণির বিরুদ্ধে মধুসূদন দত্তের বিদ্রোহকে মূল্যায়ন করতেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘মধুসূদন শেষ পর্যন্ত উনিশ শতকের ঘুণেধরা বিকলাঙ্গ সমাজের বিরুদ্ধে মূর্তিমান বিদ্রোহ’। বাংলার যাত্রাপালার নবজাগরণের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলনেরও অগ্রসৈনিক ছিলেন উৎপল দত্ত।
১৯৫০ সালে ‘বিদ্যাসাগর’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে উৎপল দত্তের যাত্রা হয়। ‘মাইকেল মধুসূদন’ সিনেমায় তিনি নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ ছবি থেকেই চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তার আসন পাকাপোক্ত হয়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে অসংখ্য গণজাগরণমূলক যাত্রা ও নাটকে অভিনয় করেন। এসব নাটক ও যাত্রাপালার নির্দেশকও ছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবিতে অনন্য অভিনয়ের জন্য তিনি পান সম্মানসূচক বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেরা অভিনেতার পুরস্কার। এর আগে ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মৃণাল সেন পরিচালিত ‘ভুবন সোম’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার ১৯৮০ সালে ‘গোলমাল’ ছবি, ১৯৮২ সালে ‘নরম গরম’ ছবি এবং ১৯৮৭ সালে ‘রঙ বিরঙি’ ছবির সুবাদে তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান তিনি। ১৯৮৬ সালে ‘সাহেব’ সিনেমার অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার আসরে তিনি পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পান।
বাংলা বাণিজ্যিক ছবির মতো হিন্দি বাণিজ্যিক ছবিতেও তিনি সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’, সত্যজিৎ রায়ের ‘জন অরণ্য’, ‘হীরক রাজার দেশে’ প্রভৃতি ছবিতে তার অভিনয় এ যাবৎকালের বাংলা সিনেমার সম্পদ। এ ছাড়া তার পরিচালনায় বেশ কয়েকটি ছবি নির্মিত হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ঝড় বৈশাখী মেঘ’, ‘ইনকেলাব কি বাদ’, ‘ঘুম ভাঙার গান’। উৎপল দত্ত তার অন্য নাটকের পাশাপাশি অসংখ্য রাজনৈতিক নাটকে অভিনয় ও পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তিনি শাসক, শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন সরাসরি। শুধু তাই নয়, নাটক নিয়ে তিনি চার দেয়ালে ঘেরা থিয়েটারেই শুধু আবদ্ধ থাকেননি, পৌঁছেছেন গণমানুষের কাছে। তিনি নাটকে স¤পৃক্ত করেছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে। উৎপল দত্তের রাজনৈতিক নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘টিনের তলোয়ার’, ‘রাতের অতিথি’, ‘ছায়ানট’, ‘সূর্যশিকার’, ‘মানুষের অধিকার’।
১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ও মঞ্চ নাটকের ইতিহাসের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত মারা যান। তবে তিনি আজও তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন ।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট
"




































